সাগরপথে মালয়েশিয়ায় পাঠানোর নামে মানব পাচার ও নির্যাতন করে মুক্তিপণ আদায়ের ও জিম্মিদের হত্যা করার ঘটনা বিশ্বজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। কিন্তু যে দালালদের মাধ্যমে এই ঘটনা ঘটে, অন্যান্য অপরাধীদের মতো তাদের এতদিন পালিয়ে বেড়াতে হয়নি। ফলে মুক্তিপণের বিপুল টাকা দিয়ে বাড়ি গাড়ি বানিয়ে সবার চোখের সামনে দিয়ে ঘুরে বেড়িয়েছে। শাস্তি না হওয়ায় তারা প্রশাসনকেও পাত্তা দেয়নি। বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, মানবপাচার নিয়ে মিডিয়া একের পর এক সংবাদ প্রকাশের কারণে দালালরা সাময়িক ধাক্কা খেলেও তারা এখনো বেপরোয়া চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে এই ‘ব্যবসা’ ধরে রাখার। ইত্তেফাক সংবাদদাতাদের পাঠানো খবর:
নরসিংদী প্রতিনিধি জানান, নরসিংদীতে এখনো সক্রিয় মানবপাচারকারীদের সহযোগী দালালচক্র। জেলা শহর থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত গ্রাম পর্যন্ত তত্পরতা চালাচ্ছে তারা। মালয়েশিয়া পাঠানোর লোভ দেখিয়ে সহজ-সরল মানুষকে মৃত্যুর পথে ঠেলে দিলেও ধরা-ছোঁয়ার বাইরেই রয়ে যাচ্ছে দালালরা। তবে পুলিশ জানায়, ভুক্তভোগীদের পক্ষ থেকে সুনির্দিষ্ট কোন অভিযোগ পাওয়া না যাওয়ায় এসব দালালের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া সম্ভব হচ্ছে না।
জানা গেছে, দালালদের খপ্পরে পড়ে সমুদ্র পাড়ি দিতে গিয়ে প্রতারণা, জেল, নির্যাতন, আর্থিক ক্ষতি সর্বশেষ প্রাণহানির ঘটনা ঘটছে। জেলা জুড়ে কয়েক স্তরে মানব পাচারে কাজ করছে দালাল চক্র। বিশেষ করে নরসিংদী সদর, রায়পুরা ও শিবপুর উপজেলায় দালালচক্রের তত্পরতা সবচেয়ে বেশি। এ চক্রের সদস্যরা সাধারণত বেকার যুবক, স্বল্প আয়ের শ্রমজীবী মানুষ ও অশিক্ষিত উঠতি বয়সীদের টার্গেট করছে।
দালালের খপ্পরে পড়ে চলতি বছরের শুরুতে সাগরপথে বিদেশে যাবার সময় নিখোঁজ হন নরসিংদী পৌর এলাকার ভাগদী মহল্লার ৪ যুবক। এদের মধ্যে দালালদের নির্যাতনে অহিদ মিয়া নামে একজন মারা যাওয়ার খবর নিশ্চিত হলেও নিখোঁজ রয়েছেন জাইদুল খন্দকার, নজরুল ইসলাম ও সাদেক মিয়া নামের আরো ৩ জন। নিখোঁজ এসব যুবকের পরিবারের অভিযোগ, নরসিংদী শহরের চৌয়ালা মহল্লার আবদুল মান্নান ভুঁইয়ার ছেলে জামাল হোসেনের প্রলোভনে পড়ে বিদেশে গিয়েছিল তারা।
জানা গেছে, থাইল্যান্ডে পৌঁছার পর তাদের উপর চালানো হয় অমানুষিক নির্যাতন। নির্যাতনের শিকার হয়ে ঐ যুবকরা স্ব-স্ব পরিবারের সদস্যদের কাছে ফোন করে জামাল হোসেনের কাছে মুক্তিপণের টাকা দিতে বলেন। পরিবারের লোকজন তাদের বাঁচাতে দফায় দফায় জামালের চৌয়ালাস্থ বাসায় গিয়ে টাকা দেন। এরপরও কোন খোঁজ মিলছে না ওই যুবকদের। অভিযোগের ব্যাপারে জানতে চৌয়ালা মহল্লার বাড়িতে গিয়ে জামাল হোসেনকে পাওয়া যায়নি। কথা বলতে রাজি হননি পরিবারের সদস্যরাও। জানা গেছে স্থানীয় দালালরা এখনো গোপনে তত্পরতা চালিয়ে যাচ্ছে।
চট্টগ্রাম অফিস জানায়, বড় ধরনের অপরাধ করেও দৃষ্টান্তমূলক সাজা না হওয়ায় সমুদ্রপথে অবৈধভাবে মালয়েশিয়া ও থাইল্যান্ডে মানবপাচারকারীরা বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। গত ৫ বছরে চট্টগ্রাম জেলা ও মহানগর এবং কক্সবাজার জেলায় মানবপাচার আইনে প্রায় দেড় হাজার ব্যক্তিকে আসামি করে ৩শ’র মত মামলা হয়েছে। মানব পাচারের ভিকটিমরা দরিদ্র ও অসহায় পরিবার থেকে আসার কারণে মামলার ব্যাপারে প্রায়শই পুলিশের কোনো আগ্রহ থাকে না। নানা ধরনের ঝক্কির কথা বিবেচনা করে দরিদ্র ভিকটিমরা প্রভাবশালী পাচারকারীদের বিরুদ্ধে সাক্ষী দিতে আদালতে উপস্থিত হন না। পুলিশের এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মানবপাচারের মামলা দায়সারাভাবে তদন্ত করা হয়ে থাকে। ফলে আসামিদের তেমন দুশ্চিন্তা করা লাগে না।
ভিকটিমদের নিরাপত্তার অভাবও মানবপাচার মামলা অকার্যকর হয়ে পাড়ার অন্যতম কারণ। চট্টগ্রামে কয়েকজন ইত্তেফাককে জানান, মামলার সাক্ষ্য দিতে আদালতে গেলে পাচারকারী চক্র তাদেরকে প্রাণে মেরে ফেলার হুমকি দেয়। তাই তারা আদালতে যেতে চান না।
ভ্রাম্যমাণ প্রতিনিধি জানান, ঝিনাইদহ সদর উপজেলার দুই পাচারকারীর বাড়িতে হামলা চালিয়েছে গ্রামবাসি। গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে হীরাডাঙ্গা-শুড়াপাড়া গ্রামের তোফা শাহ’র ছেলে হারুন শাহ ও এলেম বিশ্বাসের ছেলে খলিল বিশ্বাসের বাড়িতে এ হামলার ঘটনা ঘটে।
পাচার হওয়া হাসান আলীর পিতা আব্দুর রহমান জানান, গ্রামের হারুন শাহ, খলিলুর রহমান, মনিরুল, ইয়ার আলীসহ আরো কয়েকজন দীর্ঘদিন ধরে বিদেশে মানুষ পাচারের সাথে জড়িত। তারা ৩ মাস আগে ফুসলিয়ে তার ছেলে হাসান আলী ও একই গ্রামের আনসার আলীর ছেলে রাকিব হাসানকে মালয়েশিয়া পাঠায়। বেশ কিছুদিন আগে মোবাইল ফোনে ছেলে দু’জনকে মারপিঠ করার শব্দ শুনিয়ে জন প্রতি আড়াই লাখ টাকা দাবি করা হয়। টাকা না দেওয়ায় তাদের আর কোন খোঁজ মিলছে না। গতকাল সকালে হারুন শাহ ও খলিল বিশ্বাসের বাড়িতে ছেলে দু জনকে ফেরত্ আনার কথা বলতে গেলে তর্ক-বিতর্ক শুরু হয়। এর এক পর্যায়ে বিক্ষুব্ধ গ্রামবাসি পাচারকারীদের বাড়ি-ঘরে হামলা চালায়। দুটি বাড়িতে তারা হালকা ভাংচুরও করে।