বহু যুবকের সন্ধান নেই স্বজনদের শাসাচ্ছে পাচারকারীরা

আপডেট : ২২ মে ২০১৫, ২৩:৫৯

মানবপাচারকারী ও তাদের নিয়োজিত দালালদের খপ্পরে পড়ে অবৈধভাবে সমুদ্রপথে মালয়েশিয়া যাওয়ার সময় নিখোঁজ রয়েছেন সাতক্ষীরার কলারোয়ার অর্ধশতাধিক যুবক। কক্সবাজারের মহেশখালীরও পাঁচ যুবকের কোন খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না। তারা কোথায় আছেন, বেঁচে আছেন না মারা গেছেন - কিছুই জানে না তাদের স্বজনরা। স্বজনরা বিচার চাইতে গেলে মানবপাচারকারীরা শাসাচ্ছে এমন অভিযোগ পাওয়া গেছে কয়েকটি স্থান থেকে।

 
কলারোয়া (সাতক্ষীরা) সংবাদদাতা জানান, উপজেলার একটি পৌরসভা ও ১২টি ইউনিয়নের অর্ধশতাধিক যুবক নিখোঁজ রয়েছেন। এর মধ্যে বসন্তপুর নামের একটি গ্রামের ১৪ যুবক আছেন। এরা হলেন,  সুমন, সাহেদ আলী, সাইফুল ইসলাম, রাজু আহম্মেদ, আব্দুস সাত্তার, সোহাগ হোসেন, বাবু, আলামিন, কবিরুল ইসলাম, আজমুল, হোসেন, আরিফ হোসেন, আব্দুর রহিম, খলশি গ্রামের মহিদুল ইসলাম, ওফাপুর গ্রামের সিরাজুল ইসলাম, আব্দুর রাজ্জাক, জাকির হোসেন, আব্দুল­াহ, তরুলিয়া গ্রামের জামিরুল ইসলাম, কামারালী গ্রামের গোলাম রসুল, শুভংকরকাটি গ্রামের সজিবুর  রহমান, ঘরচালা কাশিয়াডাঙ্গা গ্রামের রাসেল রানা সুমন, একই গ্রামের শহিদুল ইসলাম, জাহাঙ্গীর হোসেন।
 
বসন্তপুর গ্রামের জালাল মোড়লের স্ত্রী সালেহা খাতুন মেরী জানান, উপজেলার শুভংকরকাটি গ্রামের করিম ময়রার মেয়ে পারুল আমার অনার্স পড়ুয়া ছেলে সুমনকে মালয়েশিয়ায় গিয়ে মাসে এক লাখ টাকা আয়ের প্রলোভন দেখায়। অসচ্ছল সংসারে এমন উপার্জনের কথা ভেবে সুমন লেখাপড়া বন্ধ করে দেয়। ছেলের ইচ্ছা পূরণে বসতভিটার একাংশ বিক্রি করে পারুলের হাতে দেড় লাখ টাকা তুলে দেই দেড় বছর আগে। তারপর সুমন বাড়ি থেকে চলে যায়, আর তার খবর পাওয়া যায়নি।
 
একই গ্রামের সিরাজুল ইসলাম ও আরশাদ আলী জানান, সাগর পথে বিদেশ যাওয়া যায় এ কথা এলাকার কেউ আগে জানতো না। পার্শ্ববর্তী ওফাপুর গ্রামের আদম দালাল লাল্টু প্রথমে বসন্তপুর গ্রাম থেকে দুইজনকে ভালোভাবে সাগর পথে মালয়েশিয়ায় পাঠায়। পরে সে এলাকার ছেলেদের নামমাত্র খরচে সমুদ্রপথে বিদেশ যাওয়ার প্রলোভন দেখায়। পরে আদম পাচারকারী শুভংকরকাটি গ্রামের পারুল ও তার স্বামী মরিরামপুর উপজেলার পারখাজুরা গ্রামের সাত্তার মোড়লের ছেলে আজিজ মোড়লকে এলাকায় নিয়ে এসে তাদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়। তাদের প্রলোভনে পড়ে সোহাগ ও সুমনকে সাগর পথে মালয়েশিয়ায় পাঠানো হয়। কিন্তু প্রায় দুই বছরেও তাদের সন্ধান মেলেনি। এ বিষয়ে পুলিশ ও মানবাধিকার কমিশনে অভিযোগ করা হয়। কিন্ত কোন ফল হয়নি। উপজেলার কামারালী গ্রামের মর্জিনা খাতুন জানান, তার স্বামী গোলাম রসুলকে প্রলোভন দেখিয়ে উপজেলার যুগীখালী গ্রামের মানব পাচারকারী সহিদুল ইসলাম অবৈধভাবে সমুদ্রপথে মালয়েশিয়া নিয়ে যায়। নৌকায় ডায়রিয়ায় সে মারা যায়।
 
এ ব্যাপারে কলারোয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা শেখ আবু সালেহ মাসুদ করিম জানান, একটি চক্র প্রলোভন দেখিয়ে উপজেলার কয়েকজন যুবককে মালয়েশিয়া নিয়ে যায়। তাদের খোঁজ না পাওয়ায় একটি মামলা দায়ের করা হয়েছে।
 
মহেশখালীর ৫ যুবকের সন্ধান নেই
 
মহেশখালী (কক্সবাজার) সংবাদদাতা জানান, কক্সবাজারের মহেশখালী উপজেলার মাতারবাড়ীর পাঁচ যুবক সাত মাস ধরে নিখোঁজ রয়েছেন। তাদের স্বজনরা জানিয়েছেন, তারা দালালদের মাধ্যমে মালয়েশিয়া সমুদ্র পথে মালয়েশিয়া গিয়েছিল। বিচার চাইতে গেলে দালালরা তাদের হুমকি দিচ্ছে বলেও তারা অভিযোগ করেছেন। নিখোঁজ যুবকরা হলো - মো: কাসেম, মো: জোবাইর, সুমন, রাশেল, আজিজুর রহমান। মহেশখালী থানার ওসি আলমগীর হোসেন জানিয়েছেন, এ বিষয়ে অভিযোগ পেয়েছি তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
 
চকরিয়া (কক্সবাজার) সংবাদদাতা জানিয়েছেন, সমুদ্রপথে মালয়েশিয়া যাওয়ার সময় নিখোঁজদের স্বজনরা পুলিশের কাছে যেতে শুরু করায় তাদের হুমকি দেয়া হচ্ছে। প্রথম দিকে সরাসরি এবং পুলিশ সক্রিয় হওয়ার পর টেলিফোনে হুমকি দেয়া হচ্ছে।
 
মুক্তিপণ দিয়েও জীবন দিলেন হাবিব উল্লাহ
 
লোহাগাড়া (চট্টগ্রাম) সংবাদদাতা জানান, মো: হাবিব উল্লাহ (২৫) চট্টগ্রামের লোহাগাড়া উপজেলার ্আমিরাবাদের সুখছড়ী হাছির পাড়ার মাওলানা শফিক আহমদের পুত্র। মালয়েশিয়ায় কম খরচে চাকরি দেয়ার প্রলোভন দেখিয়ে পাচারকারীরা তাকে কক্সবাজার থেকে নিয়ে যায়। পরে তাকে ফেরত দেয়ার কথা বলে দুই দফায় এক লাখ ৯০ হাজার টাকা আদায় করে পরিবারের কাছ থেকে। এই টাকা নেয়া হয় ইসলামী ব্যাংক কক্সবাজার শাখার সঞ্চয়ী একাউন্ট নম্বর- ৫৮৫৮৭-এর মাধ্যমে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাকে ছাড়া হয়নি। পরিবার সূত্রে জানা গেছে,  হাবিব উল্লাহকে পাচারকারীরা থাইল্যান্ডের একটি ক্যাম্পে রেখেছিল। তাকে নির্যাতন করা হতো, খাবার দেয়া হতো না। এ ব্যাপারে হাবিব উল্লাহর ভাই মো: রোকন উদ্দীন গত ৩ ফেব্রুয়ারি কক্সবাজার পৌরসভার দক্ষিণ পাহাড়তলী এলাকার মাসুদুর রহমান ও তার স্ত্রী মিনুয়ারা বেগমের বিরুদ্ধে মামলা করেছেন।
 
কলাপাড়ায় মানব পাচারকারী রিমান্ডে
 
কলাপাড়া (পটুয়াখালী) সংবাদদাতা জানান, কলাপাড়ায় মানব পাচারের মামলায় আটক মোঃ জাহাঙ্গীর মুন্সিকে দুই দিনের রিমান্ডে নিয়েছে পুলিশ। মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই মোঃ শহিদুল ইসলাম বৃহস্পতিবার জাহাঙ্গীর মুন্সিকে পটুয়াখালী আদালতে সোপর্দ করে সাত দিনের রিমান্ড আবেদন করলে আদালত দুই দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করে। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ সে কলাপাড়া উপজেলার লতাচাপলী ইউনিয়নের পাঞ্জুপাড়া গ্রামের আঃ খালেক মিয়ার ছেলে ইসমাইলকে মালয়েশিয়ায় পাচার করে।
 
চকরিয়ার শতাধিক যুবকের খোঁজ মিলছে না
 
কক্সবাজারের চকরিয়ায় শতাধিক যুবকের খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না। পরিবার সদস্যদের অগোচরে স্থানীয় এক দালালের মাধ্যমে সাগরপথে তারা মালয়েশিয়া গিয়েছিলেন প্রায় দুইবছর আগে। ট্রলারে ওঠার পর দালালের লোকজন তাদের জিন্মি করে পরিবারের কাছ থেকে জনপ্রতি ১৫ থেকে ২৫ হাজার টাকা করে আদায় করে। ট্রলারে থাকার সময় তাদের সঙ্গে পরিবারের সদস্যদের কথাও হয়। কিন্তু এরপর থেকে তাদের আর হদিস নেই। তাদের ভাগ্যে কি ঘটেছে সেটাও জানে না পরিবারের সদস্যরা।
 
গতকাল শুক্রবার বিকালে চকরিয়া প্রেসক্লাবে নিখোঁজ যুবকদের স্বজনদের মধ্যে কয়েকজন সাংবাদিকদের জানান, ২০১৪ সালে তাদের সন্ধানে সরকারের সহযোগিতা চেয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর কাছে লিখিত আবেদন করেন চকরিয়া উপজেলার পূর্ববড় ভেওলা ইউনিয়ন পরিষদের মেম্বার আশরাফ হোসেন। এরপর প্রায় পাঁচ মাস পুলিশ এলাকা পরিদর্শন করে নিখোঁজ যুবকদের স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে ঘটনাটির সত্যতা পেয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে প্রতিবেদন দাখিল করেন। কিন্তু তারপর আর কোন ইতিবাচক পদক্ষেপ দেখা যায় নি। স্বজনরা এই যুবকদের সন্ধান পেতে সরকারের সহযোগিতা চেয়েছেন।
 

এ বিষয়ে চকরিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) প্রভাষ চন্দ্র ধর বলেন, ইতিমধ্যে পুলিশের পক্ষ থেকে উপজেলায় মানব পাচারের সঙ্গে জড়িত দালালদের সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। তাদেরকে আটক করে নিখোঁজ যুবকদের সম্পর্কে অনুসন্ধান চালানো হবে।