সাম্প্রদায়িকতা ও সহিংসতার বিরুদ্ধে মানুষকে জাগ্রত করবার আহ্বান

আপডেট : ১৪ এপ্রিল ২০১৫, ১৩:২৩
 
বিশাল হাতের থাবা। যার একটি আঙ্গুল লাল। এ লাল রং সাম্প্রদায়িক শক্তির পরিচয় জানাচ্ছে। এই হাতের পাঞ্জা মানুষের গলা চেপে ধরার মতো করেই উপস্থাপিত হচ্ছে। ২৫ ফুট উচ্চতার এই স্থাপনাটি এগিয়ে চলছিল। এ স্থাপনা সাম্প্রদায়িকতা ও সহিংসতার বিরুদ্ধে মানুষকে জাগ্রত করবার আহ্বান জানাচ্ছে।
 
দেশের বিগত তিন মাসের সহিংসতা আর ধর্মরক্ষার নামে যে সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্প চলছে চারপাশে তারই প্রতিবাদ উঠে এলো চারুকলার মঙ্গল শোভাযাত্রায়। নানা শ্রেণী, পেশা, বর্ণ-ধর্ম নির্বিশেষে লাখো মানুষ এতে অংশ নেন। চারূকলা অনুষদের সামনে থেকে শুরু হওয়া এ শোভযাত্রা রূপসী বাংলা হোটেল মোড় ঘুরে আবারো চারুকলা অনুষদে এসে শেষ হয়।
 
মঙ্গল শোভাযাত্রায় অংশ নেওয়া এখন নববর্ষ উদযাপনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে পড়েছে। এবারও তার ব্যতিক্রম ঘটেনি। রঙ-বেরঙের মুখোশ, শোলার পাখি, পেঁচা, টেপা পুতুল, ঢাল-ঢোল-বাঁশি, লক্ষীর সরা, লাঙ্গল, নৌকা, মাথাল, লাঠি-বর্শা, তীর-ধনুক নিয়ে চারুকলা ইন্সটিটিউটের সামনের সড়কে সবাই জমায়েত হয়েছিলেন। উদ্দেশ্য একটাই—মঙ্গল শোভাযাত্রায় অংশ নেওয়া। ছেলেদের পরনে নানা বর্ণের পাঞ্জাবি-ফতুয়া আর নারীদের সাদা পেড়ে লাল শাড়ি, শিশু-কিশোরদের রঙ-বেরঙের পাঞ্জাবিতে বর্ণিল হয়ে ওঠে চারুকলার আশেপাশের এলাকা।
 
সামপ্রদায়িক শক্তি এবং অশুভকে বিতাড়নের অঙ্গীকারে বিভিন্ন প্রাণীর প্রতিকৃতি বহন করা হয় শোভাযাত্রার অগ্রভাবে। ছায়ানটের বর্ষবরণ অনুষ্ঠান শেষে শোভাযাত্রায় যোগ দেন হাজারো মানুষ। বাঘের মুখোশ, হাতপাখা, একতারা-দোতারা হাতে নিয়ে নানা বয়স ও  শ্রেণী পেশার মানুষ অংশ নেয় এ মঙ্গলযাত্রায়। অশুভ শক্তিকে বিনাশ করে বাংলাদেশকে সমৃদ্ধ ও সম্প্রীতির আবাস ভূমি হিসাবে গড়ে তুলবার প্রত্যয় ছিল সবার কণ্ঠে। দেশীয় বিভিন্ন বাদ্যযত্রের পাশাপাশি ভুভুজেলার আওয়াজে গর্জে ওঠে শাহবাগ।
 
মানিক বন্দোপাধ্যায়ের পঙক্তি ‘অনেক আলো জ্বালতে হবে মনের অন্ধকারে’-এ প্রতিপাদ্যে এবারের মঙ্গল শোভাযাত্রায় বিশেষ অতিথি হিসেবে অংশ নিয়েছেন থাইল্যান্ডের সংস্কৃতি মন্ত্রী উইরা রাজপুটচানারাত। শোভাযাত্রায় উপস্থিত ছিলেন সংস্কৃতি মন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক, চারুকলা অনুষদের ডিন অধ্যাপক নিসার হোসেনসহ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীসহ সমাজের সর্বস্তরের মানুষ।
 
এবারের স্থাপনার মধ্যে আরো ছিল পায়রা, কাকাতুয়া, মাছ, ঘোড়া, বাঘ থাকবে। এবারের বিশেষ আর্কষন থাকবে একটি ছাগল ও তার দুইটি ছানার স্থাপনা। যার মধ্য দিয়ে তুলে ধরে হচ্ছে গ্রাম বাংলার সমৃদ্ধিকে। কারণ, গ্রাম বাংলায় সমৃদ্ধির আশায় ছাগল মানত করে কোরবানি দেওয়া হয়। সেই বিষয়টিকে লক্ষ্য রেখেই এই স্থাপনাটি তৈরি হয়েছে।
 
এছাড়াও ২৮ ফুট উচ্চতার একটি টেপা পুতুল রয়েছে শোভাযাত্রায়। যেখানে কলসি হাতে নিয়ে মা তার দুই সন্তানকে নিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছেন। তবে আকৃতি বড় হওয়ায় এটি শোভাযাত্রায় অংশ না নিয়ে, চারুকলা অনুষদের সামনের রাস্তায় দাঁড় করিয়ে রাখা হয়েছিল। এবারের বেশিরভাগ স্থাপনাতেই প্রধান অনুসঙ্গ হিসেবে রাখা হয়েছে শিশুদের আকৃতি। এর কারণ হিসেবে উদ্যোক্তারা জানান, বাচ্চারাই সকল আনন্দের মূল অংশীদার। সে বিষয়টিকে খেলায় রেখেই আনন্দের প্রতীক হিসেবে অধিকাংশ স্থাপনাতেই বাচ্চাদেরকে রাখা হয়েছে। এসবের মাঝেও বিশাল এবারের শোভাযাত্রায় আরো রয়েছে বিশালাকৃতির হাতি। যা ভারতীয় উপমহাদেশের বরেন্য শিল্পী যামিনী রায়ের মোটিভ থেকে তৈরি করা হয়েছে। আরো রয়েছে রাজা-রানী, উজির-নাজির, বাঘ, পেঁচা, টেপা পুতুলসহ নানা লোকজ মোটিভের মুখোশ ও প্ল্যকার্ড নিয়ে শোভাযাত্রায় অংশ নিচ্ছেন সবাই।
 
এবারই প্রশ শোভাযাত্রাকে আরো বর্নিল করে তুলতে আকাশ পথ থেকে অংশগ্রহণকারীদের উপর লাল-সবুজের কাগজের টুকরো ছুঁড়ে ফেলা হয়। এর পাশাপাশি হাতে ও মুখে মুখোশ ধারণ করে শিশুরা শোভাযাত্রাতে উড়াচ্ছে ঘুড়ি। হাতে বড় মুখোশের পাশাপাশি শোভাযাত্রায় অংশগ্রহণকারীদের হাতে ছিলো কাগজের পাখি, পুতুল, চড়কা।
 
প্রসঙ্গত, ১৯৮৯ সালে চারুকলা অনুষদের উদ্যোগে প্রথমবারের মতো বের করা হয়েছিল মঙ্গল শোভাযাত্রা। সে বছরই লোকজনের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হয় এই আনন্দ শোভাযাত্রা। প্রথম শোভাযাত্রায় ছিল পাপেট, ঘোড়া, হাতি। তারপরের বছরে চারুকলার সামনে থেকে আনন্দ শোভাযাত্রা বের হয়। এ শোভাযাত্রায়ও নানা ধরনের শিল্পকর্মের প্রতিকৃতি স্থান পায়। এরপর থেকে এটা বাংলা বর্ষবরণের অপরিহার্য অনুষঙ্গ হয়ে ওঠে। তবে প্রথম দিকে এর নাম ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’ ছিল না। ১৯৯৬ সাল থেকে চারুকলার এই আনন্দ শোভাযাত্রা ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’ হিসেবে নাম লাভ করে।