সব মায়েদের গল্পই এক

আপডেট : ১৭ মে ২০১৫, ১৪:৫৩

ফারজানা চুমকী

 
মা হওয়ার আগে তারমধ্যে কোনো দায়িত্ববোধ না থাকলেও মা হওয়ার পর এক ধরনের দায়িত্ববোধ চলে এসেছে বলে জানালেন চুমকী। মা হতে পারা জীবনের অন্যতম স্মরণীয় ঘটনা বলে মনে করেন তিনি। তার মতে, এখন তার সবকিছু ঘিরে রয়েছে তার সন্তানেরা। তাদের দেখাশোনা করার জন্য মিডিয়ায় কাজ বর্তমানে প্রায় ছেড়েই দিয়েছেন বলে জানালেন চুমকী। তার সন্তানই যেন তার বর্তমান পৃথিবীর পুরোটাই জুড়ে আছে।
 
কাজী নওশাবা আহমেদ
 
ছোটবেলায় যখন তাকে জিজ্ঞাসা করা হতো তার জীবনের লক্ষ্য কী? তিনি বলতেন, মা হতে চান। সকলে অবাক হতো এবং মজা পেত। সবাই নওশাবাকে আম্মু বলে ডাকত। অনেক বন্ধুও আছে যারা তাকে আম্মু বলে ডাকে। ফলে সত্যি সত্যিই তিনি যখন মা হলেন তখন তার স্বপ্নপূরণ হলো। নওশাবার মতে, এখন তিনি যে কাজ করছেন তা তার বাচ্চাকে গর্বিত করার জন্যই। তিনি প্রতিনিয়ত ভালো অভিনয় করার চেষ্টা করেন, যাতে বাচ্চা বড় হয়ে তাকে বলতে না পারে, কী অভিনয় করলে এটা আম্মু!
 
পুষ্পিতা রায়
 
এক জীবনের মূল্যবান অলঙ্কারটাকে জ্বলজ্বল করে তুলতে, জীবনটাকে জীবনের মতো করে গড়ে তুলতে সবসময় যে মানুষটি অক্লান্ত পরিশ্রম আর ভালোবাসার চাদরে আমাদের আবৃত করে রাখেন তিনিই হলেন পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ শব্দের সম্মানবহনকারী ‘আমাদের মা’। ছোটবেলা থেকেই সাদা শাড়ির শুভ্র স্নিগ্ধতা, লাল পাড়ের রঙিন পৃথিবী আর লাল টিপে সুসজ্জিত বাঙালি নারীর সংমিশ্রণ আমি আমার মায়ের মধ্যেই পেয়েছি। সংস্কৃতিপরায়ণতার আধার বলেই মায়ের কোমল হাতের স্পর্শে আমার গানের সাথে সংযোগ, মায়ের মিষ্টি বুলির মধ্য দিয়েই আবৃত্তির জগতে প্রবেশ আর তীব্র আকাঙ্ক্ষার তাড়নায় নৃত্যের সাথে পরিচয়। মা তার জীবনের উজ্জ্বল অতীতটা অবলীলায় বিসর্জন দেয় পৃথিবীকে তিনটি মানব সন্তান দান করার উদ্দেশ্যে। সেই যোগ্য নেতৃত্বে মা-ই সেরা। মা, তোমার মতো সুন্দর হতে পারিনি। কিন্তু তোমার জন্য আমাদের তিন ভাইবোনের পৃথিবীটা তোমার চেয়েও বেশি সুন্দর। তোমার এই ভুবনভোলানো হাসির একটা কারণ হয়েই থাকতে চাই সারাজীবন। মা দিবসে তোমাকে প্রণাম।
 
লেখক: শিক্ষার্থী, শেখ সায়েরা খাতুন মেডিকেল কলেজ, গোপালগঞ্জ।
 
শেখ মুহাম্মাদ ত্বোহা
 
মা মানুষটার উপর দিয়ে প্রতিদিন যে পরিমাণ ঝড় বয়ে যায়। তার কিছুটা আমি মাঝে মাঝে অনুভব করার চেষ্টা করি কিন্তু পারি না। তুমি কেমন করে পার মা? কিভাবে তুমি এই অসম্ভব পৃথিবীতে এতদিন এত ঝড় মাথায় নিয়ে টিকে আছ? আমি তো এই পৃথিবী নামক গ্রহে ১৯টা বছর অবস্থান করছি। এই ভয়ংকর জায়গায় আমি একটা দিনও টিকতে পারতাম না এই মাকে ছাড়া। জন্মের পর সৃষ্টিকর্তা চোখ দিয়েছেন কিন্তু সেই চোখ দিয়ে দেখতে শিখেছি মায়ের সাথে, হাঁটতে শিখেছি তার হাত ধরে। এই ভয়ংকর পৃথিবীতে আমি এখনো হেঁটে চলে বেড়াচ্ছি। শুধু এই মানুষটার কারণে। আমার মায়ের অবদান বর্ণনা করার জন্য আমাকে অন্তত তিনশ বছর সময় দিতে হবে! অত্যন্ত আনন্দের এবং গর্বের বিষয় হলো আমাকে সারাজীবন এই মানুষটার কাছে কৃতজ্ঞ থাকতে হবে। এ পৃথিবীতে আমার একটাই আশ্রয়স্থল। কিন্তু বাস্তবতা যখন এই আশ্রয় কেড়ে নেবে তখন আমি কিভাবে কাটাব এ জীবন তা আমার সুদূর কল্পনার বাইরে।
 
লেখক: শিক্ষার্থী, স্থাপত্য বিভাগ, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়।
 
মোস্তাফিজুর রহমান
 
সেদিন আমার এক আত্মীয়ের কাছে মা নারকেলের নাড়ু, বরইয়ের আচার আর শুকনো করে রাঁধা সেমাই পাঠিয়েছে। সেগুলো হাতে পেয়ে একা বাসায় ফেরার সময় প্রথমবার উপলব্ধি করলাম, সময় আর জীবনের বাস্তবতায় আমি কতটা পাল্টে গিয়েছি! গত ঈদুল আজহার পর বাবা আর ছোট ভাই দুটোর সাথে যশোরে মাকে রেখে আসার পর প্রায় বছর পেরোতে চলেছে বাড়ি যেতে পারিনি। নারকেলের নাড়ু, বরই আচার, শুকনো সেমাই খেতে গিয়ে কেন জানি চোখের জল ধরে রাখতে পারছিলাম না, শৈশবের স্মৃতিগুলো মনের মধ্যে খুব দাপাদাপি করছিল; আমি প্রায় সারাদিন মায়ের কোলে চড়ে থাকতাম। কোলে বসেই আমার সবচেয়ে পছন্দের রেসিপি, চাকতির মতো গোল গোল করে কেটে পেঁয়াজ-মরিচ দিয়ে ভাজি করা বেগুনে মাখা ভাত খেতাম আর বলতাম, ‘পিঠা ভাত!’ প্রাইমারির শেষ পর্যন্ত মায়ের হাতে ছাড়া নিজে হাতে তুলে কখনো কিছু না খেলেও, সেদিন এসব খেতে খেতে মনে হচ্ছিল, যতই দূরে থাক, মায়ের ভালোবাসা ঠিক পৌঁছে যায়!
 
লেখক: সাহিত্যিক
 
নাফিসা আলম তরী
 
‘মা’ শব্দটি বলতেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে আমার মায়ের চেহারা, দেখতে পাই তার অতুলনীয় হাসি আর আমার জন্য দেওয়া সীমাহীন ভালোবাসা। সবার কাছেই তার মা সবচেয়ে আলাদা। মা দিয়ে আমাদের জীবন শুরু। মা না থাকলে এই পৃথিবীতে জীবন যাপন করা তো দূরের কথা, জীবন শুরুই করতে পারতাম না। আমাকে যদি প্রশ্ন করা হয় আমার মা কি করতে সক্ষম না? আমার উত্তর হবে আমার মা সব পারে। দৈনন্দিন জীবনের সকল চাহিদার কথা তো বাদই দিলাম। আমার জীবনে যখনই যেই সমস্যা এসেছে মা আমাকে আগলে রেখেছেন পরম স্নেহে। তার কাছে সকল সমস্যার সমাধান থাকে সেটা যত বড় সমস্যাই হোক না কেন। আমার মা একদিকে যেমন অনেক মিশুক তেমনি তিনি অনেক ধৈর্যশীলও। কিন্তু আমার মা অনেক বেশি সরল। কারো থেকে কষ্ট পেলেও মুখ ফুটে বলেন না। আমি চাই আমার মায়ের সকল কষ্ট দূর করে তার মুখে হাসি ফোটাতে।
 
লেখক: শিক্ষার্থী, স্কলাস্টিকা স্কুল।
 
সামিয়া জাহান রক্তি
 
ছোটবেলায় ‘আমার মা’ রচনা লিখতে দিলে কত যে মিথ্যা কথা লিখতাম। আসলে মাকে নিয়ে লেখার মতো আমার কাছে কোনো স্মৃতি ছিল না। বুঝতে শেখার পর থেকেই আমাকে সবসময় নিজের থেকে দূরে দূরে রাখত। রাগ, অভিমান, কষ্ট সবই হতো। সবচেয়ে বেশি মন খারাপ হতো স্কুলের টিফিন পিরিয়ডে, আমার সব বন্ধুদের মা আসত কিন্তু আম্মু সময় দিতে পারত না। আসলে আমার মা একজন রাজনীতিবিদ। জনগণের সেবা নিয়ে ব্যস্ত সময় পার করেন। যতই বড় হলাম, বুঝতে শিখলাম, আসলে রাজনৈতিক পরিবারে বড় হওয়াটা একটু কঠিন। পৃথিবীর প্রত্যেকটা মা তার সন্তানকে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসে তবে তার বহিঃপ্রকাশ সময়ের প্রয়োজনে ভিন্ন হয়। মায়ের অস্তিত্ব বেশি অনুভব করলাম যখন আমার বাবা মারা গেলেন। আমি তখন ছাত্র। আম্মুর নিরলস পরিশ্রম আর অশেষ কষ্টের কারণেই আজকের আমি। নিজের ইচ্ছা, চাহিদা, শখ সবকিছুই আমাদের জন্য বিসর্জন দিয়েছেন তিনি সবসময়। আমার আজকের অবস্থানের পেছনের কারণ আমার মা। সারাজীবন চেষ্টা করব তার মতো সত্ আর ভালো মনের মানুষ হতে।
 
লেখক: জুনিয়ার ইঞ্জিনিয়ার, গাজীপুর পল্লী বিদ্যুত্ সমিতি
 
সাদেকিন হায়দার
 
একবার আমি রেসিডেন্সিয়াল স্কুলে জাতীয় বিতর্ক প্রতিযোগিতায় কোয়ার্টার ফাইনালে উঠেছিলাম। কিন্তু সেই অনুষ্ঠানে বাবা আমাকে কিছুতেই যেতে দেবেন মা। আমি আর আশা না দেখে নিজ রুমে বসে কাঁদতে শুরু করলাম আর আম্মুকে বললাম শেষ চেষ্টা করতে। আম্মু চিন্তিত মুখে বলল, ‘আচ্ছা আমি বলছি তোমার বাবাকে।’ আম্মু কিছুক্ষণ পর বলল, ‘তোমার বাবা কিছুতেই রাজি হচ্ছে না।’ আমি মুখ আরও গোমড়া করে বসে পড়লাম। আম্মু হঠাত্ জিজ্ঞেস করল, ‘ব্যাগ গুছিয়ে নাও তুমি যাবে।’ আমি অবাক হয়ে আম্মুর দিকে তাকিয়ে আছি। আম্মু বলল, ‘তোমার বাবার রাগের জন্য কি তুমি তোমার স্বপ্নভঙ্গ হতে দেবে? রেডি হও, তোমার বাবাকে আমি ব্যস্ত রাখছি আর এই ফাঁকে তুমি দরজা দিয়ে পালিয়ে যাবে।’ আমি আম্মুর কথামতো দরজা দিয়ে পালিয়ে চলে যাই। সেদিন বিতর্কে জাতীয় পর্যায়ে চ্যাম্পিয়ন হই আর বাসায় ফিরতে রাত ১২টা বেজে যায়। ভেবেছিলাম বাসায় অনেক বকা খাব, কিন্তু বুঝলাম আম্মু পরিস্থিতি সামলে নিয়েছে। এভাবেই আম্মু আমাকে সারাজীবন ধরে অনেক বড় বড় বাধা-বিপত্তি থেকে বাঁচিয়েছে।
 
লেখক: শিক্ষার্থী, মতিঝিল সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয়।