‘সব কিছুর কষ্ট সহ্য হয়, কিন্তু পানির কষ্ট যে সহ্য করা যায় না, বৃষ্টির পানি শেষ হওয়ার পর থেকে পানি টানার এ কাজ শুরু, সামনের বর্ষা মৌসুম পর্যন্ত এভাবেই পানি টেনে আমাগো তেষ্টা মেটাতে হবে’—পঞ্চান্ন বছর বয়সী পারুল রানী এই কথা শেষ করেই কলসি কাঁখে সতীর্থদের সঙ্গে বাড়ির পথ ধরেন। আইলা আক্রান্ত সাতক্ষীরার
শ্যামনগর উপজেলার ফুলতলা গ্রামের গৌরপদ মন্ডলের পুকুর থেকে কর্দমাক্ত পানি সংগ্রহ করতে তারা কাঠফাটা দুপুরে বাড়ি হতে প্রায় চার কিলোমিটার দূরে এসেছেন। তাদের সকলেরই অভিন্ন অভিযোগ, ‘কত লেখালেখি হলো, কত বছর পেরিয়ে গেলো, কিন্তু আমাগো পানির কষ্টতো দূর হলো না।’
উপজেলার কালিঞ্চি গ্রামের সীতা রানী, কলবাড়ি গ্রামের আমু দাসী, পানখালীর আমেনা বেগম, বয়ারশিং গ্রামের অনিমা হাউলি, আটুলিয়ার স্কুলছাত্রী হাবিবা সুলতানাসহ আরও অনেকের মুখে কেবলই পানি সংকটের কথা। পানি নিয়ে এমন হাহাকার গোটা উপকূলীয় জনপদজুড়ে। সর্বত্র খাবার পানির ব্যাপক সংকট। এসব এলাকার অধিকাংশ গভীর, অগভীর নলকূপ ও টিউবঅয়েলসমূহ মেরামত না হওয়া এবং অনাবৃষ্টির কারণে বছরের শুরু থেকেই খাবার পানির সংকট তীব্রতর হয়েছে।
উপকূলীয় জনপদের বিভিন্ন অংশ ঘুরে দেখা গেছে, খাবার উপযোগী সুপেয় পানির জন্য রীতিমতো হা-হুতাশ শুরু হয়েছে। চারিদিকে অজস্র জলরাশি সত্ত্বেও খাওয়ার উপযোগী পানির জন্য ছয়/সাত কিলোমিটার পর্যন্ত দূরে যেতে হচ্ছে গ্রামবাসীদের। সরকারি ব্যবস্থাপনায় খননকৃত শতাধিক পুকুর শুকিয়ে যাওয়ায় এবং অধিকাংশ স্থানে নলকূপগুলো দিয়ে লবণ পানি আসায় খাবার পানির জন্য এমন হাহাকার।
ভেটখালী শেখের বাড়ির পুকুর হতে পানি নিতে আসা মারুফা খাতুন জানায়, সে মানিকখালী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণীতে পড়ে। প্রতিদিন স্কুল থেকে বাড়িতে ফিরে প্রায় তিন কি.মি. দূরবর্তী শেখের বাড়ির পুকুর হতে পানি নিতে আসতে হয়। দিনে দু’বার পানির জন্য আসার কারণে তার লেখাপড়ায় বিঘ্ন ঘটে উল্লেখ করে সে জানায়, মা অসুস্থ তাই ৭ সদস্যের পরিবারের খাবার পানি তাকেই টানতে হয়। সন্ধ্যার আগে বাড়ি ফেরার তাড়া থাকায় দুপুরের পর থেকেই পানি টানার কাজ শুরু করতে হয় উল্লেখ করে তারই প্রতিবেশী অর্পনা কাহার জানায়, প্রতিদিন সকাল-বিকাল দু’বেলা পানি টানতে গিয়ে তার স্কুলজীবন বেশিদূর এগোয়নি। নিজেদের গ্রামে টিউবঅয়েল সফল না হওয়ার পাশাপাশি খাবার পানির পুকুরগুলো পানিশূন্য হয়ে পড়ায় চার কি.মি. দূরবর্তী স্থান থেকে তাদের পানি নিতে আসতে হয়।
ভেটখালী গ্রামের গৃহবধূ মাজিদা বেগম আর হেতালখালী গ্রামের অমলকৃষ্ণ মন্ডল জানান, গোটা এলাকাজুড়ে শুধু খাবার পানিরই সংকট চলছে না। বরং রান্না করার পানিও দূর-দূরান্ত থেকে সংগ্রহ করতে হচ্ছে। রমজান নগর এলাকার শেখের বাড়ির পুকুর থেকে মুন্সিগঞ্জ, কৈখালীসহ মোট তিনটি ইউনিয়নের মানুষ পানি সংগ্রহ করে উল্লেখ করে সেখানে উপস্থিত অমলকৃষ্ণসহ অন্যরা জানান, ঐ এলাকার পানি সমস্যা দূর করতে একটি এনজিও একবছর আগে পাইপের মাধ্যমে পানি সরবরাহের ব্যবস্থা করে। কিন্তু বছর না ঘুরতেই সে সব পাইপ ফেটে গোটা সরবরাহ ব্যবস্থা ভেস্তে গেলেও তা সংস্কারে কেউ কোন উদ্যোগ নেয়নি। যে কারণে তাদেরকে বাড়ি থেকে সাত কি.মি. দূর হতে পানি সংগ্রহ করতে হয় বলে তারা দাবি করেন।
‘ভোট আসলি চেয়ারম্যান-মেম্বররা পান-সুপারি নিয়ে হাজির হলেও এতদিন ধরে তীব্র পানির কষ্ট নিবারণে তাদের কোন উদ্যোগই নেই উল্লেখ করে হেতালখালী গ্রামের পঞ্চাশোর্ধ বয়সী সরস্বতী মন্ডল ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন। সরস্বতীসহ পানি নিতে আসা তার সতীর্থরা জানান, সন্ধ্যা নামার আগেই বাড়ি ফেরার তাড়া থাকে। তাই দুপুরের রোদ পশ্চিমে ঢলতেই তারা ৫/৬ কি.মি. দূরের উত্স থেকে পানি নিতে বের হয়ে পড়েন।
ভেটখালী গ্রামের বাসিন্দারা জানায়, ‘আপনারা যদি পারেন তবে এই পুকুরের পাড়ে একটা পিএসএফ’র ব্যবস্থা করে দেন। লবণাক্ততার কারণে এলাকার টিউবঅয়েলে আসা পানি খাওয়া যায় না জানিয়ে তারা আরও বলেন, আইলার পর লবণ পানিতে নিমজ্জিত পুকুরগুলো আজও ব্যবহার উপযোগী হয়নি। যে কারণে গোটা এলাকায় খাবার ও রান্নার পানির সংকট প্রবল। দিনে দিনে ঐ সংকট আরও বেড়ে চলেছে বলেও তারা অভিযোগ করেন। উপজেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশলীর দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, উপকূলীয় শ্যামনগর উপজেলায় ১৪১৩ গভীর, ৩৪৪ অগভীর, ৪৭১টি এএসটি ও ৩৫৭টি ভিএসএসটি পানি উত্তোলনের কাজে ব্যবহূত হচ্ছে। তবে ৮টি গভীর, ১০২টি অগভীর, ১৫টি এসএসটি ও ৪৪টি ভিএসএসটি গত দু’বছর ধরে অকেজো হয়ে থাকলেও বরাদ্দ না থাকায় তা মেরামত করা যা্য়নি।
গোটা এলাকাজুড়ে সরকারিভাবে নতুন গভীর, অগভীর নলকূপসহ যেকোন ধরনের টিউবঅয়েল এবং পিএসএফ ও আরএসএফ নির্মাণ কাজ বন্ধ রয়েছে। শুধু ১৮টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে খাবার পানির ব্যবস্থা করা ছাড়া সরকারিভাবে নতুন কোন কাজ হচ্ছে না উল্লেখ করে সংশ্লিষ্ট দপ্তর হতে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে দু’বছর ধরে চাহিদা পাঠানোর পরও বরাদ্দ পাওয়া যায়নি বলে জানান। যে কারণে উপকূলবর্তী এই এলাকাতে খাবার পানির সংকট তীব্র বলেও সংশ্লিষ্ট দপ্তরের পক্ষ থেকে স্বীকার করা হয়। তবে এলাকাবাসীর পানির সংকট কমাতে কয়েকটি এনজিও সাধ্যমতো টিউবঅয়েল স্থাপনের চেষ্টা করছে বলেও তারা জানান।
উপজেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশলী দপ্তরের উপ-সহকারী প্রকৌশলী মোস্তাফিজুর রহমান জানিয়েছেন, দু’বছর ধরে পানি সরবরাহের জন্য নতুন কোন বরাদ্দ পাওয়া যায়নি। তবে উপরে চাহিদার কথা জানানো হলেও কোন বরাদ্দ আসছে না।
