চারুপীঠ থেকে চারুকলা মঙ্গল শোভাযাত্রা

আপডেট : ১৩ এপ্রিল ২০১৫, ১২:১৭
 
পহেলা বৈশাখ এলেই ধর্ম-বর্ণ ভুলে দেশের সব মানুষ একত্রিত হয় নতুন বছরকে বরণ করে নিতে। নববর্ষের উত্সবে অংশ নিতে সকাল থেকেই বাঙালিয়ানা সাজে সাজতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন সবাই। শাড়ি, পাঞ্জাবি, ধুতি পরে সবাই সকাল সকাল বের হয়ে পড়েন মঙ্গল শোভাযাত্রার উদ্দেশে। মুখে মুখোশ আর হাতে বিভিন্ন ধরনের গ্রামীণ উপকরণ নিয়ে গত হওয়া বছরের দুঃখ-গ্লানি ভুলে নতুন বছরকে বরণ করে নেওয়ার এ মঙ্গল শোভাযাত্রার আনন্দের রঙের মাত্রা আরও বাড়িয়ে দেয় চারুকলার শিক্ষার্থীদের তৈরি বিভিন্ন ভাস্কর্য, পুতুল, প্রতিকৃতি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউটের উদ্যোগে প্রতিবছর ঢাকায় হয় দেশের সব থেকে বড় মঙ্গল শোভাযাত্রা। কিন্তু মঙ্গল শোভাযাত্রার এই রীতি কিন্তু প্রথম শুরু হয়েছিল ঢাকার বাইরে যশোরে। মাহবুব জামাল শামীম বরাবরই সৃজনশীল একজন মানুষ। শিশুদেরকে নিজস্ব সংস্কৃতির সাথে পরিচয় করিয়ে দেওয়া আর শিল্পের সামাজিকীকরণের লক্ষ্যে যশোরে তিনি ‘চারুপীঠ’ নামে এক ব্যতিক্রমী সংগঠন গড়ে তোলেন। তিনি সবসময় বাঙালিদের নিজস্ব সংস্কৃতিকে সবার কাছে পরিচিত করতে করেছেন বিভিন্ন নতুন নতুন কাজ। ১৯৮৫ সালের একুশে ফেব্রুয়ারির প্রভাতফেরিতে নানা রকম ভিজুয়্যাল কাজ, বাহারি পোশাক আর বিভিন্ন হাতে তৈরি পণ্য দিয়ে বর্ণিল এক শোভাযাত্রার দারুণ এক পরিবেশনায় তাক লাগিয়ে দেন সবাইকে। একুশে ফেব্রুয়ারির এই সফলতায় মুগ্ধ হয়ে সিদ্ধান্ত নিয়েই ফেলেন যে আসছে পহেলা বৈশাখেও আয়োজন করবেন এমন ব্যতিক্রমী শোভাযাত্রার। চারুপীঠের প্রতিষ্ঠাতা শিল্পী মাহবুব জামাল, হিরন্ময় চন্দ, ছোট শামীমসহ কয়েকজন উদ্যোগ নিলেন পহেলা বৈশাখে বর্ণিল শোভাযাত্রা করার। যেই ভাবা সেই কাজ; বাঙালি সংস্কৃতিকে থিম করে সবাই ব্যস্ত হয়ে পড়লেন গ্রামীণ সব উপকরণ, বিশালাকার পুতুল আর মুখোশ তৈরির কাজে। এভাবেই ১৯৮৫ সালে যশোরে প্রথমবারের মতো আয়োজিত হয় মঙ্গল শোভাযাত্রার।
 
এরপর ধীরে ধীরে এ শোভাযাত্রার কথা চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ে। ১৯৮৯ সালে যখন মাহবুব জামাল যখন চারুকলায় ভর্তি হলেন, তখন শুনলেন পহেলা বৈশাখে শোভাযাত্রা আয়োজনের কথা। এরপর চারুকলার শিক্ষার্থীরা মিলে তৈরি করলেন মুখোশ, আনলেন দেশীয় সংস্কৃতির বিভিন্ন পণ্য আর মন ভরা উদ্দীপনা নিয়ে সবাই নেমে পড়লেন নববর্ষকে বরণ করতে। তখন এই শোভাযাত্রা আনন্দ শোভাযাত্রা নামে পরিচিত হলেও ১৯৯৬ সাল থেকে তা মঙ্গল শোভাযাত্রা নামে পরিচিত হতে থাকে। সফল এ শোভাযাত্রায় সকল বর্ণ-ধর্মের মানুষের প্রচুর সাড়া পাওয়ায় প্রতি বছরই আয়োজিত হয় এ শোভাযাত্রা। এরপর ধীরে ধীরে এই মঙ্গল শোভাযাত্রার রীতি ছড়িয়ে পড়ে বরিশাল, ময়মনসিংহ এমনকি ভারতেও।
 
এখন দেশের সব জায়গাতেই পহেলা বৈশাখে মঙ্গল শোভাযাত্রা আয়োজন করা হয়। নিজস্ব সংস্কৃতি আর সত্তাকে বাঁচিয়ে রাখার প্রয়াস আর বর্ণিলভাবে বাংলা নববর্ষকে বরণ করে নেওয়ার এ মঙ্গল শোভাযাত্রা এখন বাঙালির প্রাণের মেলাও বটে।