যৌন সন্ত্রাস: প্রয়োজন মনস্তাত্ত্বিক উন্নয়ন

আপডেট : ২৩ এপ্রিল ২০১৫, ১৫:৪১
বাংলা নববর্ষ উদযাপনের সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি ও সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে নারীদের হেনস্থা ও যৌন সন্ত্রাস নিয়ে বিস্তর আলোচনা হয়েছে। তবে যা ঘটেছে তাকে যৌন হয়রানি না বলে যৌন সন্ত্রাস বলাই বেশি উপযুক্ত। কারণ সংঘবদ্ধভাবে এবং ঘণ্টাব্যাপী এ ধরনের কাজ যে বা যারা করতে পারেন তারা কোনভাবেই সন্ত্রাসীর চেয়ে কম নয়।
 
মজার বিষয় হল, যখন থেকে আমরা ঘটনাটি জানলাম তখন থেকেই নিজেদের মতো করে বিভিন্ন ধারণা এর সঙ্গে যুক্ত করে দিয়েছি। তথাকথিত প্রগতিশীলরা বলেছেন, এটি মৌলবাদীদের কাজ, কারণ তারা চায় না আমরা নববর্ষ পালন করি। সরকারবিরোধীরা বলেছেন, এটি সরকারদলীয় সংগঠনের কাজ। আবার অনেকে এই ঘটনার নিন্দা জানানোর পাশাপাশি নারীদের পোশাক বিষয়ে সচেতনও হতে বলেছেন।
 
কিন্তু আমি মনে করি, এসব ঘটনার পিছনে যারাই থাকুক না কেন, এ ধরনের কাজে সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলে আমাদের পুরুষতান্ত্রিক সমাজ। নববর্ষের মতো উত্সব আয়োজনের দিনে ব্যাপক হারে নারীদের লাঞ্ছনা করায় বিষয়টি আমাদের সামনে এখন গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে উপস্থিত হয়েছে। কিন্তু এ ধরনের ঘটনা প্রতিদিন প্রতি মুহূর্তে আমাদের দেশের রাস্তাগুলোতে দিনে-দুপুরে হচ্ছে। পাড়া-মহল্লায় এমনকি ঘরের ভেতরেও রেহাই পাচ্ছে না নারীরা। আমরা মুখে যতই নারী মুক্তির কথা বলি, নারীর উন্নয়ন বা নারীর ক্ষমতায়নের কথা বলি না কেন, আমরা পুরুষরা কখনোই চাই না নারীরা আমাদের অধীনতা থেকে মুক্ত হোক। আর এজন্যেই ঘরে-বাইরে সব জায়গায় নারীসমাজ নিপীড়িত হলেও আমরা দুইদিন মিছিল আর তিনদিন ফেইসবুক স্ট্যাটাস দিয়ে সব ভুলে যাই। অন্যদিকে যে নারীর সঙ্গে এমন ঘটে তাকে আমরাই পরামর্শ দেই এসব ঘটনা যেন প্রকাশ করা না হয়। আমরাই বলছি বিচারহীনতার সংস্কৃতির জন্যে বার বার এমন হচ্ছে, আবার আমরাই নারীকে বলছি প্রতিবাদ না করতে।
 
যৌন সন্ত্রাসকে পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতার একটি উপজাত বা বাইপ্রোডাক্ট ব্যতীত অন্য কিছু মনে করা যায় না। পুরুষতান্ত্রিক এই দৃষ্টিভঙ্গি সারা বিশ্বে বিদ্যমান প্রাচীনকাল থেকেই। নরওয়েজিয়ান ইউনিভার্সিটি অব সাইন্স এন্ড টেকনোলজি তাদের এক গবেষণায় উল্লেখ করে যে, একজন পুরুষের ক্ষমতা বুঝতে দুটি বিষয়ে আলোকপাত করা হত প্রাচীনকালে। প্রথমত, ঐ পুরুষের কয়জন সন্তান রয়েছে এবং দ্বিতীয়ত, ঐ সন্তানেরা কতজন নারীর গর্ভে জন্ম নিয়েছে। অর্থাত্ বহু নারীর সাথে সম্পর্কের কারণে একজন পুরুষ হয়ে যান ক্ষমতাশালী। আবার ২০০২ সালে উদিসা ইসলাম দেশের চারটি শীর্ষ জাতীয় দৈনিক পত্রিকায় প্রকাশিত ধর্ষণ সংবাদ বিশ্লেষণ করেছিলেন। এই গবেষণা প্রবন্ধের একটি উল্লেখযোগ্য বিশ্লেষণ ছিল যে, যেভাবে আমাদের সংবাদপত্র তথা গণমাধ্যম ধর্ষণের সংবাদের বর্ণনা প্রকাশ করে তার ফলে পুরুষ পাঠকদের মনে আক্রান্ত নারীর জন্যে সহানুভূতির সৃষ্টি না হয়ে উল্টো এক ধরনের উত্তেজক অনুভূতির উদ্ভব হয়। সর্বশেষ নববর্ষের ঘটনার বর্ণনা প্রদানের ক্ষেত্রেও কতিপয় সংবাদপত্র ও অনলাইন পোর্টালে জেন্ডার সংবেদনশীলতার অভাব ছিল প্রকটভাবে বিদ্যমান। এসব বিষয়ে সচেতন হতে না পারলে আমাদের গণমাধ্যম নারীর উন্নয়নে প্রত্যাশিত ভূমিকা পালন করতে পারবে না।
 
আমি বিশ্বাস করতে চাই নববর্ষের ঘটনা বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছিল। কিন্তু একই ঘটনা যখন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়েও ঘটে তখন একে আর বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলা যায় না। এটি এক ধরনের সংস্কৃতি যা দীর্ঘদিন ধরে পুরুষের চেতনায় গড়ে উঠেছে। আর যারা বলেন এসব ঘটনার জন্যে নারীর পোশাক দায়ী, শাড়ি না পরলেই এমন হয় না তাদের সাথে আসলে তর্কের কিছু নেই। ঘটনা যারা ঘটান তারা যৌন সন্ত্রাসী হলে, যারা এসব যুক্তি দেন তারা সন্ত্রাসের মদদদাতা ছাড়া কিছু নয়। এদের উভয়েরই বিচার প্রয়োজন, একইসঙ্গে সবার প্রয়োজন মনস্তাত্ত্বিক উন্নয়ন।
 

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়