বাংলাদেশ জুড়ে লাগাতার বিস্ফোরণ ঘটিয়ে গণতান্ত্রিক সরকারের পতন ঘটানোর লক্ষ্যে পশ্চিমবঙ্গে জঙ্গি ঘাঁটি গড়েছিল জামাতুল মুজাহিদিন বাংলাদেশ (জেএমবি)। উদ্দেশ্য ছিল শেখ হাসিনা পরিচালিত সরকারের পতন ঘটিয়ে শরীয়ত পরিচালিত ইসলামিক শাসন প্রতিষ্ঠা করা। গতকাল সোমবার কলকাতার ব্যাঙ্কসাল আদালতে বর্ধমানের খাগড়াছড় বিস্ফোরণ কাণ্ড নিয়ে ১৬৪ পাতার চার্জশিটে একথা জানিয়েছে ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা এনআইএ। চার্জশিটে ২১ জনের নাম রয়েছে। এর মধ্যে বাংলাদেশের নাগরিক, জেএমবির জঙ্গি ৪ জন। ১৩ জন এখন পর্যন্ত ধরা পড়েছে। বাকিদের খোঁজ পেতে বাংলাদেশ সরকারকে জানিয়েছে এনআইএ।
গত বছরের ২ অক্টোবর বর্ধমানের খাগড়াছড় বিস্ফোরণ কাণ্ড ঘটে। ঘটনাস্থলেই মৃত্যু হয়েছিল ২ জঙ্গির। তদন্তে জানা যায়, গ্রেনেড তৈরির সময় এই ঘটনা ঘটে। লক্ষ্য ছিল বাংলাদেশে সিরিজ বিস্ফোরণ ঘটানো। শেখ হাসিনা সরকারকে উত্খাত করা। তারপর পশ্চিমবঙ্গ, আসামের একটা অংশ নিয়ে বৃহত্তর ইসলামিক বাংলাদেশ গঠন করা।
ঘটনার ১৭৭ দিনের মাথায় দেওয়া চার্জশিটে বলা হয়েছে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের ৪ জেলা বর্ধমান, বীরভুম, নদিয়া, মুর্শিদাবাদ ছাড়াও অসম, ঝাড়খন্ডে একাধিক জঙ্গি শিবির খুলেছিল জেএমবি। সেখানে গ্রেনেড তৈরির প্রশিক্ষণ ছাড়াও দেওয়া হত অস্ত্র চালানোর প্রশিক্ষণ। সেখানে ইতিমধ্যে অন্তত ৫০০ জন জেহাদী প্রশিক্ষণ পেয়েছে। চার্জশিটে বলা হয়েছে মহিলাদের জন্য খোলা হয়েছিল আলাদা শিবির।
বাংলাদেশি নাগরিক তালহা শেখ, কউসার এবং সাহাদাত শেখ ওরফে নাসিরুল্লাসহ এই ঘটনায় যুক্ত ৮ জঙ্গি এখনো পলাতক। এরা বাংলাদেশে ঢুকে লুকিয়ে থাকতে পারে। তবে ঘটনায় ধৃত রোহিঙ্গা জঙ্গি খালেদ শেখকে এই মামলা থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে।
চার্জশিটে বলা হয়েছে, গণতান্ত্রিক উপায়ে হঠানো সম্ভব নয় বুঝেই হাসিনাকে খুনের জন্য জঙ্গি ছক কষেছিল জেএমবি। পরিকল্পনা করা হয়েছিল বাংলাদেশের গত নির্বাচনের আগে থেকেই। জেরায় বলেছে ধৃত জঙ্গি শাহনুর ও সাজিদ। সাজিদ নারায়ণগঞ্জের জেএমবি নেতা। জানা গেছে, নাশকতার ছক কষতে তত্পর রয়েছে আরো ১৩ জঙ্গি দম্পতি।
বলা হয়েছে নারায়ণগঞ্জের সাজিদ ওরফে রহমতুল্লা জেরায় জানিয়েছে, গণতান্ত্রিক উপায়ে নির্বাচনের মাধ্যমে শেখ হাসিনাকে সরানো যাবে না। এটা বুঝতে পেরেই গত জানুয়ারিতে বাংলাদেশের সাধারণ নির্বাচনের আগেই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে হত্যার পরিকল্পনা করে জামায়াতে ইসলামী, জেএমবি। বাংলাদেশে সেই সময় প্রশাসনের নজর থাকায় পশ্চিমবঙ্গে সরে আসে জঙ্গিরা। জঙ্গি হামলার প্রস্তুতি শুরু করে দেয়। বর্ধমানসহ পশ্চিমবঙ্গের আরো কয়েক জায়গায় শুরু হয় জঙ্গি প্রশিক্ষণ, বোমা, গ্রেনেড তৈরি। শাহনুর জানিয়েছে, তার লক্ষ্য ছিল বাংলাদেশে ঢুকে হাসিনার ওপর হামলা চালানো। লক্ষ্য, বাংলাদেশে অরাজকতা তৈরি করা। জোর করে ক্ষমতা দখল।
গোয়েন্দারা জানতে পেরেছেন শেখ হাসিনার ওপর হামলার পরিকল্পনা কার্যকর করতে ১৫০ জন মহিলাকে জঙ্গি প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। তাদের সঙ্গে থাকছে ১৫০ জন জঙ্গি প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত যুবক। স্বামী, স্ত্রী সেজে এরা বিভিন্নভাবে বাংলাদেশে ঢোকার চেষ্টা করছে। এদের নেতৃত্বে রয়েছে ১৩ জঙ্গি দম্পতি। নেতৃত্বে ছিল পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদের লালগোলার লাদেন ওরফে মোফাজ্জল হোসেন। তার তত্ত্বাবধানে লালগোলার মাদ্রাসায় চলত জঙ্গি প্রশিক্ষণ। তার হাতে ছিল জেএমবি-র অর্থের ভাণ্ডার। জামায়াতে ইসলামীর নির্দেশ আসতো তার কাছেই। লাদেন ধরা পড়লেও অর্থ ভাণ্ডারের খোঁজ মেলেনি।
গোয়েন্দা সূত্রে খবর, ১৩ জঙ্গি দম্পতিকে খোঁজা হচ্ছে। সাজিদ গ্রেপ্তার হওয়ার পর জেএমবি-র জঙ্গি প্রশিক্ষণ, বিস্ফোরকের বরাত দেওয়ার দায়িত্ব রয়েছে এদেরই হাতে? গোয়েন্দা সূত্রে জানা গেছে, দেশের বাইরে থেকে জেএমবি জঙ্গিদের জন্য আসা বিস্ফোরক বাংলাদেশের কোথায় সরবরাহ করা হবে, তার হদিসও জানে ওই ১৩ জঙ্গি দম্পতি। এদের কাছেই রয়েছে মুর্শিদাবাদ, মালদা, বর্ধমানে জেহাদি প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শ’দেড়েক মহিলা জঙ্গির হাল হকিকত। গত দু’বছরে বর্ধমানের শিমুলিয়া, লালগোলার খারিজি মাদ্রাসায় ২০০-র বেশি যুবক অস্ত্র, বিস্ফোরক বানানোর প্রশিক্ষণ পেয়েছে।
লালগোলায় প্রশিক্ষিত যুবকদের নিয়ন্ত্রণ করে মোফাজ্জল হোসেন ওরফে লাদেন। তার কাছেই রয়েছে ওই জেহাদি যুবকদের যোগাযোগের নম্বর। শিমুলিয়ার প্রশিক্ষিতদের নিয়ন্ত্রণ রয়েছে বোরহান শেখের হাতে। এদের স্ত্রীরা রয়েছে মহিলা জঙ্গিদের দায়িত্বে। লাদেনের হাতে রয়েছে জেএমবি-র অর্থের ভাণ্ডার।
সাজিদকে জেরা করে এনআইএ জানতে পেরেছে তালহা ও তার স্ত্রী ময়না, বোরহান শেখ ও তার স্ত্রী, মোফাজ্জল ও তার স্ত্রী বর্ধমান, শিমুলিয়া এবং লালগোলায় তিনটি জঙ্গি মডিউল চালাত। সেখানে গত দেড় বছরে কয়েকশো যুবক-যুবতি জঙ্গি প্রশিক্ষণ পেয়েছে। আরও ১০ জঙ্গি দম্পতি এরকম জেহাদি শিবির চালাত। লালগোলার মাদ্রাসার জন্য জমি দিয়েছিল মোফাজ্জল হোসেন ওরফে লাদেন। মোফাজ্জল লাদেনের মতো পোশাক পরতে, তাঁর কথাবার্তা, ভাবভঙ্গি নকল করতে ভালবাসে। তাই তার নাম হয়ে যায় লাদেন।
১৩টি জঙ্গি মডিউল গড়ে তারা বাংলাদেশে ঢুকে শেখ হাসিনার ওপর হামলার ছক কষছে। এজন্য পশ্চিমবঙ্গের বীরভূমের মুলুকেও লাদেন একটি প্রশিক্ষণ শিবির খোলার চেষ্টা চালাচ্ছিল।
