২৯ ফাল্গুনের আবহাওয়ায় খানিকটা মিষ্টতা থাকার কথা। সকাল সাড়ে ৭টায় গায়ে সোয়েটার চাপিয়ে মোটরসাইকেলে রওনা হওয়ার পর বোঝা গেল আবহাওয়াটা মোটেও অত মিষ্টি নয়। জ্যাকেট গায়ে মোটরসাইকেল চালানোই বুদ্ধিমানের কাজ ছিল। শহর ছেড়ে গ্রামের দিকে এগোতেই গাছপালার ঘন বুনুনিতে শীতটা আরো বেড়ে গেল।
১২ কিলোমিটার চলার পর নরেন্দ্রপুরের মিস্ত্রিপাড়ায় পৌঁছে দেখা গেল একেবারেই উল্টোচিত্র। সেখানে একদল পুরুষ খালি গায়ে যার যার মতো বেশ পরিশ্রম করেই ঘাম ছুটিয়ে ফেলেছেন। নারীদের কপালও ঘামে চকচকে। ছোট ছেলেমেয়েদেরও দেখা গেল স্কুল ছুটির দিনটাতে বাবা-মাকে সাহায্য করতে। জানা গেল, মোটামুটি ঘণ্টাখানেক আগে তারা চা-বিস্কুট খেয়ে কাজে নেমে পড়েছেন।
নরেন্দ্রপুর যশোর সদর উপজেলার নরেন্দ্রপুর ইউনিয়নেরই একটি গ্রাম। গ্রামের মিস্ত্রিপাড়ার সব ঘরেরই আদি প্রধান পেশা কাঠমিস্ত্রির। নিজেদের কিছু জমি চাষবাসের সাথেও সম্পর্ক করে। বংশানুক্রমে তারা গরুর গাড়ির চাকা, লাঙ্গল তৈরি করে জীবিকা নির্বাহ করতেন। চেয়ার-টেবিল, খাটসহ কাঠের ফার্নিচার তৈরির কাজেও সম্পৃক্ততা ছিল। যুগের ধারার গরুর গাড়ির চাকা, লাঙ্গলের চাহিদায় ভাটা পড়লে বিকল্প হিসেবে রুটি বানানোর পিঁড়ি-বেলনা, লাটিম, দাঁড়িপাল্লার কাঠির মতো ছোটখাটো জিনিস তৈরি করে নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার চেষ্টা চালান তারা।
শুরুর গল্প
নরেন্দ্রপুরে কীভাবে শুরু হলো ক্রিকেট ব্যাট তৈরির যজ্ঞ? গ্রামে ঢুকে জিজ্ঞেস করতেই সবাই একবাক্যে বললেন সঞ্জিত মজুমদারের নাম। একজন সাথে করে নিয়ে গেলেন তার বাড়িতে। জ্যাঠাতো ভাই পরিচয় দিয়ে দীপক মজুমদার বললেন, ‘ঠিকই শুনেছেন। তবে ও বেশিরভাগ সময় ফরিদপুরে থাকে। আমরা ব্যবসা দেখাশোনা করি।’ ‘কীভাবে তার শুরুটা, জানেন কি?’ জিজ্ঞেস করতেই চটজলদি বলে গেলেন, ‘১৫-১৬ বছর আগে সম্পর্কে আমার ছোটভাই সঞ্জিত খুলনার সুন্দরবন স্পোর্টসের জাফরি সাহেবের কাছ থেকে ব্যাটের একটা নমুনা নিয়ে আসে। তৈরি করে সেখানে দেয়ার পর অর্ডার আসতে শুরু করে। সাপ্লাই বেড়ে যেতে থাকে। তার দেখাদেখি আস্তে আস্তে মিস্ত্রিপাড়ার সবাই ক্রিকেট ব্যাট বানাতি শুরু করে।’ তিনি জানান, দুইশ’রও বেশি পরিবারের বাস এখানে। এখানকার ৩০টি কারখানায় ৩-৪শ’র মতো মানুষ কাজ করেন।
ব্যাট তৈরির নানা ধাপ
ব্যাট তৈরির প্রধান উপাদান কাঠ। আমড়া, জীবন, পিঠানি বা পিঠেকারা, নিমভূত ও কুয়াকাঠ দিয়ে মূলত ব্যাট তৈরি করা হয়। স মিলে কাঠ চিরে ব্যাট তৈরির জন্য প্রথমেই ছোট করাত কিংবা মেশিনের সাহায্যে ব্যাটের প্রধান অংশ সাইজ করে কাটা হয়। স্থানীয় ভাষায় একে বলা হয় ‘ভুটানো’। ভুটানোর পর বাঈশ (লোহার একধরনের যন্ত্র) দিয়ে ‘কুপানো’ (ব্যাটের আকার তৈরি করা) হয়। এরপর কাঠের রস দূর করতে তা এক মাস রোদে শুকানো হয়। এজন্য সুন্দরভাবে সাজিয়ে রাখা হয়। এরও সুন্দর একটা নাম আছে— ‘ঝাপ’। রোদে শুকানোরও আবার পদ্ধতি রয়েছে। টানা রোদে তা কখনোই দেয়া হয় না। কারণ টানা রোদে থাকলে ব্যাটের কাঠ ফেটে যায়। এজন্য রৌদ্র-ছায়ার মিশেলের প্রয়োজন হয়। আর সেজন্য সাধারণত ঝাপের ওপর পলিথিন দিয়ে ঢেকে রাখা হয়। রোদ আসে— এমন টালির ঘরেও আশ্রয় জোটে তাকের পর তাক সাজিয়ে রাখা ঝাপের। ব্যাটের হ্যান্ডেল তৈরি করা হয় ‘টন’ মেশিনে। এসব মেশিনও প্রতিটি কারখানায় রয়েছে। মেশিনে হ্যান্ডেল তৈরির পদ্ধতিকে বলা হয় ‘কোন্দা’। শুকিয়ে ‘সিজন’ হওয়া ব্যাট আর হ্যান্ডেল আইকা দিয়ে জুড়ে দেয়া হয়। আঠা শুকানোর পর রান্দা দিয়ে ব্যাটের ‘কোল-পিঠ’ ফিনিশিং দেয়া হয়। এরপর ব্যাটের ‘ঘাড়-মাথা’ কাটা লাগে। এসব কাজ প্রধানত পুরুষেরাই করেন। এরপর তা যায় মেয়েদের হাতে। মেয়েরা প্রথমেই দেখেন ব্যাটের কোথাও ফাটা আছে কিনা। থাকলে সেখানে পুটিং করে ফিনিশিং দিতে হয়। এরপর শিরিষ কাগজে ঘষে ব্যাটকে মসৃণ করা হয়। লাগানো হয় বাহারি সব স্টিকার। হ্যান্ডেলে আকার ভেদে গ্রিপার কিংবা রঙিন ফিতা দিয়ে মুড়ে দেয়া হয়। সবশেষে সম্পূর্ণ ব্যাটকে পাতলা স্বচ্ছ পলিথিনে মুড়ে আগুনে তাপ দিয়ে ব্যাটের গায়ে লাগিয়ে দেয়া হয়। তাপ দেয়ার জন্য অনুসরণ করা হয় সীমিত তাপমাত্রা। মোটামুটি বড়মাপের চুলায় কাঠ পোড়ানোর পর আগুন নিভে গেলে চুলার হালকা তাপের ওপর উঁচু করে ব্যাট ধরা হয়। হাতের চাপে আটকে দেয়া হয় পলিথিন।
ব্যাটের নানা আকার ও দর
ব্যাট তৈরি হয় তিন ধরনের : নরমাল, ডিউজ ও ফাইভ স্টার টেপ টেনিস। নরমালের মধ্যে শূন্য থেকে ৬ পর্যন্ত ৭টি সাইজ রয়েছে। এর মধ্যে শূন্য থেকে ৩ নং পর্যন্ত প্রতি শ’ ৩ হাজার টাকা পাইকারি দরে বিক্রি হয়। ৪-৬ নং পর্যন্ত সাইজের বিক্রি মূল্য ৫ হাজার টাকা প্রতি শ’। ডিউজের পাইকারি দর প্রতিটি একশ’ থেকে ১৮০ টাকা পর্যন্ত। দেড়শ’ থেকে ২শ’ টাকায় মেলে প্রতিটি ফাইভ স্টার টেপ টেনিস। সুশান্ত কর নামের কারিগর দাবি করেন, ফাইভ স্টার টেপ টেনিস আগে পাকিস্তানের শিয়ালকোট থেকে বাংলাদেশে আসতো। তখন এর দাম ছিল ৬শ’ টাকা করে। ডিউজ ও ফাইভ স্টার টেপ টেনিস ব্যাট তৈরির জন্য শক্ত ও মজবুত কাঠ দরকার। আর নরমাল ব্যাটের ক্রেতারা ছোট হওয়ায় সাধারণ হাল্কা কাঠ দিয়ে এটা তৈরি হয়। অসিত কর জানান, নরেন্দ্রপুরের ক্রিকেট ব্যাটের ক্রেতা প্রায় সারা দেশেরই খেলাধুলার সামগ্রীর দোকানদাররা।
বিশ্বকাপ ও নরেন্দ্রপুরের ব্যাট
দীপক মজুমদার জানান, আশ্বিন থেকে জ্যৈষ্ঠ মাস নরেন্দ্রপুরের ব্যাটের ভরা মওসুম। এসময় ব্যাটের বিক্রি খুবই ভালো। তবে বছরের অন্যান্য সময়ও পুরোদমে প্রস্তুতি চলে ব্যাট তৈরির। আর ৪ বছর অন্তর বিশ্বকাপ ক্রিকেটের সময় তো রীতিমতো ‘ব্যাট মহোত্সব’ শুরু হয়। আর এবার বাংলাদেশের সাফল্যের পরও ব্যবসা তেমন একটা গতি পায়নি— যা ছিলো ৪ বছর আগে। এর প্রধান কারণ হিসেবে ব্যাটের কারিগররা হরতাল-অবরোধকে দায়ী করেছেন। এজন্য এনজিওর ঋণের টাকায় তাদের বাড়তি সুদ গুনতে হচ্ছে বলে অভিযোগ তাদের প্রত্যেকের।
