সাক্ষ্য আইন সংশোধন চান প্রধান বিচারপতি

আপডেট : ২৭ মে ২০১৫, ০০:০৬

সাক্ষ্য আইনের ১৫৫ ধারা সংশোধনের আহ্বান জানিয়ে প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহা বলেছেন, আমাদের সাক্ষ্য আইন এতো ভাল তবে এর কিছু ধারা আছে যা ঔপনিবেশিক চিন্তা-চেতনায় করা। তখন জনগণের মঙ্গলের কথা চিন্তা করে এটি করা হয়নি। আমি মনে করি আইনের এই কালো বিধানগুলো তুলে দেয়া উচিত।

 
“নারীর প্রতি সহিংসতা বিষয়ক যুগান্তকারী রায়: বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান” বইয়ের দ্বিতীয় খণ্ড প্রকাশনা অনুষ্ঠানে তিনি এই আহ্বান জানান। অনুষ্ঠানে আপিল বিভাগের বিচারক বিচারপতি মো. ঈমান আলী বলেন, মেয়েদের তাড়াতাড়ি বিয়ে দেয়ার জন্য নানা পদ্ধতি বের করা হয়। এর মধ্যে এফিডেভিট করে বয়স বাড়িয়ে নেয়া হয়। এখন মেয়েদের বয়স ১৮ বছরের পরিবর্তে ১৬ বছর করার চিন্তাভাবনা করা হচ্ছে। যদি এটা করা হয় তাহলে আমি মনে করি তা হবে নিজের পায়ে কুড়াল মারার মত কাজ।
 
মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে গতকাল সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতি মিলনায়তনে এই মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। অনুষ্ঠানে আপিল বিভাগের বিচারক বিচারপতি নাজমুন আরা সুলতানা, বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন, সিনিয়র আইনজীবী ব্যারিস্টার এম আমীর-উল ইসলাম, অ্যাডভোকেট সিগমা হুদা, অ্যাডভোকেট ফাওজিয়া করিম ফিরোজ প্রমুখ বক্তব্য রাখেন। সভাপতিত্ব করেন আয়োজক সংগঠনের নির্বাহী পরিচালক শাহীন আনাম।
 
অনুষ্ঠানে নারী নেত্রীদের উদ্দেশে প্রধান বিচারপতি বলেন, আমাদের আইনের এক জায়গায় বলা আছে কারো চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন উত্থাপন করা যাবে না; কিন্তু ধর্ষণের মামলায় সাক্ষ্য আইনের ১৫৫ ধারার একটি উপ-ধারায় বলা আছে যে, যদি কোন মহিলা কোন ছেলের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনে তা হলে সে মহিলার চরিত্র নিয়ে কথা বলা যাবে। একটা মহিলার সম্ভ্রম নষ্ট হলো অথচ একজন আসামি তার চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন তুলবেন এর চেয়ে দুঃখজনক আর কি হতে পারে। আমি আশা করব- আপনারও আইনের এই ধারা সংশোধনের দাবি জানাবেন। এ ধরনের একটি মামলায় ভারতে এজলাস কক্ষের ভেতরে ভিকটিম মৃত্যুবরণ করে এবং ওই ঘটনায় নারী নেত্রীরা আন্দোলনে নামে। যার প্রেক্ষিতে সম্ভবত সম্প্রতি ভারতে সাক্ষ্য আইনের এই ধারা সংশোধন করা হয়েছে।
 
প্রধান বিচারপতি বলেন, মানব পাচারের শিকার হয়ে শুধু পুরুষরাই নন, মহিলারাও ব্যাংকক ও মালয়েশিয়ার ক্যাম্পগুলোতে আটক আছেন। আপনারা যদি আমাদের রাষ্ট্রদূতকে সহযোগিতা করেন তাহলে এই নিরপরাধ মহিলাকে রক্ষা করা যাবে। তিনি বলেন, আমি প্রধান বিচারপতির দায়িত্ব নেয়ার পর সিলেট কেন্দ্রীয় কারাগার পরিদর্শনে গিয়ে যা দেখলাম তা লোম হর্ষক ঘটনা। যুবতী মেয়েরা সেখানে বন্দী রয়েছেন। আমি আরো জানতে পারলাম ১৫-২০ মহিলা বিভিন্ন মামলায় সাজা পেয়ে কারাভোগ করছেন। তাদের আইনি সহায়তা দেয়ার মতো কেউ নেই। মহিলারা কি পরিমাণ নিগৃহীত হচ্ছেন ভাষায় বলার মতো না।
 
তিনি বলেন, ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারেও অনেক মহিলা নিগৃহীত হচ্ছেন। অনেক তরুণী মিথ্যা মামলায় সাজা খাটছেন। এছাড়া গাজীপুরের মহিলা ও শিশু পুনবার্সন কেন্দ্রে ৫৪ ধারায় অনেক তরুণী ও মহিলাকে আটক করে রাখা হয়েছে। সেখানে চট্টগ্রাম ও গাইবান্ধার কয়েকটি মেয়ে আছে তাদেরকে বছরের পর বছর আদালতে হাজির করা হয় না। আটকিয়ে রাখা হয়েছে। আমার কাছে প্রতিবেদন এসেছে যে, এসব মেয়ে যৌন নিগৃহীত হয়েছে এই অপরাধে তাদেরকে আটকিয়ে রাখা হয়েছে। আমি মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যানকে একটি তালিকা দিয়ে এসব নারীর বিষয়ে ব্যবস্থা নেয়ার কথা বলেছিলাম। কিন্তু আজ পর্যন্ত দৃশ্যমান কোন অগ্রগতি দেখতে পাইনি।
 
প্রধান বিচারপতি বলেন, ইউরোপীয় ইউনিয়ন গ্রাম আদালতের উন্নয়নের জন্য কয়েক মিলিয়ন ডলার সাহায্য দিতে চেয়েছিলো। আমি তাদেরকে বললাম, এতে লাভ হবে না। তার চেয়ে সরকারের যে লিগ্যাল এইড তাতে এই টাকা দিয়ে দিন। কারণ কোন নির্বাচনই নির্দলীয় হয় না। এছাড়া গ্রাম আদালতে যারা বিচার করেন তারা মোড়ল বা মাতুব্বর। যাদের প্রভাব বেশি থাকে তাদের দিকেই রায়টা যায়। এখানে নিরপেক্ষ কোন বিচার হয় না। পরে তারা অর্থটা লিগ্যাল এইড সংস্থাকে দিয়ে দিয়েছে।
 
বিচারপতি নাজমুন আরা সুলতানা বলেন, কঠিন থেকে কঠিনতর আইন করা সত্ত্বেও বাংলাদেশে নারীর প্রতি সহিংসতা বেড়েই চলেছে উদ্বেগজনকভাবে। বেশ কিছু বিশেষ আইন করা হয়েছে নারী স্বার্থ রক্ষার্থে। পৃথিবীর অন্য কোন দেশে নারীর স্বার্থ রক্ষার্থে এত বেশি আইন করা হয়নি। এত বেশি বিশেষ আইন করার পরও নারী নির্যাতন বেড়েই চলেছে এবং নারী নির্যাতনকারীরা খুব সহজেই পার পেয়ে যাচ্ছে। উচ্চ আদালতের অনেক রায়ে নারীর স্বার্থ রক্ষা হয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
 
বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন বলেন, আমাদের দেশের আদালতে অনেক গুরুত্বপূর্ণ রায় দিচ্ছেন বিচারকরা। সেগুলোর সংকলন হচ্ছে না। কোথায় যেন হারিয়ে যাচ্ছে। তিনি বলেন, ফতোয়া, হিজাব পরিধান করা ও যৌন হয়রানি নিয়ে আমার দেয়া চারটি রায় এই সংকলনে স্থান পায়নি।
 
এম আমীর-উল ইসলাম বলেন, আইনজীবী ও বিচারকদের এই বই রেফারেন্স হিসেবে কাজে লাগবে। বইটিতে সংকলিত রায়গুলো দেশের পরিধি ছাড়িয়ে বিদেশেও সমাদৃত হয়েছে।
 

শাহীন আনাম বলেন, সকলেই যেন সঠিক ও সময়মত বিচার পায়। যদি তা না পায় তাহলে বিচার ব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা কমে যাবে।