রাজধানীর রামপুরার বউবাজারে ঝিলের ওপর তৈরি করা হয়েছে আরো শতাধিক টিন, কাঠ ও বাঁশের দোতলা বাড়ি। প্রতিদিনই এখানে আরো নতুন নতুন বাড়ি তৈরি হচ্ছে। অতিঝুঁকিপূর্ণ জেনেও এখানে বাস করছে হাজার হাজার নিম্নআয়ের মানুষ । পানিতে ডুবে থাকা বাঁশের খুঁটির ওপর লোহার কাঠামো, কাঠের পাটাতন ও টিনের বেড়া দিয়ে তৈরি এসব বাড়ি।
বাঁশের খুঁটি পচে গিয়ে তিন তলা বাঁশের ঘর দেবে গিয়ে অতিসমপ্রতি ১২ জনের প্রাণহানি ঘটেছে। এই ঘটনার পর ঢাকা জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ঘটনাস্থলে একটি লাল রংয়ের সাইন বোর্ড টাঙ্গানো হয়েছে। তাতে লেখা রয়েছে, ঝুঁকিপূর্ণ স্থান, সর্ব সাধারণের প্রবেশ নিষেধ। এই সাইনবোর্ড টাঙ্গিয়েই প্রশাসন তাদের উপর অর্পিত দায়িত্ব শেষ করেছে। অপর দিকে রাজউকও একই কাজ করেছে। এ ব্যাপারে রাজউকের চেয়ারম্যান প্রকৌশলী ডিএম জয়নাল আবেদীন ইত্তেফাককে বলেন, আমরা বাঁশের বস্তি থেকে স্থানীয় বাসিন্দাদের নিরাপদে চলে যেতে নোটিস দিয়েছি। মাইকিং করা হয়েছে। তারপরও কেউ চলে না গেলে আমাদের করার কি আছে।
স্থানীয় লোকজন জানান, সরকার দলীয় নেতা-কর্মী ও স্থানীয় মাস্তানরা মিলেমিশে অবৈধভাবে এসব বাড়ি তুলে ভাড়া দিয়ে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। ইতিপূর্বে দেবে যাওয়া বাড়িটির মালিক ছিলেন মুনির হোসেন চৌধুরী। তিনি যুবলীগের ঢাকা মহানগর দক্ষিণের নেতা। তিনি ইতিমধ্যেই র্যাবের হাতে গ্রেফতার হয়েছেন। পানি, বিদ্যুত্ ও গ্যাসের অবৈধ সংযোগ রয়েছে তার বাড়িতে। প্রতিটি ঘরের ভাড়া মাসিক চার হাজার থেকে সাড়ে চার হাজার টাকা। দুই দিকে দুটি সাঁকো দিয়ে স্থলের সঙ্গে বাড়িটি সংযুক্ত ছিলো।
সিকি কিলোমিটার সাঁকো দিয়ে রামপুরার বউবাজার এলাকায় যাওয়া যায়। আবার কয়েক গজ সাঁকো পার হলে মালিবাগ চৌধুরীপাড়া। মূলত পোশাক কর্মী, রিকশা-ভ্যানচালক, শ্রমিক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী পরিবারগুলো এই ধরনের বাড়িগুলোতে ভাড়া থাকেন।
এলাকাবাসী জানায়, যারা ঘর তুলেছে তারা প্রভাবশালী বলে কেউ তাদের কাজের প্রতিবাদ জানায় না।
সরেজমিনে দুর্ঘটনাস্থল ও আশপাশের এলাকা ঘুরে দেখা যায়, যে বাড়িটি পানির নিচে দেবে গেছে, তা ঝিলের মাঝে অবস্থিত। বাড়িটি পুনরায় মেরামত করতে দেখা গেছে। একই স্থানে মাটি ভরাটেরও দৃশ্য দেখা গেছে।
একইভাবে ঝিলের ওপর গড়ে উঠেছে আরও শতাধিক বাড়ি। এ বাড়িগুলোর কোনো কোনোটির দুই দিকে রাস্তা রাখা হয়েছে। অধিকাংশ বাড়িতে যাওয়া-আসার রাস্তা একটি।
ঝিলের উত্তর, দক্ষিণ, পূর্ব ও পশ্চিম-সবদিকের পাড় দখল করেই এসব বাড়ি তৈরি করা হয়েছে। এমনকি ঝিলের মাঝের স্থানও অবৈধ দখলের হাত থেকে রক্ষা পায়নি। ঝিলের যে স্থানে বাড়িগুলো গড়ে তোলা হয়েছে, তার চারদিক ঘিরে রয়েছে কচুরিপানা।
বাড়ির নিচে ময়লা পানি। বাড়িগুলো এমনভাবে গড়ে তোলা হয়েছে যে, কোনো দুর্ঘটনা ঘটলেও নিরাপদ স্থানে যাওয়া বেশ কষ্টকর। ঝিলের ময়লা পানি ও কচুরিপানার সঙ্গে যুদ্ধ করে অথবা বাঁশের তৈরি সরু সাঁকো দিয়ে নিরাপদ স্থানে যেতে হবে বাসিন্দাদের।
ঝিলের মধ্যে গড়ে তোলা এমনি একটি টিনশেড বাড়ির ভাড়াটিয়া সেলিমের সঙ্গে কথা হয়। তিনি বলেন, একটি ঘরে তারা পাঁচজন থাকেন।
কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে আপনারা বের হবেন কীভাবে-এমন প্রশ্ন করা হলে একটি ঘরের বাসিন্দা আমির হোসেন বলেন, ওই বাড়ির (পানিতে দেবে যাওয়া বাড়িটি) লোকেরা যেভাবে পানিতে ঝাঁপিয়ে ঝিল পার হয়েছে, আমরাও সেইভাবে ঝিল পার হব।
যে বাড়িটি পানির নিচে দেবে গেছে তার পশ্চিম পাশেই ঝিলের ওপর গড়ে তোলা হয়েছে একতলা টিনশেডের আর একটি বাড়ি। এই বাড়ির এক ভাড়াটিয়া জানান, বছর পাঁচেক আগে ঝিলের ওপর বাড়িটি গড়ে তোলা হয়। বাড়ির চারদিকে টিনের দেয়াল। তবে ইট, বালু, সিমেন্টের ঢালাই দিয়ে তৈরি করা হয়েছে ফ্লোর।
এসব বাড়ির কিছু কিছু ঘরে নানা অসামাজিক কার্যকলাপও চলে বলে কেউ কেউ অভিযোগ করেন। বিক্রি করা হয় নানা ধরনের নেশা জাতীয় দ্রব্য।
