শেষ হলো বইওয়ালা পলান সরকারের পথচলা

আপডেট : ০১ মার্চ ২০১৯, ২২:৫৭

গ্রামে গ্রামে ঘুরে পাঠকদের দোড়গোড়ায় বইয়ের আলো হাতে পৌঁছে যেতেন পলান সরকার। সেই পলান সরকার আর কোনো দিন বইয়ের আলো বিতরণ করবেন না। শুক্রবার দুপুর ১২টা ২০ মিনিটের দিকে ৯৮ বছর বয়সে নিজ বাড়িতে তিনি ইন্তেকাল করেছেন (ইন্নালিল্লাহি ... রাজিউন)। তিনি বার্ধক্যজনিত বিভিন্ন রোগে ভুগছিলেন। পলান সরকারের মৃত্যুর বিষয়ে নিশ্চিত করেন তার ছেলে স্থানীয় খাগড়বাড়িয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক হায়দার আলী। তিনি জানান, আজ শনিবার সকাল ১০টায় স্থানীয় হারুন-অর-রশিদ দ্বিমুখী উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে জানাজা নামাজ শেষে তাকে পারিবারিক গোরস্থানে দাফন করা হবে।

নিজের টাকায় বই কিনে পাঠকের বাড়ি বাড়ি পৌঁছে দিয়ে বই পড়ার একটি আন্দোলন গড়ে তোলার অবদান স্বরূপ পলান সরকার ২০১১ সালে একুশে পদক পান।                  ২০০৭ সালের শুরুর দিকে তাকে নিয়ে জাতীয় দৈনিকে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। পরে সরকারিভাবে তার বাড়ির আঙিনায় একটি পাঠাগার নির্মাণ করে দেয়া হয়। ২০১৪ সালের ২০ সেপ্টেম্বর ‘ইমপ্যাক্ট জার্নালিজম ডে’ উপলক্ষে বিশ্বের ভিন্ন ভাষার প্রধান প্রধান দৈনিকে একযোগে পলান সরকারের বই পড়ার এই আন্দোলনের গল্প ছাপা হয়। সারা দেশে তাকে বহুবার সংবর্ধনা দেয়া হয়েছে। তাকে নিয়ে ‘সায়াহ্নে সূর্যোদয়’ নামে একটি নাটক তৈরি হয়েছে।

১৯২১ সালে নাটোর জেলার বাগাতিপাড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। মাত্র পাঁচ মাস বয়সে তার বাবা হায়াত উল্লাহ সরকার মৃত্যুবরণ করেন। চতুর্থ শ্রেণি পর্যন্ত পড়ার পর অর্থনৈতিক সংকটে লেখাপড়া বন্ধ হয়ে যায় তার। এরপর-নানা ময়েন উদ্দিন সরকার এবং মা মইফুন নেসা পলান সরকারকে রাজশাহীর বাঘা উপজেলার বাউসা গ্রামে নিজ বাড়িতে নিয়ে আসেন। সেখানে তিনি একটি স্কুলে ভর্তি হন। বাবা-মা নাম রেখেছিলেন হারেজ উদ্দিন সরকার। তবে পলান সরকার নামেই তাকে চেনেন মানুষ।

পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, টাকার অভাবে ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ার সময়ই তাকে লেখাপড়ায় ইতি টানতে হয়। পরে নিজে নিজেই চালিয়ে যান পড়ালেখা। স্থানীয় একটি হাইস্কুলের পরিচালনা পরিষদের সভাপতি ছিলেন পলান সরকার। তিনি ছিলেন বই পাগল মানুষ। প্রতিবছর স্কুলের ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে যারা ১ থেকে ১০-এর মধ্যে মেধা তালিকায় স্থান পাবে, তাদের তিনি একটি করে বই উপহার দিতেন। এখান থেকেই শুরু হয় তার বই বিলির অভিযান। এরপরে তিনি সবাইকে বই দিতেন। ডাক্তারি পরীক্ষায় ডায়াবেটিস ধরা পড়ার পর নিজেই হেঁটে হেঁটে বই বিলি করতেন। একটানা ৩০ বছরের বেশি সময় ধরে করেন এ কাজ। রাজশাহী অঞ্চলের বেশ কয়েকটি গ্রামজুড়ে তিনি গড়ে তুলেছেন বই পড়ার এক অভিনব আন্দোলন।

পলান সরকার ৬ ছেলে, ৩ মেয়েসহ অসংখ্যগুণগ্রাহী রেখে গেছেন। তার মৃত্যুতে রাজশাহী-৬ (বাঘা-চারঘাট) আসনের সংসদ সদস্য ও পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম তার পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানান। এছাড়া বাঘা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শাহিন রেজা, উপজেলা চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট লায়েব উদ্দীন লাভলু, আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আশরাফুল ইসলাম বাবুল, উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান শফিউর রহমান শফি, বাউসা ইউনিয়ন চেয়ারম্যান শফিকুল ইসলামসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ শোক প্রকাশ ও সমবেদনা জানিয়েছেন।

এদিকে রাজশাহী সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি কাজী শাহেদ ও সাধারণ সম্পাদক তানজিমুল হক, বাঘা প্রেসক্লাবের সভাপতি আবদুল লতিফ মিঞা, সাধারণ সম্পাদক নুরুজ্জামান, বাঘা উপজেলা জাতীয় সাংবাদিক সংস্থার সভাপতি আমানুল হক আমান, সাধারণ সম্পাদক লালন উদ্দীন তার পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানান।

পলান সরকার খুব গুছিয়ে কথা বলতে পারতেন। কথা বলে মানুষকে হাসাতে পারতেন। কাঁদাতেও পারতেন। তার বই পড়ার আন্দোলন সম্পর্কে এক সাক্ষাত্কারে পলান সরকার বলেন, ‘আমি হাঁটতে হাঁটতে এই সমাজটাকে বদলানোর আন্দোলনে নেমেছি। যত দিন আমি হাঁটতে পারি, তত দিন আমার আন্দোলন চলবেই। আমি হাঁটতে হাঁটতে মানুষের বাড়িতে বই পৌঁছে দেবই। যারা পাঠাগারে আসবেন, তারা ইচ্ছেমতো বই পড়বেন। তবে আমার বয়স হয়েছে। জানি না আর কত দিন হাঁটতে পারব। যেদিন আমার পথচলা থেমে যাবে, সেদিন এই পাঠাগার আমার পক্ষে আন্দোলন করে যাবে।’