তাঁর ব্যক্তিজীবনের মতো লেখালেখিতেও মঈনুল আহসান সাবের উচ্চকণ্ঠ নন। উচ্চনিনাদ পাওয়া যায় না তাঁর পাত্র-পাত্রীর কণ্ঠস্বরে। যেখানে লেখকের নিজের বর্ণনার অংশ, অর্থাত্ ন্যারেশন, সেখানেও কোনো স্বরগ্রাম উঁচু করে কথা বলেন না লেখক। কিন্তু তারপরেও এত তীব্রতা কোত্থেকে অর্জন করে তাঁর গদ্য? এত কম কথা বলা চরিত্রগুলোও কেমনভাবে পাঠকের কানে ঝনঝন করে বাজিয়ে চলে নিজেদের অস্তিত্বের ঘোষণা?
এইসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পাওয়া সহজ নয়। হয়তো লেখক নিজে উন্মোচন করে না দিলে আমরা কোনোদিনই জানতে পারব না এই অপরূপ সৃষ্টিরহস্যের কারিগরি ও বীজতলার নির্মাণ। আমরা কেবলমাত্র ধারণা করতে পারি যে, মঈনুল আহসান সাবের এটা করতে পারেন, কারণ তাঁর রয়েছে অসামান্য গভীর সাহিত্য ভ্রমণ, জীবনের সকল তল-উপতল ভ্রমণ, সমাজের স্তরান্তরের সাথে গভীর পরিচয়, এবং সর্বোপরি নিজে কোন পথে সাহিত্যের রাজপ্রাসাদে পৌঁছাতে চান, তা সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা।
আমরা আলোচনার সময় একজনকে বড় করে দেখাতে গিয়ে অন্য অনেকজনকে ছোট করে দেখাতে অভ্যস্ত। কিন্তু সাহিত্যে কাউকে বড়-ছোট দেখানোর আদৌ কোনো প্রয়োজন হয় না। সাহিত্যে এত যে বিশাল বিশাল শূন্যতা রয়ে গেছে এবং চিরকাল থাকবে, যেখানে আলাদা আলাদা ভাবে কাজ করার সুযোগ রয়েছে প্রত্যেকেরই, প্রত্যেকেরই রয়েছে নিজস্ব জমিন নিজস্ব চাষপদ্ধতি বেছে নেবার অবাধ সুযোগ, এই সত্যটি বুঝতে পারার মতো লেখকের এবং আলোচকের বড়ই অভাব আমাদের দেশে। মঈনুল আহসান সাবেরকে কারো মতো হতে হয়নি, কারো সাথে তাঁকে তুলনীয় হতেও হয় না। কারণ, শক্তিমান সাহিত্যিকরা কেউ কারো সাথে তুলনীয় নন, বরং প্রত্যেকেই অনন্য। নিজস্ব খামারের মালিক, হোক সে খামার বিশাল দিগন্তব্যাপী ব্যাপ্ত, কিংবা নিতান্তই নিজের আঙিনার মতো ছোট্ট। নিজস্ব খামারের মালিক লেখক-কবির সংখ্যা খুব বেশি নেই আমাদের দেশে। সেই কমসংখ্যক লেখকদের একজন মঈনুল আহসান সাবের।
আমাদের কথাসাহিত্যে মঈনুল আহসান সাবের অন্তত একটি জিনিস প্রমাণ করেছেন। সিরিয়াস সাহিত্য রচনা করতে হলে অবশ্যই গ্রামজীবনের দ্বারস্থ হতে হবে, নিম্নবিত্ত কিংবা বিত্তহীন মানুষদের নিয়ে নিয়ে লিখতে হবে—এমন একটি ধারণা শিকড় গেড়ে বসে আছে আমাদের সাহিত্যচিন্তনে। এই চিন্তাকে ভুল প্রমাণ করেছেন মঈনুল আহসান সাবের। শহরবাসী কিংবা নগরবাসী মধ্যবিত্ত-উচ্চবিত্ত মানুষদের নিয়ে তিনি রচনা করেছেন একের পর এক মূল্যবান গল্প-উপন্যাস। আমরা তো বালজাকে-তলস্তয়ে-দস্তয়ভস্কিতে দেখেছি কীভাবে সমাজের উপরতলার মানুষদের ফাঁপা জীবন নিয়ে অসাধারণ ও কালজয়ী উপন্যাস রচনা করা সম্ভব। এই ক্ষেত্রে আমাদের দেশে মঈনুল আহসান সাবেরই আপসহীন একরোখা কলম-চালক।
গল্পলেখকের উপজীব্য প্রধানত মানুষ, ভিত্তিভূমি মানুষ, সর্বোপরি লক্ষ্যও মানুষ। তাই লেখক মানুষকে পর্যবেক্ষণ করেন বিভিন্ন দিকে আলো ফেলে। ব্যক্তির অন্তর্লোক, মনোবিকলন অবশ্যই হতে পারে গল্পের উপজীব্য। কিন্তু যতক্ষণ না ব্যক্তিকে উপস্থাপন করা হচ্ছে সমষ্টি-পরিবার-সমাজ-রাষ্ট্রের আধারে, ততক্ষণ পর্যন্ত পরস্ফুিটিত হতে পারে না ব্যক্তির সর্বাঙ্গীন রূপ। তাই ব্যক্তি নিয়ে কাজ করলেও গল্পকারকে হতে হয় প্রখর সমাজদৃষ্টিসম্পন্ন, সমাজ বিশ্লেষণ ক্ষমতার অধিকারী। যা কিছু ব্যক্তিকে প্রভাবিত করে—পরিবেশ, প্রতিবেশ, সংস্কৃতি, অর্থনীতি, প্রগতি, বিকৃতি—সবকিছুই তাই লেখকের অধ্যয়ন-অনুধ্যানের বিষয়। পৃথিবীর সকল দেশের এমনকি একই দেশের সকল অংশের আর্থ-সামাজিক স্তরাবস্থান এক নয়। আর সেই দেশ যদি সবসময় অস্থির, সমাজ যখন ভাঙা-গড়ার খেলায় কোনদিকে যাবে তা ঠিক করতে পারছে না, তখন সেই দেশ ও সমাজের আর্থ-সামাজিক-সাংস্কৃতিক স্তরবিন্যাস সম্পর্কে নিখুঁত ধারণা সবচেয়ে বড় সমাজবিজ্ঞানীর পক্ষেও সম্ভব নয়। তাই বেশিরভাগ লেখককে কাজ করতে হয় সেই জনগোষ্ঠীকে নিয়েই যাকে তিনি সবচেয়ে ভালো এবং নির্ভুলভাবে চেনেন। ভাসা ভাসা জ্ঞান নিয়ে কোনো জনগোষ্ঠীর সম্পর্কে লেখালেখিতে প্রায়শই সেই জনগোষ্ঠী সম্পর্কে ভুল বিশ্লেষণ এবং ভুল মনোভঙ্গির ভয় থেকেই যায়। স্মর্তব্য, রবীন্দ্রনাথের বিশাল সৃষ্টির মাঝে ঘরের পাশের মুসলমান সম্প্রদায় নিয়ে লেখা শূন্যের কোটায়। এটা রবীন্দ্রনাথের সীমাবদ্ধতা নয়, বরং সচেতনারই প্রমাণ। যারা মঈনুল আহসান সাবেরকে শহরবাসী মধ্যবিত্তের কথাকার বলে কোণঠাসা করার মনোভাব পোষণ করেন, তারা বরং তাঁর শক্তির দিকটাকেই আরো বেশি করে স্বীকার করে নেন।
আপাতদৃষ্টিতে সরলচালের গল্প লিখে যান মঈনুল আহসান সাবের। গল্পহীন গল্পের নামে অনুভূতির গল্পহীন অনুবাদ তিনি কখনোই করেননি। ছোটগল্পে আখ্যানের ভূমিকাকে সর্বৈব হিসাবে না দেখলেও আখ্যানকে অস্বীকার তিনি করেন না। এক্ষেত্রে তিনি মানুষের উপমা মনে করিয়ে দেন। মানুষের শরীর হচ্ছে শুধু হিমবাহের চোখে দেখা অংশটুকু। হিমবাহের ভেসে থাকা অংশ দেখে অনভ্যস্ত চোখ আন্দাজ করতে পারে না তার সঠিক বিস্তৃতি কতখানি। কিন্তু কথাটা বিপরীত অর্থেও সত্য। মানুষের শরীরই যেমন সব নয়, তেমনি শরীর বাদ দিয়েও মানুষ নয়। ছোটগল্পের আখ্যানটাই যেমন ছোটগল্প নয়, তেমনি আখ্যানটাকে বাদ দিয়েও ছোটগল্প নয়। গল্পহীন গল্প লিখতে উত্সাহীরা এই কথাটা ভেবে দেখতে পারেন।
অঞ্চলবিশেষকে আশ্রয় করেই গল্প গড়ে ওঠে। কিন্তু গল্পের পাঠক নিশ্চয়ই শুধু সেই অঞ্চলে সীমাবদ্ধ অধিবাসী নন। গল্পে চলমান বাস্তবতার ছোঁয়া দেবার জন্য অনেক ক্ষেত্রে, বিশেষ করে কথোপকথনে লেখকরা আঞ্চলিক কথ্য বা উপভাষা ব্যবহার করেন। করেছেন মঈনুল আহসান সাবেরও। কিন্তু সেই সাথে তিনি সতর্ক থেকেছেন, তা যেন অন্য অঞ্চলের পাঠককে সংবিত্তি থেকে বঞ্চিত না করে। সেই কারণে তিনি আঞ্চলিক বা উপভাষাকে প্রয়োজনীয় পরিমার্জনা করে নেন। তাতে ডকুমেন্টেশনের প্রখরত্ব ক্ষুণ্ন হলেও, যেহেতু কথাসাহিত্য শুধুমাত্র সময় ও জীবনের দলিলমাত্র নয়, ফলে বৃহত্তর পাঠকগোষ্ঠী এবং শিল্পের উপকারই হয়।
মধ্যবিত্ত সমাজের জন্য মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো এমন অস্বস্তিকর লেখক বাংলাসাহিত্যে খুব কম। মধ্যবিত্তের নির্লজ্জ আত্মকেন্দ্রিকতা, শক্তিমানের অনুগ্রহ লাভের জন্য যেকোনো স্তুতি উচ্চারণে পারঙ্গমতা, সব সময় উপরের দিকে নয়ন মেলে উপরে ওঠার রাস্তা খোঁজার প্রবণতা, প্রলয়কালে বালিতে মুখ গোঁজা উটপাখির মতো আত্মপ্রতারণা—সব কিছু মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় এমন নির্মোহ নৈর্ব্যক্তিকতা নিয়ে তুলে ধরেছেন, যে নৈর্ব্যক্তিকতা এতদিন অচেনা ছিল বাংলা সাহিত্যে। মধ্যবিত্তের অন্তঃসারশূন্যতা ও গ্লানির চিত্র আগেও এঁকেছেন কেউ কেউ। মানিকের প্রায় অব্যবহিত পূর্বসূরি কল্লোলগোষ্ঠীর লেখকদেরও কোনো মোহ ছিল না মধ্যবিত্ত সম্পর্কে। তাঁরাও এই সমাজের মর্মকেন্দ্রস্থ সমস্ত অসারতা ও আত্মবঞ্চনাকে আঘাত করতে চেয়েছেন অনেকভাবে। কিন্তু তাঁদের মধ্যে আত্মধিক্কার যে পরিমাণে ছিল, সেই পরিমাণে আত্মসমালোচনা ছিল না। এই আত্মনিরীক্ষার জন্য যে পরিমাণ নৈর্ব্যক্তিকতা অপরিহার্য তা তাঁর পূর্বসূরি কল্লোলীয়দের আয়ত্তে ছিল না। মানিকই প্রথম লেখক যিনি আয়ত্ত করেছিলেন এই নির্মম গুণটি। তাঁর গল্পগুলো পড়তে গিয়ে মনে হয়, সমাজের বাইরে দাঁড়িয়ে একজন ঈশ্বরের মতো নিরাসক্ত বিচারক সবরকম আচ্ছন্নতাবর্জিত যুক্তির আলোকে আমাদের সমাজজীবনকে ফালা ফালা করে বিশ্লেষণ করছে। অথবা মনে হয়, একজন আদিম মানব যেন নিরঞ্জন দৃষ্টিতে দেখে নিচ্ছে বাঙালি মধ্যবিত্ত সমাজকে। এই সমাজের গায়ের ওপরের সমস্ত বর্ণ-প্রলেপের নেপথ্যে যে ভণ্ডামি, স্বার্থবাদ আর কূটকামনার সর্পিল প্রবাহ বয়ে চলেছে—তার কিছুই সেই আদিম মানবের দৃষ্টি এড়িয়ে যেতে পারছে না। মধ্যবিত্ত সমাজের এমন নির্মম ব্যবচ্ছেদ অদৃষ্টপূর্ব। বন্ধুর চোখকে নষ্ট করে বা বন্ধুর দৃষ্টিশক্তিকে বিনষ্ট করে আরেক বন্ধু তার স্ত্রীকে আয়ত্ত করে, কিংবা যখন দুস্থ ভাড়াটের কাছ থেকে বাকি ভাড়া আদায় করতে না পেরে বাড়িঅলা তার পাওনা মিটিয়ে নেয় ভাড়াটের প্রতিবন্ধী মেয়েটির সঙ্গে ব্যভিচার করে, তখন মধ্যবিত্ত পাঠক এই লেখকের কলম থেকে উগড়ে দেওয়া বিষে জর্জরিত হয়ে পড়ে।
কিন্তু মানিক তবুও ক্ষমা করেন না মধ্যবিত্তকে। বিন্দুমাত্র ছাড় দেন না তাঁর তুল্যমূল্য বিচারে। বারবার মনে করিয়ে দেন—এটাই তোমার আসল চেহারা, এটাই তোমার আসল অবস্থা এবং এটাই তোমার অবশ্যম্ভাবী পরিণতি। মধ্যবিত্ত মুখ ফেরাবে কোনদিকে? যেদিকেই পাশ ফিরুক, সেদিকেই মানিক পেতে রেখেছেন তাঁর অমোঘ দর্পণ। এমনকি চোখ বুঁজে ঘুমের ভান করলেও মুক্তি নেই। ঘুমের মধ্যেও দুঃস্বপ্নের মতো হানা দেয় তার অনির্বাণ নিয়তি।
আমাদের দেশে সাতচল্লিশ-উত্তর বাংলাসাহিত্যে নগরসাহিত্য গড়ে ওঠার অবকাশ ছিল না। কারণ ১৯৭১-এর স্বাধীনতার পূর্বে সত্যিকারের নগর এবং নাগরিক গড়ে উঠতেই পারেনি। তবু পূর্বসূরিরা চেষ্টা করেছেন কাল্পনিক নাগরিক মধ্যবিত্তকে নিয়ে সাহিত্য নির্মাণের। মঈনুল আহসান সাবেরের সময়টাও ছিল তাঁর অনুকূল। তিনি বিকৃত হলেও বিকশিত নাগরিক মধ্যবিত্তকে তন্ন তন্ন পাঠ করার সুযোগ পেয়েছেন।
মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় যদি কলকাতার মধ্যবিত্তের ব্যবচ্ছেদ-শিল্পী হয়ে থাকেন, তাহলে ঢাকার ক্ষেত্রে সেই নামটি মঈনুল আহসান সাবের।
