রামপাল ও মাতারবাড়ি বিদ্যুৎ প্রকল্পে চরম দুর্নীতি: টিআইবি

আপডেট : ১৬ এপ্রিল ২০১৫, ১৯:৩০
 
 
 
 
রামপাল ও মাতারবাড়ি বিদ্যুত্ প্রকল্প বাস্তবায়নে পরিবেশ রক্ষা এবং মানুষের আর্থসামাজিক নিরাপত্তাকে গুরুত্ব না দেয়ার পাশাপাশি ভূমি অধিগ্রহণ ও ক্ষতিপূরণ প্রক্রিয়ায় চরম দুর্নীতি হয়েছে। এমনকি পরিবেশ সংরক্ষণ বিধিমালারও ব্যত্যয় ঘটেছে। দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) প্রাথমিক তদন্তেও মিলেছে দুর্নীতির সত্যতা। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) গবেষণায় এ সব তথ্য উঠে এসেছে।
বৃহস্পতিবার রাজধানীর ধানমন্ডিতে মাইডাস সেন্টারে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) প্রধান কার্যালয়ে ‘রামপাল ও মাতারবাড়ি বিদুত্ প্রকল্প: ভূমি অধিগ্রহণ ও পরিবেশগত প্রভাব সমীক্ষায় সুশাসনের চ্যালেঞ্জ’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে গবেষণা প্রতিবেদন উপস্থাপন করা হয়।
টিআইবি ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারপারসন অ্যাডভোকেট সুলতানা কামালের সভাপতিত্বে সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন প্রতিষ্ঠানটির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান, উপনির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক ড. সুমাইয়া খায়ের এবং রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি বিভাগের পরিচালক মোহাম্মদ রফিকুল হাসান প্রমুখ।
ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘প্রকল্প করতে যেসব পূর্বশর্ত রয়েছে, তা মানা হয়নি। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড বিচার করা হয়নি। যারা ক্ষতিপূরণ পাওয়ার কথা তারা পাননি। অন্য দিকে, এর প্রভাব পড়ছে সার্বিকভাবে আর্থ-সামাজিক খাতে।’
ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘সারা বিশ্বে কয়লা-ভিত্তিক বিদ্যুত্ প্রকল্প বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। আমাদের এখানে কয়লা-ভিত্তিক প্রকল্প হাতে নেয়া হয়েছে, যা পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষেত্রে বিরূপ প্রভাব পড়বে।’
সংবাদ সম্মেলনে রামপাল ও মাতারবাড়ি বিদ্যুত্ প্রকল্প দুটিতে পরিবেশগত প্রভাব সমীক্ষা সম্পাদনে বিভিন্ন অনিয়ম ও জমি অধিগ্রহণে বিভিন্ন পর্যায়ে দুর্নীতিসহ বিরাজমান সুশাসনের ঘাটতিজনিত বিভিন্ন সমস্যার ১২ দফা সুপারিশ তুলে ধরা হয়। গবেষণা প্রতিবেদন পাঠ করেন টিআইবির রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি বিভাগের ডেপুটি প্রোগ্রাম ম্যানেজার মোহাম্মদ হোসেন।
প্রতিবেদনে বলা হয়—রামপাল ও মাতারবাড়ি প্রকল্পে পরিবেশগত প্রভাব সমীক্ষা সম্পাদনে যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়নি। প্রকল্প এলাকায় ভূমি অধিগ্রহণে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাবাসী ক্ষতিপূরণের টাকা উত্তোলনের প্রতিটি স্তরেই অনিয়ম ও দুর্নীতির কারণে ন্যূনতম ক্ষতিপূরণ পাওয়া থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। ক্ষতিপূরণ প্রদানে প্রকল্পগুলোতে প্রতিটি ফাইল প্রসেসিংয়ে নিয়ম বহির্ভূতভাবে মোট ক্ষতিপূরণের ৩-১০ শতাংশ পর্যন্ত অগ্রিম ঘুষ প্রদান করেছে।
এ ছাড়া দুটি প্রকল্প এলাকাতেই সাধারণ মানুষকে বিদ্যুত্ প্রকল্পের বিষয়ে কোনো কিছু জানানো হয়নি। বিদ্যুেকন্দ্রগুলোর জন্য ভূমি অধিগ্রহণ ও ক্ষতিপূরণের ক্ষেত্রে ব্যাপক দুর্নীতি হয়েছে। যেখানে প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেছে। দুটি প্রকল্পের তথ্য উন্মুক্ত করার বা স্বপ্রণোদিত তথ্য প্রদানের কোনো ব্যবস্থা ছিল না, এমনকি এখনো নেই।
রামপাল ও মাতারবাড়ি বিদ্যুত্ প্রকল্পে ভূমি অধিগ্রহণ এবং পরিবেশগত প্রভাব সমীক্ষায় সুশাসন প্রতিষ্ঠায় টিআইবি উত্থাপিত ১২ দফা সুপারিশের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো— রামপাল ও মাতারবাড়ি তাপ বিদ্যুত্ প্রকল্পের জন্য প্রণীত পরিবেশগত প্রভাব সমীক্ষার জন্য আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন এবং স্বার্থের দ্বন্দ্ব থেকে মুক্ত বিশেষজ্ঞ প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তি কর্তৃক মূল্যায়ন সাপেক্ষে পরবর্তী করণীয় নির্ধারণ, ভূমি অধিগ্রহণ ও পুনর্বাসন কর্মপরিকল্পনা অনুসারে মূল্য নির্ধারণ, উপদেষ্টা পর্ষদ ও পুনর্বাসন উপদেষ্টা কমিটি গঠনের মাধ্যমে রামপাল ও মাতারবাড়ি প্রকল্পে ক্ষতিগ্রস্ত জমির মালিকদের ক্ষতিপূরণ পুনর্নির্ধারণ, নিরপেক্ষ প্রতিষ্ঠান কর্তৃক জরিপপূর্বক এ দুটি প্রকল্পের সব ধরনের ক্ষতিগস্ত ব্যক্তিদের তালিকা প্রণয়ন এবং নির্ধারিত ক্ষতিপূরণের পরিমাণসহ বিস্তারিত জনসম্মুখে প্রকাশ, ভূমি অধিগ্রহণের ক্ষেত্রে ভূমি অধিগ্রহণ শাখা কর্তৃক প্রকল্প এলাকায় ‘ওয়ান স্টপ’ সার্ভিসের মাধ্যমে স্বল্প সময়ে ক্ষতিপূরণ প্রদানের ব্যবস্থা, প্রকল্পগুলোতে ভূমি অধিগ্রহণের ক্ষতিপূরণ পাওয়া ও পুনর্বাসনের বিষয়ে অভিযোগ জানানো এবং অভিযোগ নিষ্পত্তির ব্যবস্থা এবং প্রকল্পগুলোতে ভূমি অধিগ্রহণ ও ক্ষতিপূরণ প্রদানে দুর্নীতির ঘটনা তদন্তের মাধ্যমে প্রমাণ সাপেক্ষে দোষীদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ।