রিখটার স্কেলে ৭ দশকি ৯ মাত্রার ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল ছিল কাঠমন্ডু ও পোখরার মাঝের লামজুং। ৮০ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ মাত্রার এই ভূমিকম্পে ইউনেস্কো ঘোষিত বিশ্ব ঐতিহ্য ধারাহারা টাওয়ার ধসে নিহত হয়েছেন ১৮০ জন। দেশটির হাসপাতাল থেকে শুরু করে বাড়িতে কেবল মানুষের আর্ত চিৎকার শোনা যাচ্ছে। বহু লোক এখনো নিখোঁজ রয়েছেন। ভূমিকম্পের আঁঁচ পড়েছে বাংলাদেশ এবং ভারতেও। বাংলাদেশে চারজন এবং সর্বশেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত ভারতে ৫৪ জন নিহত হওয়ার খবর নিশ্চিত হওয়া গেছে। আর ভূমিকম্পের পর বরফ ধসে মাউন্ট এভারেস্টে ১০ জন নিহত হয়েছেন। খবর বিবিসি, রয়টার্স, টাইমস অব ইন্ডিয়া ও এনডিটিভি’র।
উৎপত্তিস্থল লামজুং
গতকাল নেপালের স্থানীয় সময় বেলা সোয়া ১২টায় ভূমিকম্প আঘাত হানে। মার্কিন জিওলজিক্যাল সার্ভে (ইউএসজিএস) জানিয়েছে, কাঠমুন্ডু থেকে ৮১ কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে এবং পোখরা থেকে ৮০ কিলোমিটার পূর্বের লামজুং এলাকায় ভূমিকম্পের উপকেন্দ্র। লামজুং পোখরা উপত্যকার মধ্যে পড়ে। সেখানে ক্ষয়ক্ষতির কথা জানাতে হিয়ে নেপাল পুলিশের অন্যতম মুখপাত্র কমল সিং বলে, কম ঘনবসতিপূর্ণ হওয়া সত্ত্বেও পোখরায় বেশ কয়েকজনের মৃত্যু হয়। শুধুমাত্র গোর্খা জেলাতেই ১০ থেকে ১৫ জন প্রাণ হারিয়েছেন। ওই এলাকার সঙ্গে যোগাযোগ ব্যবস্থা সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হওয়ায় হতাহতের সংখ্যা নির্দিষ্ট করা যায়নি। তথ্য জোগাড়ের পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় বিপর্যয় মোকাবেলার চেষ্টা করা হচ্ছে বলে তিনি জানান।
ধ্বংসস্তূপ কাঠমন্ডু
সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে রাজধানী কাঠমন্ডু। সেখানে এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত দুই হাজার দুইশ জন নিহত হওয়ার খবর জানিয়েছে দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। প্রত্যক্ষদর্শী এবং গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, ভূ-কম্পনগুলো ৩০ সেকেন্ড থেকে দুই মিনিটের মধ্যে অনুভূত হয়। কাঠমন্ডুর ত্রিভূবন বিমানবন্দর থেকে বিমান চলাচল বন্ধ করে দেওয়া হয়। ভারতীয় বিমান সংস্থাগুলিও বিভিন্ন শহর থেকে তাদের কাঠমন্ডুগামী সমস্ত ফ্লাইট বাতিল করে দেয়। ঘনবসতিপূর্ণ শহরটিতে প্রচুর বাড়ি ভেঙ্গে পড়েছে। বেশ কিছু রাস্তায় দেখা যায় গভীর ফাটল। নেপালে ভারতীয় দূতাবাসের মুখপাত্র অভয় কুমার জানিয়েছেন, বহু পুরানো বাড়ির দেয়াল ভেঙ্গে পড়েছে। সব মানুষকে রাস্তায় নেমে আসতে দেখা গেছে।
নেপালের তথ্যমন্ত্রী মীনেন্দ্র রিজ্জাল বলেছেন, এই বিপর্যয় মোকাবেলায় তার দেশের আন্তর্জাতিক সহায়তা প্রয়োজন। বিধ্বস্ত ভবন থেকে উদ্ধার করে হতাহতদের হাসপাতালে নেওয়া হচ্ছে। হাসপাতালগুলোতে কেবল অ্যাম্বুলেন্সের শব্দ এবং মানুষের আর্ত চিৎকার শোনা যাচ্ছে। এদের মধ্যে অনেকেই হাত-পাসহ বিভিন্ন অঙ্গহানি হয়েছে।
ইন্টারনেটে পাওয়া বিভিন্ন ছবিতে দেখা যাচ্ছে, মহাসড়কসহ বিভিন্ন সড়কে বড় ধরনের ফাটল দেখা দিয়েছে। চলাচল গাড়ি ফাটলে আটকে পড়েছে। ১৯৩৪ সালে নেপালে ভয়াবহ ভূমিকম্পে নিহত হয়েছিল সাড়ে ৮ হাজার বেশি মানুষ।
আকর্ষণীয় টাওয়ারটি আর নেই
ইউনেস্কো’র বিশ্ব ঐতিহ্যের মর্যাদা পাওয়া ১৮৩২ সালে নির্মিত ১০০ ফুট উঁচু কাঠমুন্ডুর ধারাহারা টাওয়ার ভেঙ্গে পড়েছে। সেখানে ১৮০ জন নিহত হয়েছে। প্রায় দশ বছর আগে টাওয়ারটি জনসাধারণের জন্য খুলে দেওয়া হয়। টাওয়ারের ৯ তলায় ছিল একটি ব্যালকনি। এখান থেকে গোটা শহরকে সুন্দরভাবে দেখা যেত। কিন্তু কম্পনের জোরে পুরো টাওয়ারটিই ভেঙ্গে পড়ে।
বিপদে পর্যটকরা
হিমালয়ের কোলে অবস্থিত দুই কোটি ৮০ লাখ মানুষের এই দেশটিতে আটকা পড়েছেন কয়েক হাজার পর্যটক। বসন্তে বিভিন্ন দেশ থেকে নেপালে প্রতি বছর প্রায় তিন লাখ পর্যটকের সমাগম ঘটে। হিমালয়ের এভারেস্ট পর্বতশৃঙ্গে বরফ ধসে অন্তত দশ জন নিহত হয়েছেন। হিমালয় অভিযানে যাওয়া পর্বতারোহীদের একটি বেস ক্যাম্পের একাংশ বরফের ধসে চাপা পড়েছে। ভূমিকম্পের কারনেই জমাট বাধা এই বরফে ধস শুরু হয়। এই সময় অন্তত ১ হাজার পর্বাতোরোহী এভারেস্টে আরোহনের উদ্দেশ্যে সেখানে অবস্থান করছিলেন।
পর্যটন কর্মকর্তা মোহন কৃষ্ণ সাপকোতা বলেন, কতজন নিহত হয়েছে সেই বিষয়টি নির্দিষ্ট করে বলা খুব কঠিন। এভারেস্টে একে অপরের সঙ্গেও যোগাযোগ করতে পারছেন না। সেখানে ভারতের ১২৫ তীর্থযাত্রীর আটকে পড়ার খবর পাওয়া গেছে।
