দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ১২ জেলায় পরিবহন ধর্মঘটের কারণে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন দূরপাল্লার যাত্রীরা। মঙ্গলবার রাতে সোহাগ পরিবহনের একটি বাসে ডাকাতির ঘটনায় মধুখালী পুলিশ চালক ও হেলপারসহ তিনজনকে গ্রেফতার করে। তাদের মুক্তির দাবিতে যশোরের পরিবহন মালিক ও শ্রমিক সংগঠনের ডাকে এ ধর্মঘট আহবান করা হয়। ধর্মঘটের কারণে গত দুদিন ধরে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন ঢাকাগামী যাত্রীরা। নির্ধারিত সময়ে দাবি মেনে না নেয়ায় গতকাল মালিক ও শ্রমিক সংগঠনগুলো ফরিদপুরের পুলিশ সুপার জামিল হাসান ও মধুখালী থানার ওসি রহুল আমিনকে প্রত্যাহারসহ তিন দফার আল্টিমেটাম দিয়েছে। দাবি মানা না হলে আগামীকাল শুক্রবার সকাল থেকে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ১৬টি জেলায় অনির্দিষ্টকালের জন্য সকল ধরনের যানবাহন চলাচল বন্ধ করে দেয়া হবে। গতকাল যশোর মালিক সমিতি কার্যালয়ে এক জরুরি সভায় নেতৃবৃন্দ এ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
ঢাকা রেঞ্জের ডিআইজি এসএম মাহফুজুল হক নুরুজ্জামান জানান, বাসের চালক ও হেলপার ডাকাতির সঙ্গে জড়িত ছিল বলে যাত্রীরা অভিযোগ করেছেন। যাত্রীবেশী ঐ ডাকাতরা ঢাকার আশুলিয়া থেকে বাসে উঠেছিল। ভোর রাতে ডাকাতির পর যাত্রীরা পুলিশের টহলরত গাড়ির কাছে বাসটি থামাবার জন্য অনুরোধ করে। কিন্তু চালক তাদের কথায় কর্নপাত করেনি। এরপর ডিআইজি বলেন, ফরিদুপুর জেলা পুলিশ সুপারই বিষয়টি ভাল বলতে পারবেন। তিনি ফরিদপুর পুলিশ সুপারের সাথে যোগাযোগ করতে বলেন।
ফরিদপুর জেলা পুলিশ সুপার জামিল হাসানের সঙ্গে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করলে তিনি এ ব্যাপারে কোন তথ্য না দিয়ে এ প্রতিবেদকের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক কথাবার্তা বলেন।
সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের খুলনা বিভাগের আঞ্চলিক কমিটির সভাপতি আজিজুল আলম মিন্টু বলেন, ডাকাতির পর চালকই থানায় গিয়েছিল অভিযোগ জানাতে। কিন্তু থানার ওসি তিন ঘন্টা তাকে বসিয়ে রেখে উল্টা তার বিরুদ্ধেই মামলা নিয়েছে। তিনি বলেন, ফরিদপুরের মধুখালী এলাকায় বাসে ডাকাতির ঘটনা ঘটে থাকে। ডাকাতরা ডাকাতি করে মধুখালী এলাকাতেই নেমে যায়। ডাকাতির কিছু আগেই পুলিশ যাত্রীদের ভিডিও করে। ঐ ভিডিওতেই ডাকাতের শনাক্ত করা সম্ভব।
এ পরিবহন নেতার অভিযোগ, প্রকৃত ডাকাতদের আড়াল করার জন্যই ফরিদপুরের পুলিশ সুপারের নির্দেশে চালক ও হেলপারকে আসামি করা হয়েছে।
তিন দফা দাবি সম্পর্কে তিনি বলেন, আজ (বৃহস্পতিবার) বিকাল ৫টার মধ্যে গ্রেফতার হওয়া শ্রমিকদের নিঃশর্ত মুক্তি, ভিডিও ফুটেজ দেখে ডাকাতদের শনাক্ত করে তাদের গ্রেফতার এবং শ্রমিকদের হয়রানি করার জন্য মধুখালী থানার ওসি ও ফরিদপুরের পুলিশ সুপারের প্রত্যাহার।
পরিবহন মালিক-শ্রমিকদের এ দাবির বিষয়ে মধুখালী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রুহুল আমিনের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি এ ব্যাপারে কোন মন্তব্য করতে অস্বীকার করেন।
মামলা ঃ বাস ডাকাতি ও সড়ক অবরোধের ঘটনায় দুটি মামলা হয়েছে। সড়ক অবরোধের ঘটনায় দ্রুত বিচার আইনে মামলা হয়। মধুখালী থানার উপ-পরিদর্শক এসআই পলাশ দাস বাদি হয়ে মামলাটি দায়ের করেন। এ মামলায় গ্রেফতার হওয়া সোহাগ পরিবহনের মধুখালীর চেকার রবিউল ইসলামসহ ৪০/৫০ জনকে আসামি করা হয়েছে।
মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই আব্দুর রব জানান, রবিউল ইসলামকে গ্রেফতার দেখিয়ে পাঁচ দিনের রিমান্ড চেয়ে মঙ্গলবারই আদালতের মাধ্যমে জেল হাজতে পাঠানো হয়েছে।
এদিকে বাস ডাকাতির ঘটনায় সোহাগ পরিবহনের যাত্রী গাজীপুরের কালিয়াকৈর পৌরসভার আট নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর সানোয়ার হোসেন বাদি হয়ে সোহাগ পরিবহনের বাসের চালক আইনাল, সুপারভাইজার শরিফুল ও হেলপার শাকিল এর নাম উল্লেখ এবং অজ্ঞাতনামা আরও সাত ব্যক্তিকে আসামি করে মামলা করেছেন।
এ মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই মো. সাইফুল আলম জানান, এ মামলায় গ্রেপ্তার চালক আইনাল ও হেলপার শাকিলকে সাত দিনের রিমান্ড চেয়ে মঙ্গলবার জেলার মুখ্য বিচারিক হাকিমের আদালতের মাধ্যমে জেল হাজতে পাঠানো হয়েছে।
ডাকাতির ঘটনা
ঢাকা থেকে বেনাপোলগামী সোহাগ স্ক্যানার পরিবহনের বাসটি সোমবার রাতে ঢাকা ছেড়ে আসে। ২৯জন যাত্রী ছিল। এর মধ্যে ৭জন ডাকাত ছিল। বাসটি ফরিদপুর সদরের রাজবাড়ী রাস্তার মোড় এলাকায় এলে যাত্রীবেশী ডাকাতরা আস্ত্রের মুখে চালক, সুপারভাইজার এবং হেলপারকে জিম্মি করে কলকাতাগামী ২২ যাত্রীর সর্বস্ব লুটে নেয়। পরে ভোরে ঢাকা-খুলনা মহসড়কের মধুখালী উপজেলার মাঝকান্দি-পরীক্ষিতপুর এলাকায় আলতু খান জুট মিলের অদূরে নেমে যায়।
চালক আইনাল হোসেন জানান, রাত সোয়া ৯টার দিকে বেনাপোলের উদ্দেশে রওনা হই। ফরিদপুর রাজবাড়ির রাস্তার মোড়ে আসামাত্র পিছন থেকে যাত্রীবেশী ৭ ডাকাত অস্ত্রের মুখে গাড়ির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ডাকাতি করে।
যাত্রীরা জানান, তাদের কাছ থেকে ৭২০০ মার্কিন ডলার, ২২ হাজার ভারতীয় রুপি, ১৬ ভরি স্বর্ণালংকার, প্রায় ৪ লক্ষ টাকা এবং ২৫টি মোবাইল ফোন নিয়ে যায় ডাকাত দল।