শক্তিশালী পরাঘাতের মধ্যে আতঙ্ক নিয়ে তাঁবু আর খোলা আকাশের নিচে আরেকটি ঘুমহীন রাত কাটিয়েছেন ভূমিকম্প বিধ্বস্ত নেপালের বাসিন্দারা। শনিবারের ঐ ভূমিকম্পে নিহতের সংখ্যা তিন হাজার তিনশ’ ছাড়িয়ে গেছে। এদিকে উদ্ধারকর্মীরা রবিবারও রাতভর ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে হতাহতদের উদ্ধারের চেষ্টা চালিয়ে গেছেন। দেশটির সরকারের আবেদনে সাড়া দিয়ে পৌঁছাতে শুরু করেছে ত্রাণ ও সহায়তা। সেইসাথে চলছে মৃতদেহ সত্কারের কর্মযজ্ঞ। দেখে মনে হয় যেন এক আগুনের দেশে পরিণত হয়েছে নেপাল।
এদিকে রাজধানী কাঠমান্ডু এখন ‘তাঁবুর শহর’। ঘর হারানো মানুষের ঠাঁই হয়েছে শহরজুড়ে তৈরি হওয়া এসব তাঁবুতে। ফের ভূমিকম্পের আতঙ্কে তারা নিজেদের ক্ষতিগ্রস্ত বাড়িতেও ফিরতে পারছেন না। রাস্তার ধারে ঠাঁই নিয়েছেন ৩৪ বছর বয়সী রবি শ্রেষ্ঠ। পেশায় দোকানদার রবি বার্তা সংস্থা এএফপিকে বলেছেন, এই মুহূর্তে আমাদের কাছে কোন বিকল্প নেই। আমাদের বাড়ি এখনও নাজুক অবস্থায় রয়েছে। তার মধ্যে চলছে বৃষ্টি। কিন্তু আমাদের কিছু করার নেই। অপর একজন স্থানীয় বাসিন্দা বললেন, আমরা নিজেরাই নিজেদেরকে সাহায্য করছি। সরকারের কাছ থেকে এখনও কোন সহায়তা আসেনি। এখানে কোন পানি নেই। আমরা যা পাচ্ছি তাই খাচ্ছি।
দেশটিতে বিদ্যুত্ সরবরাহ নেই এবং মোবাইল ফোন সংযোগ ব্যবস্থা বিকল হয়ে পড়েছে। লোকজনের খাবারের ব্যবস্থা করতে গতকাল কিছু দোকানপাট খুলে দেয়া হয়। এভারেস্টের বেইস ক্যাম্পে অবস্থান করা ২১০ আরোহনকারীকে ফিরিয়ে আনতে সেখানে হেলিকপ্টার পাঠানো হয়েছে। এছাড়া ভূমিকম্পের উত্পত্তিস্থলের দিকে যাওয়ার পথগুলো পরিষ্কার করা হয়েছে এবং উদ্ধারকর্মীরা সেদিকে অগ্রসর হয়েছে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র লক্ষ্মী প্রসাদ ধাকাল। কিন্তু ৮০ বছরের মধ্যে ভয়াবহতম এই ভূমিকম্পের পর পরিস্থিতি সামাল দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে উদ্ধার ও ত্রাণকর্মীদের। ধসে পড়া ভবনের নিচ থেকে উদ্ধার করা গেলেও আহত বহু মানুষকে হাসপাতালে আশ্রয় দেয়া সম্ভব হয়নি। তাদের অনেককেই জরুরি চিকিত্সা দেয়া হচ্ছে খোলাআকাশের নিচে। কাঠমান্ডু মেডিক্যাল কলেজের খোলা মাঠে তাঁবু খাটিয়ে তার ভেতরে অপারেশন টেবিলে কাজ করছেন চিকিত্সকরা। তাছাড়া হাসপাতালের মেঝেতে পড়ে রয়েছে শত শত মানুষের মৃতদেহ।
ওদিকে নেপালে ভূমিকম্প দুর্গতদের সহায়তার জন্য একটি বিশেষ দল পাঠাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। ইউএসএইড প্রাথমিক সহায়তা হিসেবে ১০ লাখ ডলার দিয়েছে। নরওয়ে দিচ্ছে ৩৯ লাখ ডলার। প্রতিবেশী দেশ ভারত কয়েকটি হেলিকপ্টারে করে চিকিত্সা সরঞ্জাম, ভ্রাম্যমাণ হাসপাতাল এবং ৪০ জন উদ্ধারকর্মীকে কাঠমান্ডু পাঠিয়েছে, তাদের সঙ্গে রয়েছে উদ্ধারকাজে প্রশিক্ষিত কুকুর। চীনের একটি উদ্ধারকারী দলও ইতোমধ্যে নেপালে পৌঁছেছে। পাকিস্তানও চারটি বিমানে করে চিকিত্সক, খাবার, তাঁবু ও কম্বল পাঠিয়েছে। এছাড়া জার্মানি, স্পেন, ফ্রান্স, ইসরাইল ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন এই দুর্যোগে দেশটির পাশে দাঁড়ানোর ঘোষণা দিয়েছে।
নেপালের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিভাগের প্রধান রামেশ্বর ডাঙ্গাল জানিয়েছেন, সোমবার সকাল পর্যন্ত ৩ হাজার ৩২৬ জনের মৃত্যুর তথ্য তাদের হাতে এসেছে। এর বাইরে আহত হয়েছেন আরও অন্তত সাড়ে ছয় হাজার মানুষ। ভূমিকম্পে ভবন ধসে, দেয়ালচাপা পড়ে এবং হুড়োহুড়িতে ভারত, চীন, তিব্বত ও বাংলাদেশে আরও কয়েক ডজন মানুষের মৃত্যু হয়েছে। নেপালের পশ্চিম অংশের দুর্গম পার্বত্য এলাকার সঠিক পরিস্থিতি জানা গেলে হতাহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। কাঠমান্ডু এবং পোখরা নগরীর মাঝে শনিবার দুপুরে ৭ দশমিক ৯ মাত্রার এই ভূমিকম্পে বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তানের বিস্তীর্ণ এলাকাও কেঁপে ওঠে। এরপর রবিবার পর্যন্ত তিন দফায় আরও তিনটি মাঝারি মাত্রার পরাঘাত অনুভূত হয়, যার মধ্যে একটির মাত্রা ছিল রিখটার স্কেলে ৬ দশমিক ৭।
