প্রায় কাটা পড়েছিল আইএসের ‘মাথা’!

আপডেট : ২৭ এপ্রিল ২০১৫, ১২:১১
বর্তমান বিশ্বে সবচে’ মূর্তিমান আতঙ্কের নাম কি— এই প্রশ্নের জবাবে কেউ আর আল-কায়েদা কিংবা তালেবানের নাম বলবে না। সংবাদপত্র কিংবা টিভি খবরের সাথে যাদের একটু সখ্যতা আছে তারা সবাই বলবে, নামটি আইএস বা ইসলামিক স্টেট। ইরাক ও সিরিয়া জুড়ে ‘খিলাফত’ শাসন কার্যকর করার জন্য জন্ম নিয়েছিল সংগঠনটি। কিন্তু বর্তমানে তারা ‘খিলাফত’ শাসনের আওতা বাড়িয়ে গোটা বিশ্বকে টার্গেট করেছে। মানুষের মনে ভয় সৃষ্টি করতে তারা একের পর এক বিদেশি বন্দিকে শিরশ্ছেদ করে ভিডিও প্রকাশ করছে। বিশ্ব মিডিয়ায় আলোচিত নাম তাই আইএসের। সেই আইএসের শীর্ষনেতা বা ‘মাথা’ হচ্ছেন আবু বকর আল-বাগদাদি, যিনি নিজেকে খলিফা ঘোষণা করে তার বাহিনীকে নির্দেশ দিয়েছেন দুনিয়াজুড়ে তার শাসন ছড়িয়ে দিতে। এ কারণে তিনি মার্কিনবাহিনীর অন্যতম টার্গেটে পরিণত হয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রিটেনের সম্মিলিতবাহিনী তাকে হত্যার জন্য সব রকমের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। কিন্তু কিছুতেই তার নাগাল পাচ্ছিল না। তবে মার্কিন গোয়েন্দারা জানিয়েছেন, গুরুতর আহত হয়েও প্রাণে বেঁচে গেছেন আল-বাগদাদি। ব্রিটেনের ‘দ্য গার্ডিয়ান’ সংবাদপত্রে প্রকাশিত খবর অনুযায়ী, মার্চ মাসের মাঝামাঝি সময়ে মার্কিন বিমানবাহিনীর বোমাবর্ষণে গুরুতর জখম হন এই জঙ্গি শীর্ষনেতা। বাঁচার আশা ছিল না এতটুকু। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কোনক্রমে তার প্রাণরক্ষা করতে সমর্থ হয়েছেন আইএসের চিকিত্সকরা। ফলে হাঁফ ছেড়ে বেঁচেছে তার যোদ্ধারা।
 
জানা গেছে, ইরাকের নিনেভ অঞ্চলের আল-বাজ জেলায় ইসলামিক স্টেট জঙ্গিদের শীর্ষ নেতৃত্বের তিনটি গাড়ির একটি বহরে উম আল-রুস থেকে আল-কারানের পথে চলেছিল। ওই সময়ই হঠাত্ বিনা মেঘে বজ্রপাতের মতো আকাশে উদয় হয় কয়েকটি মার্কিন যুদ্ধবিমান। ইরাকি সেনা, কুর্দ, গণমিলিশিয়া পেশমারগা, শিয়া স্বেচ্ছাসেবক ও সুন্নি উপজাতির মিলিত বাহিনী তখন ইরাকের ওই অঞ্চলেই তিকরিত ও মসুল শহরের দখল জঙ্গিদের থেকে কেড়ে নেয়ার মরিয়া যুদ্ধ চালাচ্ছিল।
 
আইএস যাতে স্থলপথে অন্য কোনও দিক থেকে অস্ত্র বা খাদ্যের সরবরাহ ওই অঞ্চলে নিয়ে আসতে না পারে, আকাশপথে সেদিকে নজর রেখেছিল মার্কিন বিমানবাহিনী। আল-বাজ অঞ্চলের রুক্ষ প্রান্তর দিয়ে পর পর তিনটি গাড়িকে যেতে দেখে সন্দেহ হয় বিমানচালকদের। ওই অঞ্চলে প্রধানত জঙ্গিদের মদতে চোরাচালান চালায় একদল লোক। তিনটি গাড়ির কনভয়কেও চোরাচালানকারীদের গাড়ি মনে করে বিমান থেকে তাদের ওপর বোমা ফেলে মার্কিনবাহিনী। এই ঘটনাতে গাড়িবহরে থাকা আইএস সদস্যদের একজন বাদে সবাই নিহত হন। যিনি বেঁচে যান তিনি আর কেউ নন, আইএস শীর্ষনেতা আল-বাগদাদি! সাংঘাতিক রকমের আহত হলেও তার প্রাণ রক্ষা পায়। আইএস নিয়ে ইরাকি প্রশাসনের অন্যতম প্রধান উপদেষ্টা হিশাম আল-হাশিমি জানিয়েছেন, বাগদাদির জখম এতটাই গুরুতর ছিল যে তার সংগঠনের সদস্যরাই তার প্রাণের আশা ছেড়ে দিয়েছিলেন। বাগদাদির মৃত্যু হলে আইএসের ভবিষ্যত্ কি হবে তা নিয়েও আলোচনা শুরু হয়ে গিয়েছিল সদস্যদের মধ্যে। তবে খবরে প্রকাশ, শেষ পর্যন্ত জখমের ধাক্কা সামলে নিতে পেরেছেন এই জঙ্গি নেতা। অত্যন্ত ধীরগতিতে হলেও তিনি ক্রমশ সেরে উঠছেন বলে জানা গিয়েছে। তবে এখনও তার শরীর এতটাই দুর্বল যে সংগঠনের ভার সামলানো দূরে থাক, ঠিকমতো নড়াচড়া করতেও পারছেন না তিনি। গাড়িবহরের অন্য সবাই নিহত হলেও বাগদাদির বেঁচে যাওয়া পরম সৌভাগ্য হিসেবে দেখছে আইএস। নিউজ উইক পত্রিকা দাবি করেছে, বাগদাদি আবার কবে দায়িত্ব নিতে পারবেন সেই ভরসায় না থেকে আইএস তার স্থলে একজন ভারপ্রাপ্ত নেতাও মনোনীত করে ফেলেছে। তবে এএফপির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অজ্ঞাত কারণে যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষস্থানীয় কয়েকজন কর্মকর্তা তার আহত হবার খবরটি স্বীকার করতে চাইছেন না।
 
একটুর জন্য মৃত্যুর চোখে ধূলো দেয়ার ঘটনা আবু বকর আল-বাগদাদির জীবনে এই প্রথম নয়। কয়েক মাস আগে ডিসেম্বরের মাঝামাঝি মসুল শহরে বাইরে আইএস নেতৃত্বের দুই গাড়ির একটি বহরে একইভাবে হামলা করেছিল মার্কিন যুদ্ধবিমান। সেবার পিছনের গাড়িতে ছিলেন এই মুহূর্তে ‘বিশ্বের সবচেয়ে বিপজ্জনক ব্যক্তি’ হিসেবে পরিচিত বাগদাদি। বিমান থেকে ফেলা বোমা আঘাত হেনেছিল সামনের গাড়িতে। ওই গাড়িতে ছিলেন আল-বাগদাদির ঘনিষ্ঠ আউফ আবদুল রহমান আল-এফেরি। ঘটনাস্থলেই মৃত্যু ঘটে তার। একটুর জন্য বেঁচে যান শীর্ষনেতা বাগদাদি।
 
সিরিয়ার পূর্বদিকে ও ইরাকের পশ্চিমাংশে আইএস-এর দখল কায়েম হওয়ার পর থেকেই নিজেকে ক্রমশ আল-বাজ এলাকাতেই সীমাবদ্ধ রাখতে শুরু করে দিয়েছেন বাগদাদি। কিন্তু মার্কিন বিমান আক্রমণে আইএস নেতৃত্বের প্রাণহানি অব্যাহত থাকে। বাগদাদির আর এক সহযোগী আবু মুসলিম আল-তুর্কমানি এভাবেই মারা পড়েছেন।
 
এবার সেয়ানে সেয়ানে: আইএসের অগ্রযাত্রার পেছন দিক থেকে এবার বেশ জোরালো টান পড়েছে। কারণ নির্মম আইএসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছে দুর্ধর্ষ তালেবান। শুনতে অবাক লাগলেও আফগান গোয়েন্দা সংস্থা জানিয়েছে, হেলমান্দের যুদ্ধক্ষেত্রে দুই জঙ্গি গোষ্ঠীর মধ্যে যে কোনও মুহূূূূূূূূূূর্তে শুরু হতে পারে তীব্র সংঘর্ষ। সমপ্রতি তালেবান প্রধান মোল্লা মোহাম্মদ ওমরকে সরাসরি ‘বোকা’ বলে মন্তব্য করেছেন আইএস সর্বাধিনায়ক আবু বকর আল-বাগদাদি। একইসঙ্গে তালেবান নেতাকে ‘অশিক্ষিত যুদ্ধবাজ’ বলেও সম্বোধন করেছেন তিনি। স্বাভাবিকভাবেই তাতে দারুণ চটেছে তালেবান।
 
আসলে আইএস-তালেবান মনোমালিন্য দিন দিন বেড়েছে। সন্ত্রাসের দুনিয়ায় তুলনায় নবীন হলেও গত দু’বছরে বিশ্বে আতঙ্ক ছড়ানোর দৌড়ে আফগান-পাক জঙ্গিদের অনেক পিছনে ফেলে দিয়েছে ইসলামিক স্টেট। অসংখ্য আন্তর্জাতিক বন্দির মুণ্ডশ্ছেদ করে এবং সোশ্যাল মিডিয়ায় তার ভিডিও পোস্ট করে সংবাদের শিরোনামে থাকার লাগাতার অভ্যাস তৈরি করে ফেলেছে আইএস। প্রযুক্তিগতভাবে তালেবানের চেয়ে অনেক এগিয়ে তারা। শুধু তাই নয়, বস্তাপচা ধ্যান-ধারণায় বিরক্ত যুব সমপ্রদায়কে তালেবানী শিবির থেকে ভাগিয়ে নিজেদের দলে টেনে আনার ব্যাপারেও সফল তারা। স্বাভাবিক কারণেই তাই তালেবান নেতৃত্বকে তাচ্ছিল্য করার স্পর্ধা দেখাতে কার্পণ্য করেনি আইএস। তবে সন্ত্রাস বিশেষজ্ঞরা তালেবান-আইএস সংঘাতের পিছনে অন্য কারণ দেখতে পাচ্ছেন। তাদের মতে, কাজিয়ার মূলে রয়েছে মাদক বাজার কব্জা করার লড়াই। তালেবান অধ্যুষিত আফগানিস্তানের হেলমন্দ অঞ্চল গাঁজা চাষের কারণে কুখ্যাত। এই এলাকা দখল করার জন্যই পরস্পরের প্রতি মুখোমুখি তালেবান ও আইএস। আফগান পুলিশের এক কর্তা জানিয়েছেন, এই কারণেই একে অপরের বিরুদ্ধে রীতিমতো জেহাদ ঘোষণা করেছে তারা।