ভারতীয় হচ্ছে জেনে বাংলাদেশি ছিটমহলের মানুষও খুশি

আপডেট : ১৫ মে ২০১৫, ০১:৫৪

ভারতের পশ্চিমবঙ্গের জলপাইগুড়ি জেলার কোতয়ালীর থানার সাখাতি গ্রাম। ১৬৫ একর জমির ওপর এই গ্রামটি বাংলাদেশি ছিটমহল। বাংলাদেশ-ভারত স্থল চুক্তি পাস হওয়ায় বাংলাদেশের ৫১ ছিটমহলের মধ্যে সাখাতি ছিটমহলের বাসিন্দারা এখন ভারতীয় নাগরিক হতে যাচ্ছেন। তারা এই রূপান্তরের জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করেছিলেন। গত ডিসেম্বরে এই প্রতিবেদক যখন সাখাতি পরিদর্শন করেন তখন তারা তাদের এই আকাঙ্ক্ষার কথা জানিয়েছিলেন। তাদের সেই অপেক্ষার পালা শেষ। এখন তারা নিজেদের ভারতীয় হিসাবে পরিচয় দিতে পারবেন।

 
ঢাকা থেকে মোবাইল ফোনে বাংলাদেশের ৫১ ছিটমহলের কয়েকজন বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা হয়। সীমান্তবর্তী ছিটমহলগুলোতে বাংলাদেশের মোবাইল ফোনের নেটওয়ার্ক রয়েছে। পশ্চিবঙ্গের কুচবিহার জেলার দিনহাটা মহকুমার অভ্যন্তরে বাংলাদেশের মধ্য মশালডাঙ্গা ছিটমহলের বাসিন্দা শতবর্ষী আজগর আলী। জীবনের ১০৫ বসন্তের মধ্যে ৬৮টি বসন্ত পার করেছেন ঐ ছিটমহলেই। জীবন সায়াহ্নে এসে তার আর চাওয়া-পাওয়ার কিছুই নেই। ছিটমহল বিনিময় হচ্ছে এটা দেখে যেতে পারছেন এটাই তার জীবনের বড় পাওয়া। বাকী জীবনটা তিনি ভারতের নাগরিক হয়ে থাকতে চান। গতকাল বিকালে পূর্ব মশালডাঙ্গা ছিটমহলের অধিবাসী সাদ্দাম হোসেনের মোবাইল ফোন দিয়ে কথা বলার সময় তিনি এসব কথা বলেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশে যাওয়ার সুযোগ থাকলেও আমরা যাব না। কারণ এখানে জন্ম নিয়ে এখানকার আলো-বাতাসে বড় হয়ে জীবনের এতটা বছর পার করেছি। এখন আর বাংলাদেশে যাওয়ার কোন ইচ্ছা  নেই। একই ছিটমহলের তালেব আলী (৭০) বলেন, আমরা ছিটমহলবাসীরা কৃতজ্ঞ দুই দেশের সরকার প্রধানদের কাছে। কারণ তাদের সদিচ্ছায় আমরা স্বাধীন দেশের নাগরিক হতে চলেছি। তাদের কাছে আমাদের আর কিছু চাওয়ার নেই।
 
পুয়াতুর কুঠি ছিটমহলের বাসিন্দা মনসুর আলী (৭৫) বলেন, আমরা বাংলাদেশের ছিটমহলের নাগরিক হলেও ভারতের সঙ্গেই সব ক্ষেত্রে আমাদের যোগাযোগ। তাই আমরা বাংলাদেশে যেতে চাই না। আমার ছেলে-মেয়েরা সবাই এখানেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। নাতি-নাতনীরা লেখাপড়া করে ভারতে। আমরা কেউই ভারত ছেড়ে বাংলাদেশে যেতে চাই না। 
 
বাত্রীগাছ ছিটমহলের অধিবাসী স্থানীয় একটি কলেজের ছাত্র বিবেক কুমার রায় বলেন, আমার জন্ম ছিটমহলেই। তবে লেখাপড়া করতে হয়েছে পাশের দিনহাটা মহকুমায় গিয়ে। পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান সরকারের সহায়তায় এখন বিদ্যুত্ সুবিধা ভোগ করছি। আশা করছি এখন সকল ধরনের নাগরিক সুবিধা পাব।
 
শাখাতি ছিটমহলের রোশনা জানান, তার স্বামী রবি সরকার কৃষি কাজ করেন। বড় ছেলে সুমন সরকার ভারতের হলদিবাড়ি কলেজে উচ্চ মাধ্যমিক দ্বিতীয় বর্ষে পড়ছে। মেয়ে সুবর্ণা সরকার সাতকরা স্কুলে নবম শ্রেণিতে পড়ে। পারিবারিকভাবে তাদের যোগাযোগ পঞ্চগড়ের সঙ্গে হলেও এখন তারা ভারতের নাগরিক। ভারতের সুযোগ-সুবিধা তারা এখন ভোগ করছেন। একই ছিটমহলের সোহেল রানা বলেন, তিনি কুচবিহারের হলদিবাড়ি নেতাজী সুভাষ বসু মহাবিদ্যালয়ে বিএ শ্রেণির তৃতীয় বর্ষের ছাত্র। স্থলচুক্তি হওয়ার পর তিনি খুশি। শাখাতি ছিটমহলটি জলপাইগুড়ি জেলার সঙ্গে যুক্ত হলেও তাদের সঙ্গে কুচবিহারের হলদিবাড়ি থানার সবচেয়ে বেশি যোগাযোগ হয়। কারণ জলপাইগুড়ি কোতয়ালি থানা শাখাতি ছিটমহল থেকে ৩৫ কিলোমিটার দূরে। আর হলদিবাড়ী থানা তাদের ছিটমহল থেকে মাত্র ৪ কিলোমিটার দূরে। 
 
ভারতের অভ্যন্তরে বাংলাদেশি ৫১ ছিটমহলের ১৪টি ছিটমহল দিনহাটা মহকুমায় অবস্থিত। এখানেই কুচবিহারের মহারাজার বাড়ি। বাকিগুলো মেখলিগঞ্জ, মাথাভাঙ্গা, শীতল কুচি ও তুফানগঞ্জ থানায় অবস্থিত। এসব ছিটমহলের ছেলে-মেয়ে পার্শ্ববর্তী দিনহাটায় বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে লেখাপড়া করে দেশের বিভিন্ন স্থানে চাকরি করছে। ছিটমহলের নাগরিক হলেও তাদের লেখাপড়ায় কোন সময় বাধা আসেনি। দিনহাটা ডিগ্রি কলেজের স্নাতক দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী বাত্রীগাছ ছিটমহলের অধিবাসী রৌশন সরকার বলেন, আমি দিনহাটা উচ্চ বিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক পাস করে দিনহাটা কলেজে পড়ছি। ছিটমহলবাসী হওয়া সত্ত্বেও লেখাপড়ায় কোনদিন ব্যাঘাত সৃষ্টি হয়নি। এখন তো আমরা পুরোপুরি ভারতের নাগরিক হয়ে গেলাম। খুব ভাল লাগছে।
 

মোবাইল ফোনে কথা হয় ভারত-বাংলাদেশ ছিটমহল বিনিময় সমন্বয় কমিটি ভারত শাখার আইন উপদেষ্টা ও দিনহাটা মহকুমা আদালতের আইনজীবী আহসান হাবিবের সাথে। তিনি বলেন, আমাদের দীর্ঘদিনের আন্দোলনের ফসল অবশেষে ঘরে তুলতে যাচ্ছি। ছিটমহল বিনিময়ে আর কোন আইনী বাধা নেই।