আইন আনুষ্ঠানিকভাবে প্রণীত অথবা প্রচলিত এমন কিছু নিয়ম-কানুন যা একটি রাষ্ট্র বা গোষ্ঠী নিজেদের উপর বাধ্যগত বা অবশ্য পালনীয় বলে স্বীকার করে। আইন ভঙ্গ করলে আদালত নানা ধরনের শাস্তি দিয়ে থাকে যার মধ্যে কারাদণ্ড, অর্থদণ্ড উল্লেখযোগ্য। অনেক সময় না জেনে আইন ভঙ্গ করার ফলে লজ্জা দণ্ডেও দণ্ডিত হতে হয়। আর এ দণ্ডটি কোনো আদালত বা ম্যাজিস্ট্রেট দেবে না। আইন ভঙ্গের ফলে যিনি ভুক্তভোগী তিনিই আইনটি ভঙ্গ করার সঙ্গে সঙ্গে এই লজ্জাদণ্ডে দণ্ডিত করেন। এ দণ্ডই অত্যন্ত মানহানিকর; এই দণ্ডের শিকার হলে প্রেসটিজ পুরাই রসাতলে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। যেটি আমার নিজের ক্ষেত্রেই একবার ঘটেছিল।
প্রায় চার বছর আগে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করে প্রথম ঢাকায় আসি। গুলিস্তান থেকে মিরপুর যাবার উদ্দেশ্যে একদিন সাত নাম্বার বাসে উঠি। বাসে একটি বাদে আর কোনো সিট খালি ছিল না, আমি সিটটি খালি পেয়ে নির্দ্বিধায় বসে পড়ি। আরামেই যাচ্ছিলাম, কিন্তু বিপত্তি বাধে তখন—যখন মধ্যপথে এক সুন্দরী তরুণী বাসটিতে উঠে আমাকে ধমকের স্বরে বলতে থাকেন—ওঠেন ওঠেন, এখন থেকে ওঠেন, চোখ নাই? দেখেন না এটা মহিলাদের সিট? মুহূর্তেই আমি হতভম্ব, আমি সঙ্গে সঙ্গে সিটটি ছেড়ে দেই। তিনি তাঁর আসনটি পেয়েছিলেন আর আমি পেয়েছিলাম এক বালতি লজ্জা। বাস ভর্তি মানুষের সামনে নিজেকে অনেক লজ্জিত হতে হয়েছিল। সত্যিকার অর্থে বাসে যে নারীদের জন্য সংরক্ষিত আসন থাকে ঐ দিনের আগে তা আমার জানা ছিল না। আর তাড়াহুড়া করে বাসে ওঠার ফলে অসাবধানতাবশত বাসের লেখাটিও খেয়াল করিনি। তবে সেই আপুটিকে মনে মনে এই মুহূর্তে ধন্যবাদ জানাচ্ছি আইনটি শেখানোর জন্য। তবে অতো জোরে তিনি ধমক না দিলেও পারতেন। আমাকে ধীরে বললেই আমি আসনটি ছেড়ে দিতাম। অন্তত লজ্জা থেকে তো বাঁচতাম।
‘সড়ক পরিবহন আইন ২০১৮’-তে নারীদের সংরক্ষিত আসনের কথা উল্লেখ রয়েছে। নারীদের পাশাপাশি প্রতিবন্ধী, প্রবীণ এবং শিশুদের সংরক্ষিত আসনের কথাও এই আইনে বলা হয়েছে। আসনগুলোতে নারী, প্রতিবন্ধী, প্রবীণ এবং শিশু ছাড়া অন্য কেউ বসতে পারবে না বলে আইনে স্পষ্ট করে বলা আছে। নারীদের সংরক্ষিত আসন নিয়ে নানা জনের নানা তর্ক রয়েছে। আমি সেই তর্কে যেতে চাই না। আমি শুধু একটি কথাই বলব, যেহেতু আমাদের দেশের বাসগুলোতে মানুষের পাশাপাশি মুখোশের আড়ালে নোংরা মানসিকতার কিছু মানুষও যাতায়াত করে থাকে—যারা মেয়েদের শরীরে হাত দেওয়ার জন্য বাসের ভিড়ে নিজেদের পশুত্বকে দমিয়ে রাখতে পারে না, সেই দৃষ্টিকোণ থেকে বাসের মতো ভিড়বহুল একটা জায়গা মেয়েদের জন্য বেশ অনিরাপদ। এই অনিরাপদ ব্যবস্থায় আপনার আমার মা, বোন, স্ত্রী অথবা অন্য কোনো প্রিয়জন প্রতিনিয়ত যাতায়াত করছে গণপরিবহণে। এই দিকটি বিবেচনা করে হলেও নারীর এই সংরক্ষিত আসনে শুধুমাত্র নারীকেই বসার সুযোগ করে দেওয়া উচিত বলে মনে হয়।
শিক্ষানবিশ আইনজীবী, ঢাকা জজ কোর্ট
