রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলায় পদ্মা ও মহানন্দা নদীর বেশিরভাগ অঞ্চলে এখন পানি নেই। বিস্তীর্ণ নদীর বুকজুড়ে চলছে তাই বোরো ধানের চাষ। স্থানীয় কৃষিবিভাগ জানিয়েছে, পদ্মার রাজশাহী অঞ্চল থেকে চাঁপাইনবাবগঞ্জের মহানন্দা নদী পর্যন্ত এলাকায় অন্তত ১৫ হাজার চাষী নদীতে শ্যালো ইঞ্জিন বসিয়ে ভূগর্ভস্থ পানি তুলে সেচ দিয়ে ধানসহ নানা ফসল চাষ করছেন।
পদ্মা ও মহানন্দা পাড়ের বাসিন্দারা জানিয়েছেন, একসময় পদ্মা ও মহানন্দা নদীর পানি দিয়ে নদীর দুই পাড়ের জমিতে ফসলের চাষ করা হতো। কিন্তু পদ্মা-মহানন্দার উজানে ভারতের মনোহরপুরে একতরফা ফারাক্কা বাঁধের বিরূপ প্রভাবে এখন নদীতে পানি নেই। তাই পরিবর্তন এসেছে নদী পাড়ের বাসিন্দাদের জীবন ও জীবিকায়। নদীতে পানি না থাকায় বেকার হয়ে পড়েছেন অনেক জেলে ও মাঝি। বাধ্য হয়ে তারা এখন নদীগর্ভে শ্যালো ইঞ্জিন বসিয়ে ধান চাষ করছেন। তবে পদ্মা-মহানন্দায় শুধু জেলে ও মাঝিরাই ধান চাষ করেননি, কোমর বেঁধে চাষাবাদে নেমেছেন বহু ভূমিহীন পরিবারও। কোথাও কোথাও আবার গড়ে তোলা হয়েছে কৃষক সমবায় সমিতি। চাঁদা তুলে একশ’ থেকে দেড়শ’ জন পর্যন্ত কৃষক একযোগে চাষ করেছেন বোরো ধান।
বর্তমানে রোপণ পরবর্তী পরিচর্যায় ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন চাষীরা। আর কয়েকদিনের মধ্যেই ধান গাছে দেখা দেবে শীষ। তখন সোনালি ঝিলিকে ভরে উঠবে পদ্মা-মহান্দার বুক। এখন নদীর বুকে দোল খাচ্ছে সবুজ ধানের গাছ। পদ্মা-মহানন্দার বেশিরভাগ এলাকায় যতদূর চোখ যায়, চোখে পড়ে শুধু সবুজের সমারোহ।
ধান চাষীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বরেন্দ্র অঞ্চলের জমিতে ধান চাষে খরচ বেশি কিন্তু উত্পাদন কম। অন্যদিকে নদীতে ধান চাষে খরচ কম কিন্তু উত্পাদন বেশি।
বরেন্দ্র অঞ্চলে বিঘাপ্রতি ধানের উত্পাদন হয় ১৫-১৭ মণ। অথচ তুলনামূলক কম সার ও কীটনাশক প্রয়োগে নদীর বুকে বিঘাপ্রতি ধানের উত্পাদন ২০-২২ মণ। কৃষকরা জানিয়েছেন, নদীতে একবিঘা ধান চাষে খরচ হয় আড়াই হাজার থেকে তিন হাজার টাকা। সুলতানগঞ্জ গ্রামের কৃষক রফিকুল ইসলাম জানান, তাদের এলাকার অধিকাংশ চাষীই ৫-৬ বছর ধরে মহানন্দায় ধান চাষ করছেন। নভেম্বর থেকে নদীতে পানি কমতে শুরু করলে তারা নদীর বালু ও কাদা টেনে জমি প্রস্তুতের কাজে নেমে পড়েন। মাস দুয়েক পরিশ্রমের পর প্রস্তুত হয় জমি। ডিসেম্বর-জানুয়ারিতে চরের জমিতে রোপণ করা হয় বোরো ধানের চারা। কৃষক রফিকুল ইসলাম আরো জানালেন, ভারতে হঠাত্ বন্যা দেখা দিলে ফারাক্কার দরজা খুলে দেয়া হয়। এমনটি হলে তাদের কষ্টের ফসল নদীর পানিতে ডুবে মরবে। তাই তারা আগাম ধান চাষে নেমে পড়েন।
ভূমিহীন দিনমজুর আবদুস সামাদ গ্রামের পাশের পদ্মা নদীতে চার বিঘা জমিতে বোরো ধান চাষ করে আসছেন কয়েক বছর ধরে। তিনি জানান, ভরা মওসুমে পানির সঙ্গে নদীতে যে পলি পড়ে, তা ধান ক্ষেতে সারের মতো কাজ করে। বাড়তি তেমন সার প্রয়োগ করতে হয় না।
রাজশাহী কৃষি সমপ্রসারণ অধিদফতর সূত্রে জানা গেছে, চলতি বোরো মওসুমে পদ্মা ও মহানন্দা নদীর বুকে ব্রি-২৮ ও ব্রি-৩২ সহ স্থানীয় কয়েকটি জাতের ধান চাষ হয়েছে। প্রায় ১৫ হাজার চাষী নদীর প্রায় ২ হাজার ৭৬০ হেক্টর জমিতে এসব ধান চাষ করেছেন। রাজশাহী কৃষি সমপ্রসারণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক হযরত আলী বলেন, প্রকৃতির পরিবর্তনের সাথে সাথে রাজশাহী অঞ্চলের কৃষিতেও পরিবর্তন এসেছে। আগে পদ্মায় মানুষ মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করতেন। এখন পানি নেই, তাই চলছে ধান চাষ। এতে নদী তীরবর্তী অনেক দরিদ্র জনগোষ্ঠি আর্থিকভাবে সচ্ছলতা পাচ্ছেন।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ কৃষি সমপ্রসারণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক সাইফুল ইসলাম বলেন, স্থানীয় খাদ্য চাহিদা পূরণে বড় ভূমিকা রাখছে প্রতিবছর মহানন্দা নদী থেকে পাওয়া ধান। এছাড়া জাতীয় উত্পাদনের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনেও বিশেষ ভূমিকা রাখছে নদীতে পাওয়া বাড়তি জমির ধান।
