প্রবীণ বয়সের প্রস্তুতি নিন এখনই

আপডেট : ০২ মার্চ ২০১৯, ২১:৫০

আমাদের দেশে সাধারণত ষাটোর্ধ্ব বয়সের মানুষকে প্রবীণ বলে গণ্য করা হয়। কারণ এ বয়সের পর মানুষ দৈনন্দিন জীবিকা উপার্জনের কাজ থেকে অবসর নেয়। বাংলাদেশে সরকারি চাকরি থেকে অবসরের বয়স ৫৯ বছর। তবে বিচারপতিদের জন্য ৬৭ বছর এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও কোনো কোনো পেশাজীবীদের জন্য ৫৯ বছর। বিশ্বের উন্নত দেশগুলোতেও ৬০ বা ৬৫ বয়সের পর একজন মানুষকে প্রবীণ বা ‘সিনিয়র সিটিজেন’ হিসেবে গণ্য করা হয়। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বর্তমানে বাংলাদেশে প্রায় এক কোটি ৩০ লাখ প্রবীণ বা সিনিয়র সিটিজেন রয়েছেন। আগামী ২০২৫ সাল নাগাদ দেশে প্রবীণদের সংখ্যা হবে প্রায় এক কোটি ৮০ লাখ। ২০৫০ সালে এই সংখ্যা প্রায় সাড়ে চার কোটি এবং ২০৬১ সালে সাড়ে পাঁচ কোটি হবে।

আধুনিক চিকিত্সার সুবিধা, খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন এবং সচেতনতার ফলে দেশের মানুষের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বেড়েছে। বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরাম ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুসারে, বয়স্কদের মৃত্যুহার একদিকে যেমন কমেছে অন্যদিকে গড় আয়ু বৃদ্ধি পাওয়ায় ২০৩০ সালে বাংলাদেশে মোট জনসংখ্যার ২২ শতাংশ হবে প্রবীণ। ২০৪৪ সালে যা কম বয়সী জনগোষ্ঠীকে ছাড়িয়ে যাবে। ‘প্রবীণদের সংখ্যা ক্রমবর্ধমান বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে তাদের থেকে পাওয়া ভালোবাসা প্রয়োজনের সময় তাদের দিতে হবে। রাখতে হবে তাদের স্বাস্থ্য, মানসিক ও পারিপার্শ্বিক বিষয়ের খবরাখবর।

একসময়ে যে মানুষগুলো ছাড়া এক মুহূর্তও থাকতে পারতাম না, যারা মুখে খাবার তুলে না দিলে সেদিন আর খাওয়া হতো না, যেই মানুষগুলো তাদের জীবনের সবচয়ে দামী বস্তু বলতে আমাদেরকেই জানতেন, যারা নিজেদের আরাম হারাম করে আমাদের মানুষ করেছেন, নিজের সব দুঃখ-কষ্ট বুকে চেপে আমার হাসিমাখা মুখ দেখার জন্য যে মা ব্যাকুল থাকতেন, আমি না খেলে যিনি খেতেন না, আমি না ঘুমালে যিনি ঘুমাতেন না, অসুস্থ হলে যিনি ঠায় বসে থাকতেন আমার শিয়রে, যে বাবা-মা তিলে তিলে নিজেদের সবকিছু বিসর্জন দিয়েছেন আমাকে মানুষ করার জন্য, যে বাবা নিজের পকেট খরচকে বাঁচিয়ে রাখত তার সন্তানের টিউশন ফি অথবা টিফিনের টাকার জন্য, যে বাবা নিজের অসুস্থতার কথা না ভেবে কেবল তার সন্তানদের কথা চিন্তা করে ভোরেই নেমে পড়তো খাবারের সন্ধানে, সেই বাবা-মায়ের শেষ বয়সের যথার্থ মর্যাদা আমরা কতটুকু দিতে পারছি।

সময়ের বিবর্তনে নগরায়ন, শিল্পায়ন, পশ্চিমা সংস্কৃতির প্রভাব এবং সামাজিক মূল্যবোধের ফাটলের কারণে আজ অধিকাংশ পরিবারের মা-বাবার প্রবীণ সময়ের আশ্রয়স্থল হচ্ছে বৃদ্ধাশ্রম। কিন্তু কেন এই বৃদ্ধাশ্রম? মূলত আর্থিক অস্বচ্ছলতার জন্যই আমাদের সমাজের প্রবীণদের জীবনের শেষ অধ্যায়টি কোনো বৃদ্ধাশ্রমে অথবা নিজ পরিবারেই অতিবাহিত হয় পরিবার, সমাজের অবহেলা, উপেক্ষা এবং বঞ্চনায়।

আমরা ভুলেই যাচ্ছি যে আমরাও একদিন বাবা-মা হবো, আমরাও একদিন প্রবীণ হবো। আমাদেরও একদিন জীবনের সন্ধিক্ষণে পৌঁছতে হবে। পার করতে হবে প্রবীণ বয়সের একটি অধ্যায়। আজ আমরা আমাদের প্রবীণদের সঙ্গে যেমন আচরণ করছি ঠিক তেমনি হয়তো আমাদের সন্তানরাও আমাদের সঙ্গে একই আচরণ করবে। আজ আপনি আপনার বৃদ্ধ বাবা-মায়ের সঙ্গে অবাঞ্ছিত আচরণ করছেন। আপনার সন্তানরা আপনার থেকেই শিখছে। কালের পরিক্রমায় আপনি প্রবীণ বা বৃদ্ধ হবেন। আপনাকেও হয়তো আপনার সন্তানরা বৃদ্ধাশ্রমে রেখে আসবে বা আপনার সঙ্গে অবাঞ্ছিত আচরণ করবে।

সুতরাং, এখনই সময় আপনার অনাগত প্রবীণ বয়সের প্রস্তুতি নেওয়ার। এখনই সময় নিজের শেষ সময়টুকুকে নিজ পরিবারের মাঝেই অতিবাহিত করার প্রস্তুতি গ্রহণ করার। আপনার নিজের উপরই নির্ভর করবে, ‘কেমন হবে আপনার জীবনের শেষ অধ্যায়টি’। আপনি আপনার বাবা-মা বা প্রবীণদের প্রতি যত্নশীল হোন, আপনার হাত দুটো তাদের জন্য নির্ভরশীলতার হাত হিসেবে বাড়িয়ে দিন, তাদেরকে ভালোবেসে কাছে রাখুন। তবেই আপনার প্রবীণ বয়সের প্রস্তুতি ভালোভাবে সম্পন্ন হবে। আপনার সন্তানরাও আপনার প্রতি যত্নশীল হবে, তাদের হাত দুটোই হবে আপনার প্রবীণ বয়সের হাতের একমাত্র যষ্টি।

n লেখক :শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়