আগামী বছর অনুষ্ঠেয় যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বীদের মধ্যে এখন পর্যন্ত এগিয়ে আছেন হিলারি ক্লিনটন ও মার্কো রুবিয়ো। কুইন্নিপ্যাক ইউনিভার্সিটির এক জরিপে ডেমোক্র্যাট দলের প্রার্থী হিসাবে হিলারি ক্লিনটন এবং রিপাবলিকান দলের প্রার্থী হিসাবে মার্কো রুবিয়োর এগিয়ে থাকার বিষয়টি উঠে এসেছে।
জরিপের তথ্য মতে, ৬০ ভাগ ডেমোক্র্যাটদের থেকে সমর্থন পেয়েছেন হিলারি। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ভাইস প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন মাত্র ১০ শতাংশ ডেমোক্র্যাটের সমর্থন পেয়েছেন। ২০০৮ সালে ডেমোক্র্যাট দলের মনোনয়ন প্রতিযোগিতায় দৌড়ে বারাক ওবামার কাছে হেরে যাওয়ায় তার সমর্থকরা হতাশ হলেও এবার হয়তো তিনিই ডেমোক্র্যাট দলের প্রার্থী হওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন। দল থেকে চূড়ান্ত সমর্থন পেয়ে শেষ পর্যন্ত প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হতে পারলে সাবেক মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী, ফার্স্ট লেডি এবং নিউইয়র্ক সিনেটর হিলারি ক্লিনটনই হবেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম নারী প্রেসিডেন্ট। তবে হিলারি ক্লিনটনের উদ্বিগ্ন হওয়ার মতোও কিছু বিষয় উঠে এসেছে কুইন্নিপ্যাক ইউনিভার্সিটির জরিপে। জরিপে ডেমোক্র্যাট প্রার্থীদের মধ্যে তিনি এগিয়ে থাকলেও অর্ধেকের বেশি ভোটার মনে করেন হিলারির ওপর আস্থা রাখা কঠিন। অন্যদিকে হিলারির প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীরাও তার বিরুদ্ধে প্রচারণায় নেমেছেন শক্ত হাতে। বিরোধীরা তাদের প্রচারণায় হিলারিকে জনবিচ্ছিন্ন এবং তার ওপর আস্থা রাখা যায় না বলে উল্লেখ করে চলেছেন।
বিরোধীদের হাতে সুযোগটা অবশ্য হিলারিই তুলে দিয়েছেন। হিলারি ক্লিনটন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী থাকাকালে ব্যক্তিগত ই-মেইল ব্যবহার করায় সমালোচনার ঝড় ওঠে। নিয়ম অনুযায়ী পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব পালনকালে সরকারি ই-মেইল ব্যবহার করার কথা। সরকারি ই-মেইল ব্যবহার করা হলে সেগুলো পররাষ্ট্র দফতরের সার্ভারে সংরক্ষিত হতো। কিন্তু ব্যক্তিগত ই-মেইল ব্যবহার করায় সেটি সম্ভব হয়নি। ফলে এই বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক বিতর্কের মুখে পড়েছেন হিলারি। তার এই ই-মেইল বিতর্ক নিয়ে একদিকে বিরোধী রিপাবলিকানরা যেমন জল ঘোলা করছেন একইভাবে নিজ দলেও চাপে আছেন এই ডেমোক্র্যাট নেতা। অনেকেই মনে করছেন, হিলারির এই ই-মেইল বিতর্ক মনোনয়ন প্রত্যাশী প্রতিদ্বন্দ্বীদেরও কিছুটা সুবিধা করে দিতে পারে। নিন্দুকদের মধ্যে এই বার্তা ছড়িয়ে দিতে পারে যে, ক্লিনটন পরিবার ভিতু, অহংকারী ও অনির্ভরশীল। ওবামার উত্তরসূরি হওয়ার লড়াইয়ে হিলারির প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠতে পারেন ডেমোক্র্যাটদের দলেরই কয়েকজন।
ভাইস প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের হোয়াইট হাউসের নেতৃত্ব দেয়ার আকাঙ্ক্ষার বিষয়টি সবার সামনে উঠে আসে হিলারির ই-মেইল বিতর্কের সময়। ঐ সময় জো বাইডেন এক টুইট বার্তায় ঘোষণা দিয়ে বলেছেন, ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসাবে দায়িত্ব পালনকালে তিনি যেসব ই-মেইল পাঠিয়েছেন সেগুলো প্রকাশ করবেন। ই-মেইল বিতর্কের সময় রাজনৈতিক জরিপেও জো বাইডেনের ছিলো ১২.৮ শতাংশ সমর্থন। বাইরে খুব বেশি পরিচিতি না থাকা এলিজাবেথ ওয়ারেনও চলে আসতে পারেন মনোনয়ন প্রত্যাশীদের প্রতিযোগিতায়। ম্যারিল্যান্ডের সাবেক গভর্নর ও ম্যাসেচুসেটসের এই সিনেটরও চলে আসতে পারেন আলোচনায়। কিছুদিন আগের এক রাজনৈতিক জরিপে ওয়ারেন ১২.৪ শতাংশ সমর্থন লাভ করেন।
শুধু ই-মেইল বিতর্ক নয় হিলারি ক্লিনটনের স্বামী বিল ক্লিনটনের কেলেঙ্কারিও সমালোচনার খোরাক যোগাচ্ছে বিরোধীদের। ২০১২ সালের সেপ্টেম্বরে লিবিয়ার বেনগাজিতে মার্কিন কূটনৈতিক দফতরে সন্ত্রাসী হামলার বিষয়টি নিয়েও জল ঘোলা করছেন বিরোধীরা। হিলারি ক্লিনটন দল এবং দলের বাইরে যতই বিরোধিতার মুখোমুখি হন না কেন ঠিকই ভোটারদের সাথে গণসংযোগ শুরু করে দিয়েছেন তিনি। সমপ্রতি নিউ হ্যাম্পশায়ারের একটি প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সাথে মত বিনিময়ের মধ্য দিয়ে তিনি গণসংযোগ করেন।
কুইন্নিপ্যাক ইউনিভার্সিটির জরিপের ফলাফলে রিপাবলিকান প্রার্থীদের মধ্যে মার্কো রুবিয়ো এগিয়ে থাকলেও হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হয়েছে জর্জ ডব্লিউ বুশ পুত্র জেব বুশের সাথে। ফ্লোরিডার সিনেটর মার্কো রুবিয়ো কিউবিয়ান বংশোদ্ভূত। ১৯৭১ সালে ফ্লোরিডায় জন্মগ্রহণ করা মার্কো রুবিয়োর বাবা-মা ১৯৭৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্ব লাভ করেন। কিউবিয়ান বংশোদ্ভূত হলেও মার্কো ১৫ শতাংশ সমর্থন পেয়ে রিপাবলিকান প্রার্থীর দৌড়ে সব থেকে বেশি এগিয়ে। যদিও তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জেব বুশ ১৩ শতাংশ সমর্থন নিয়ে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছেন। তারুণ্যদীপ্ত হলেও অনেকটাই অনভিজ্ঞ মার্কো রুবিয়ো এ মাসের প্রথম দিকে শুরু করা নির্বাচনী প্রচারণায় নতুন যুগোপযোগী নেতৃত্বের প্রতি সমর্থন জানানোর আহবান জানিয়েছেন। কট্টরপন্থি রিপাবলিকানদের টি পার্টি সাপোর্টার কিংবা লিবারেলদের মধ্যে রুবিয়োই একমাত্র ব্যক্তি যিনি ১০ শতাংশের বেশি সমর্থন পেয়েছেন। গণমাধ্যম থেকে যে ধরনের সমর্থন পেয়েছেন রুবিয়ো তাও বেশ গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। এখন পর্যন্ত মার্কো রুবিয়ো তার দলের যে পরিমাণ সমর্থন পেয়েছেন তাতে এটা বলা যেতেই পারে যে আগামী নির্বাচনে হিলারি ক্লিনটনের জন্য বেশ শক্ত প্রতিপক্ষ হিসাবেই আবির্ভাব হতে পারেন মার্কো রুবিয়ো।
ডেমোক্র্যাট দল থেকে হিলারি ক্লিনটনের সাথে মনোনয়ন দৌড়ে থাকতে পারেন জো বাইডেন কিংবা এলিজাবেথ ওয়ারেনও। অন্যদিকে মার্কো রুবিয়োর সাথে মনোনয়ন দৌড়ে রয়েছেন জেব বুশ ও স্কট ওয়াকার। নিবন্ধিত ১৩৫৩ জন ভোটারের ওপর জরিপ করা হলেও এই ফলাফল যে আগামী নির্বাচনের ক্ষেত্রে বিশেষ ভূমিকা রাখবে তাতে সন্দেহ নেই। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভোটের যুদ্ধে কে জিতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট হিসাবে নাম লেখাবেন তা সময়ই বলে দেবে। তবে নিজ দল থেকে চূড়ান্ত টিকেট পেতে এখন পর্যন্ত সর্বাধিক সমর্থন পাওয়া হিলারি ও মার্কো শেষ পর্যন্ত টিকে থাকতে পারেন কী-না সেটাই বড় চ্যালেঞ্জ।
