চট্টগ্রাম থেকে দোহাজারী-কক্সবাজার হয়ে মিয়ানমার সীমান্তবর্তী ঘুনধুম পর্যন্ত রেলপথ নির্মাণের বিষয়টি প্রথম আলোচনায় আসে ১৮৯০ সালে। এর প্রেক্ষিতে ১৯০৮-০৯ ও ১৯১৭-১৯ সালে দু’দফা সমীক্ষা চালায় মিয়ানমার রেলওয়ে। এই সমীক্ষার ভিত্তিতে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে চট্টগ্রাম থেকে দোহাজারী পর্যন্ত ৫০ কিলোমিটার রেলপথ নির্মাণ হলেও যুদ্ধের কারণে বাকী কাজ থেমে যায়। পাকিস্তান শাসনামলে ১৯৫৮ ও ৭১ সালে আরো দুইদফা ব্যর্থ হয়েছে এই রেলপথ নির্মাণের উদ্যোগ। স্বাধীনতার পর আরো তিনদফা উদ্যোগ নিয়েও এই প্রকল্প আলোর মুখ দেখেনি।
বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর ২০০৯ সালে আবারো রেলপথটি নির্মাণের ব্যপারে উদ্যোগ শুরু হয়। ২০১১ সালের এপ্রিলে ১৮ হাজার ৩৫ কোটি টাকার ব্যয় লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে এই প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়। এরপর কিছু আইনি জটিলতা, বন বিভাগের মালিকানার জমি অধিগ্রহণে প্রতিকূলতাসহ নানা কারণে গতি পাচ্ছিলো না এই প্রকল্প। তবে সাম্প্রতিক সময়ে এই প্রকল্প গতি পেয়েছে দাবি করে রেলপথ মন্ত্রী বলছেন, ২০২২ সালের মধ্য প্রকল্পের কাজ শেষ হবে এবং ট্রেনে চেপে কক্সবাজার যাওয়ার স্বপ্ন পূরণ হবে। সেই সাথে ট্রান্স এশিয়ান রেলওয়ে করিডোর ও সিল্করুটে যুক্ত হবে বাংলাদেশ।
গত বৃহস্পতিবার রেলপথ মন্ত্রী মো. নূরুল ইসলাম সুজন প্রকল্পটি পরিদর্শন করেছেন। পরিদর্শন শেষে ইত্তেফাককে তিনি বলেন, ‘এটি সরকারের অগ্রাধিকার প্রকল্প। সে কারণে প্রতিকূল আবহাওয়াতেও দ্রুতবেগে কাজ করা হচ্ছে। ইতিমধ্যে জমি অধিগ্রহণের কাজ প্রায় শেষ। দোহাজারী থেকে কক্সবাজার অংশে মাটি ভরাট, ব্রীজ নির্মাণের কাজ চলছে। প্রকল্পের কাজ ইতিমধ্যে দৃশ্যমান হতে শুরু করেছে। বর্ষার সময়েও যাতে কাজ বন্ধ না হয়, সেই ব্যবস্থা করা হয়েছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগ কিংবা নতুন কোনো প্রতিবন্ধকতা না আসলে নির্দিষ্ট সময়ে এই প্রকল্পের কাজ শেষ হবে। হয়তো তার আগেও শেষ হতে পারে।’
এক প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী ইতিমধ্যে ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম রুটে হাই স্পিড ট্রেন চালুর নির্দেশ দিয়েছেন। আমাদের পরিকল্পনা আছে, সেই ট্রেন সার্ভিসটি চট্টগ্রাম রুট হয়ে কক্সবাজার পর্যন্ত নিয়ে যাওয়ার। এই ট্রেন ঘন্টায় ৩০০ কিলোমিটার গতিতে চলবে। ঢাকা-চট্টগ্রাম মাত্র এক ঘণ্টায় আসা যাওয়া করা যাবে। আর চট্টগ্রাম থেকে কক্সবাজার যেতে ৩০ মিনিটের কম সময় লাগবে।’
প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, চট্টগ্রাম হয়ে দোহাজারী-রামু-কক্সবাজার যাওয়ার পথে রামু হবে জংশন স্টেশন। সেখান থেকে একটি লাইন চলে যাবে কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতের পাশে। সৈকতের স্টেশনটি হবে বিশাল ঝিনুক আকৃতির। এই ঝিনুকের ভিতরেই হবে প্লাটফর্ম এবং লাউঞ্জ। আরেকটি লাইন পূর্বদিকে মিয়ানমার সীমান্তবর্তী ঘুমধুম যাবে। ভবিষ্যতে এই রেললাইন ঘুমধুম থেকে ট্রান্স এশিয়ান রেলওয়ে করিডোরে যুক্ত হবে।
যা আছে প্রকল্পে :
২০২২ সালের জুনে এই প্রকল্পের কাজ শেষ করার লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করা হয়েছে। এই প্রকল্পের আওতায় দোহাজারী থেকে রামু পর্যন্ত ৮৮ কিলোমিটার, রামু থেকে কক্সবাজার ১২ কিলোমিটার এবং রামু থেকে ঘুমধুম পর্যন্ত ২৮ কিমি রেলপথ নির্মাণ হবে। রেলপথের সাঙ্গু, মাতামুহুরী ও বাঁকখালী নদীর ওপর বড় আকৃতির তিনটি সেতু নির্মাণ করা হবে। এছাড়া রেলপথের বিভিন্ন অংশে ৪৩টি ছোট আকৃতির সেতু, ২০১টি কালভার্ট, সাতকানিয়ার কেঁওচিয়া এলাকায় একটি ফ্লাইওভার, ১৪৪টি লেভেল ক্রসিং এবং রামু ও কক্সবাজার এলাকায় দুটি হাইওয়ে ক্রসিং নির্মাণ করা হবে। সর্বমোট ১২৮ কিলোমিটার এই রেলপথে স্টেশন হবে নয়টি। এগুলো হলো- সাতকানিয়া, লোহাগাড়া, চকরিয়ার রামপুর, ডুলাহাজারা, ঈদগাও, রামু, কক্সবাজার, উখিয়া ও ঘুনধুম। এতে কম্পিউটার বেইজড ইন্টারলক সিগন্যাল সিস্টেম থাকবে ৯টি, ডিজিটাল টেলিকমিউনিকেশন সিস্টেম থাকবে ৯টি।
জানতে চাইলে প্রকল্প পরিচালক মো. মফিজুর রহমান গতকাল ইত্তেফাককে বলেন, ‘সার্বিকভাবে প্রকল্পের কাজ ২২ শতাংশের কিছু বেশি শেষ হয়েছে। কাগজে কলমে ভূমি অধিগ্রহণের কাজ শেষ। যদিও অধিগ্রহনকৃত ভূমির সীমানা চিহূিতকরণের কাজ কিছু অংশে বাকী আছে। ক্ষতিপূরণের টাকা পরিশোধ বাকী আছে। তবে এগুলো মাসখানেকের মধ্যেই শেষ হবে।
যে কারণে গুরত্বপূর্ণ :
ব্রিটিশ আমল থেকে বার বার উদ্যোগ নিয়েও হোঁচট খাওয়া এই প্রকল্পটি দক্ষিণ চট্টগ্রাম, কক্সবাজারের আঞ্চলিক বাণিজ্য, পর্যটনসহ নানা কারণে অধিক গুরত্বপূর্ণ। এই প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে ওই এলাকায় ব্যবসা বাণিজ্যসহ অপার সম্ভাবনার দ্বার উন্মুক্ত হবে। কক্সবাজার, সেন্টমার্টিনমুখী পর্যটক ও স্থানীয়দের জন্য নিরাপদ, আরামদায়ক, সাশ্রয়ী ও পরিবেশবান্ধব যোগাযোগের সুযোগ তৈরী হবে। সহজে ও কম খরচে মাছ, লবণ, কাগজের কাঁচামাল, বনজ ও কৃষিজ দ্রব্যাদি পরিবহনে গতি আসবে।
