খেলাপি ঋণ এবং অবলোপনের নতুন নীতিমালা

আপডেট : ০১ মার্চ ২০১৯, ২০:১৫

বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের  অন্যতম সমস্যা হচ্ছে উচ্চ হারে খেলাপি ঋণ। খেলাপি ঋণ হ্রাসে সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংক বিভিন্ন সময়ে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা জারী করছে। নতুন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল দায়িত্ব নেয়ার পর পরই খেলাপিদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেয়ার কথা বলেছেন। তিনি ঘোষণা দিয়েছেন যে, দেশে খেলাপি ঋণ আর বাড়বে না। তিনি বলেছেন, খেলাপি ঋণ আদায়ের সময় আত্মীয়স্বজন চেনা যাবে না। আর্থিক খাতে সংকট নিরসনে স্থায়ী পদক্ষেপ হিসেবে এ খাতকে ঢেলে সাজানোর কথা বলেছেন। ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ দুই ধরনের। কেউ ইচ্ছেকৃত, কোনোটা অনিচ্ছাকৃত। যারা ইচ্ছেকৃত খেলাপি তাদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেয়ার দাবি এখন জোরালো।

এদিকে, বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিমালার আলোকে ২০০৩ সাল থেকে ব্যাংকগুলো ঋণ অবলোপন করে আসছে। মন্দ বা ক্ষতির মানে খেলাপি ঋণকে ব্যাংকের স্থিতিপত্র (ব্যালেন্স শিট) থেকে বাদ দেওয়াকে ঋণ অবলোপন বলে। মূলতঃ তখনো ঋণ খেলাপি মাত্রা ছাড়িয়ে যাওয়ার কারণে ব্যাংকের স্থিতিপত্র ঠিক রাখতে অবলোপনের নীতিমালা জারি করা হয়েছিল। ক্ষুদ্র ঋণের মামলা খরচের চেয়ে অনেকাংশে বকেয়া ঋণের পরিমাণ কম হওয়ার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে ২০১৩ সালে পাঁচ বছরের খেলাপি ঋণ এবং মামলা না করেই ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত ঋণ অবলোপনের সুযোগ দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। ২০০৩ সালে নীতিমালা জারী হওয়ার পর থেকে এখন পর্যন্ত ব্যাংকগুলো ৪৯ হাজার ৭৪৫ কোটি টাকার ঋণ অবলোপন করেছে। আর অবলোপন ঋণ থেকে ১১ হাজার ৮৭৯ কোটি টাকা আদায় হওয়ায় এখন অবলোপন ঋণের স্থিতি ৩৭ হাজার ৮৬৬ কোটি টাকা। এ হিসাব গত বছরের সেপ্টেম্বর ২০১৮ পর্যন্ত। এসময়ে আলোচিত হল-মার্ক, বিসমিল্লাহ গ্রুপসহ অনিয়মের ঘটনার সঙ্গে জড়িত অনেক গ্রুপের ঋণ অবলোপন করা হয়েছে। উল্লেখ্য, গত সেপ্টেম্বর ২০১৮ পর্যন্ত ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ বেড়ে হয়েছে ৯৯ হাজার ৩৭০ কোটি টাকা। অর্থাত্ অবলোপনসহ খেলাপি ঋণ দাঁড়ায় ১ লাখ ৩৬ হাজার কোটি টাকা যা মোট বিতরণকৃত ঋণের সাড়ে ১৫ দশমিক ৮১ শতাংশ। যদিও অবলোপনের ঋণ হিসাবে না আসায় খেলাপি ঋণ দেখানো হয়েছে ১১ দশমিক ৪৫ শতাংশ যা অথচ একটি দেশের সুস্থ অর্থনীতিতে খেলাপি ঋণে পরিমাণ থাকা উচিত ৩ শতাংশের নিচে। এর মধ্যে মন্দমানের খেলাপি ঋণ ৮২ হাজার ৬৩৫ কোটি টাকা। অর্থাত্ অবলোপনসহ খেলাপি ঋণ দাঁড়ায় ১ লাখ ৩৬ হাজার কোটি টাকা যা মোট বিতরণকৃত ঋণের সাড়ে ১৫ দশমিক ৮১ শতাংশ । গত ৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৯ বাংলাদেশ ব্যাংক ঋণ অবলোপনের নতুন নীতিমালা জারি করে। এতে ব্যাংকগুলোকে ২ লাখ টাকা পর্যন্ত অর্থ ঋণ আদালতে মামলা ছাড়াই অবলোপনের সুযোগ দেয়ার পাশাপাশি মৃত ব্যক্তি নামে বা তার একক প্রতিষ্ঠানের নামে ঋণ থাকলে সেটাও মামলা ছাড়া অবলোপনের সুযোগ দেয়া হয়। একই সঙ্গে খোলাপি হওয়ার পর অবলোপনের জন্য আগে ৫ বছর অপেক্ষা করার শর্ত থাকলেও তা কমিয়ে ৩ বছর নিয়ে আসা হয়েছে। অবলোপনের শর্ত হিসেবে নীতিমালায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানিয়েছে, অবলোপনের আগে ঋণ থেকে রক্ষিত স্থগিত সুদ বাদ দেয়ার পর অবশিষ্ট ঋণ স্থিতির সমপরিমাণ প্রভিশন সংরক্ষিত থাকতে হবে। এক্ষেত্রে অবলোপনের জন্য নির্ধারিত ঋণ হিসাবের বিপরীতে সংরক্ষিত প্রভিশন পর্যাপ্ত না হলে ব্যাংকের চলতি বছরের আয় থেকে অবশিষ্ট প্রভিশন সংরক্ষণ করতে হবে। ঋণ অবলোপনের পরও ওই ঋণের ওপর ব্যাংকের দাবি বহাল থাকবে এবং আইনগত কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে।

অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, খেলাপি ঋণ আদায়ে আরো কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। ঋণ নিয়ে তা পরিশোধ না করার প্রবণতা আমাদের সমাজে এক ধরনের সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে। অর্থনীতিতে ব্যাংকিং খাত পতনের মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার হাত থেকে বাঁচাতে হলে প্রথমেই সুশাসন প্রতিষ্ঠা দরকার। ঋণ খেলাপিরা যেন আইনের ফাঁক দিয়ে কোনোভাবেই বের হয়ে যেতে না পারে সেদিকে দৃষ্টি দিতে হবে।