মানুষ পুড়িয়ে কীভাবে তিনি এখন ভোট চান :প্রধানমন্ত্রী

আপডেট : ২০ এপ্রিল ২০১৫, ০০:১৪

প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়া এতদিন আগুন দিয়ে বাস পুড়িয়েছেন, জীবন্ত মানুষ পুড়িয়ে হত্যা করেছেন। এখন আবার তিনি বাসের পক্ষে লিফলেট বিলি করছেন। এতদিন বাস পুড়িয়ে এখন কোন্ মুখে সেই বাস মার্কায় ভোট চান তিনি? আর পত্র-পত্রিকা কীভাবে তারই এত প্রচার করে? তিনি বলেন, আগুন দেয়া ও মানুষ হত্যার সঙ্গে যে বিএনপি-জামায়াত জড়িত তার প্রমাণও আসতে শুরু করেছে। যত বেশি তদন্ত হচ্ছে, ততই এগুলো বেরিয়ে আসতে শুরু করেছে। পরিকল্পিতভাবে খালেদা জিয়া এই ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছেন।

 
গতকাল রবিবার রাজধানীর খামারবাড়ির কৃষিবিদ ইনস্টিটিউট মিলনায়তনে কৃষক লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তৃতায় প্রধানমন্ত্রী এ কথা বলেন। প্রধানমন্ত্রী যখন বক্তব্য রাখছিলেন তখনো রাজধানীর উত্তরায় ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন নির্বাচনের প্রচারণায় নেমে তাবিথ আউয়ালের পক্ষে বাস প্রতীকে ভোট চাচ্ছিলেন বিএনপি চেয়ারপারসন।
 
অবরোধ-হরতালের নামে বিএনপি জোটের গত তিন মাসের নৈরাজ্য, সন্ত্রাস ও মানুষ পুড়িয়ে হত্যার কথা তুলে ধরে শেখ হাসিনা বলেন, বাস পোড়ানোর টাকা আবদুল আউয়াল মিন্টুই সরবরাহ করেছেন, তার টাকায়ই এসব হয়েছে। বাস পুড়িয়ে খালেদা নেত্রী এখন কোন্ মুখে সেই বাস মার্কা নিয়েই নামেন? এ প্রসঙ্গে মিডিয়ার ভূমিকারও কঠোর সমালোচনা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমাদের সব পত্রিকাতেও দেখলাম বিএনপি নেত্রীর লিফলেট বিলির বড় বড় ছবি, হেডলাইন। আমি উন্নয়ন কাজের উদ্বোধন করলাম তার কোনো হেডলাইন হলো না! হলো যিনি পেট্রোল বোমা মেরে মানুষ হত্যা করলেন তারই। 
 
তিন মাসের অবরোধকালে খালেদা জিয়ার গুলশান কার্যালয়ে অবস্থানের প্রসঙ্গে শেখ হাসিনা বলেন, খালেদা জিয়া কেন ঘর ছেড়ে টানা ৯২ দিন তার অফিসে বসে থাকলেন, সেই রহস্যই এখনও বুঝলাম না। আওয়ামী লীগ সরকারকে উত্খাত না করে তিনি নাকি ঘরে ফিরবেন না। আগুন দিয়ে পুড়িয়ে তিনি সরকার উত্খাত করবেন! আর তিনি অফিসে বসে মানুষ হত্যা করলেন, কৃষক-শ্রমিক মেহনতি মানুষ সবারই ক্ষতি করলেন, সবার জীবনই ধ্বংস করলেন। উনাকে প্রশ্ন করি, ঘরে কী আপনি ফিরেননি? আর আওয়ামী লীগও তো ক্ষমতায়ই আছে। খালেদা জিয়ার উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এই যে ছোট্ট শিশুকে হত্যা করলেন, তার কী অপরাধ ছিল? তাকে কেন আগুন দিয়ে পোড়ানো হলো? এর জবাব তো জাতির কাছে খালেদা জিয়াকেই দিতে হবে। 
 
৫ জানুয়ারির নির্বাচন-পূর্ব বিএনপি-জামায়াতের সন্ত্রাস-নৈরাজ্য এবং পঁচাত্তর-পরবর্তী জিয়াউর রহমান সরকারসহ বিগত বিএনপি ও চারদলীয় জোট সরকারের দুর্নীতি-দুঃশাসনের কথাও তুলে ধরে শেখ হাসিনা বলেন, এদেশের রাজনীতিকে কলুষিত করা, সন্ত্রাস-দুর্নীতি ও জঙ্গিবাদ সৃষ্টি, মানুষ হত্যা, সবই বিএনপি সৃষ্টি করেছে। জিয়াউর রহমান অবৈধভাবে ক্ষমতায় এসে হাজার হাজার মুক্তিযোদ্ধা ও সৈনিক হত্যা করেছেন, কৃষক-শ্রমিক-মেহনতি মানুষকে নির্যাতন করেছেন। তার স্ত্রী খালেদা জিয়াও ক্ষমতায় এলে মানুষের একই ভোগান্তি পোহাতে হয়। শুধু সারের দাবিতে আন্দোলন করার অপরাধে ১৮ জন কৃষককে গুলি করে হত্যা করা হয়েছিল।
 
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিএনপি যখনই ক্ষমতায় আসে তখনই মানুষের জীবনে বিড়ম্বনা শুরু হয়। আসলে খালেদা জিয়া মানুষের কল্যাণ করবেন কীভাবে? তিনি তো দেশের স্বাধীনতাই চাননি, স্বাধীনতায় বিশ্বাসও করেন না। তার মুখেও কোনো ট্যাক্স নেই। যা ইচ্ছা তাই মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিতে পারেন তিনি। আর ক্ষমতায় গেলেই সবকিছু ভুলে যান। এটাই তার চরিত্র।
 
২০২১ সালের মধ্যে দেশকে ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত করার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করে এই কাজে কৃষক লীগ নেতাকর্মীদের সহযোগিতা কামনা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, খালেদা জিয়া চেয়েছিলেন, হরতাল-অবরোধ দিয়ে কৃষি-কৃষক ও উত্পাদনসহ সবকিছু ধ্বংস করে দিতে। তারপরও আমরা সব ষড়যন্ত্র মোকাবেলা করেই এগিয়ে যাচ্ছি। এদেশ এগিয়ে যাচ্ছে, এগিয়ে যাবেই।
 
কৃষক লীগের সভাপতি মোতাহার হোসেন মোল্লার সভাপতিত্বে সভায় আরো বক্তব্য রাখেন আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য বেগম মতিয়া চৌধুরী, উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য ড. মির্জা জলিল, সাংগঠনিক সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, কৃষি ও সমবায় সম্পাদক ড. আবদুর রাজ্জাক, কৃষক লীগের সাধারণ সম্পাদক খন্দকার শামসুল হক রেজা, সাবেক সাধারণ সম্পাদক হারুন-অর-রশীদ হাওলাদার, কেন্দ্রীয় নেতা খান আলতাব হোসেন বুলু, ছবি বিশ্বাস, আশালতা বৈদ্য প্রমুখ।
 
সবাইকে নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ
 
করার নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর
 
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ‘একটি বাড়ি একটি খামার’ প্রকল্প যথাযথভাবে বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট সবাইকে নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করার নির্দেশ দিয়েছেন। একই সঙ্গে তিনি প্রকল্প বাস্তবায়নের অগ্রগতি ও এর সার্বিক কার্যক্রমের নিবিড় পর্যবেক্ষণ অব্যাহত রাখার নির্দেশনাও দেন। গতকাল রবিবার প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে ‘একটি বাড়ি একটি খামার’ প্রকল্পের উপদেষ্টা কাউন্সিলের সভায় তিনি এসব নির্দেশনা দেন। সভা শেষে প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব একেএম শামীম চৌধুরী সাংবাদিকদের এ তথ্য জানান।
 
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আওয়ামী লীগ ছাড়া অতীতে যারা রাষ্ট্র ক্ষমতায় ছিল তারাই এ দেশকে সন্ত্রাসী এবং জঙ্গি রাষ্ট্রে পরিণত করতে চেয়েছিল। বিএনপি নেতারা এ দেশের মানুষকে ভিক্ষুকের জাতি হিসেবে পরিণত করতে চায়। তিনি বলেন, বাংলাদেশ যদি মুক্তিযুদ্ধে বিজয় অর্জন করতে পারে, তাহলে দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে আমরা জয়ী হব না কেন? বাংলাদেশ উন্নত হবে না কেন? আমাদের গৃহীত পদক্ষেপে বাংলাদেশ এখন উন্নয়নের রোল মডেল। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ১৯৯৬ সাল থেকে আমরা সামাজিক নিরাপত্তার দিকে গুরুত্ব দিয়েছি। কোথায় সাহায্য করলে বাংলাদেশের মানুষগুলো নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারবে সেদিকে নজর দিয়েছি। আমরা বয়স্ক-ভাতা, বিধবা-ভাতা থেকে শুরু করে ছাত্র-ছাত্রীদেরও ভাতার ব্যবস্থা করেছি। শেখ হাসিনা বলেন, আমরা মানুষকে সাহায্য করে যাচ্ছি, অন্যদিকে মানুষ যেন সাহায্যের ওপর নির্ভরশীল না হয় সেই চিন্তা মাথায় রেখে তাদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করছি।
 
একটি বাড়ি একটি খামার প্রকল্পের মেয়াদ ২০০৯ থেকে ২০১৪ পর্যন্ত হলেও পরে সংশোধন করে ২০১৬ পর্যন্ত বৃদ্ধি করা হয়েছে। জেলা প্রশাসনের মাধ্যমে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয় দেশের প্রতিটি ইউনিয়ন ও ওয়ার্ডে ৪০ হাজার ৫২৭টি গ্রামে এ প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। প্রকল্পের আওতায় উত্পাদিত পণ্যের বাজারজাতকরণের জন্য ইতোমধ্যে ২৭৪টি বাজার গড়ে তোলা হয়েছে। দেশের প্রতিটি জেলা-উপজেলা ও গ্রোথ সেন্টারগুলোতে উত্পাদিত পণ্য বিপণনের জন্য সমবায়ভিত্তিক বাজার গড়ে তুলতে হবে বলে সভায় সিদ্ধান্ত হয়েছে। এছাড়া প্রকল্পের অগ্রগতি ও কার্যক্রমের নিবিড় তত্ত্বাবধান অব্যাহত রাখতে হবে বলেও সিদ্ধান্ত হয়েছে।
 
প্রকল্পের আওতায় উত্পাদিত পণ্য বাজারজাত করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, একটি বাড়ি একটি খামার প্রকল্পটি হলো গ্রামের প্রতিটি বাড়ি একটি স্বাবলম্বী ইউনিট হিসেবে তৈরি করা।
 
একটি বাড়ি একটি খামার প্রকল্পে উপকারভোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২২ লাখ; যার মধ্যে ৬০ ভাগ নারী। মাসিক ২০০ টাকা সঞ্চয়ের বিপরীতে সরকারি দ্বিগুণ সহায়তায় মাধ্যমে দুই হাজার কোটি টাকার স্থায়ী তহবিল গঠন করা হয়েছে। প্রকল্পের মাধ্যমে পারিবারিক উত্পাদন বৃদ্ধির ফলে প্রকল্পের সদস্যদের বার্ষিক আয় ১০ হাজার ৯২১ টাকা বৃদ্ধি পেয়েছে।
 

সভায় স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম, কৃষিমন্ত্রী বেগম মতিয়া চৌধুরী, পরিবেশ ও বন মন্ত্রী আনোয়ার হোসেন মঞ্জু, পরিকল্পনামন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল, ভূমিমন্ত্রী শামসুর রহমান শরীফ, স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, সমবায় ও পল্লী উন্নয়ন প্রতিমন্ত্রী মশিউর রহমান রাঙ্গা, ভূমি প্রতিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদ, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব আবুল কালাম আজাদসহ সংশ্লিষ্টরা উপস্থিত ছিলেন।