ই-শপিং :ঘরে বসে পণ্য কেনাবেচার নতুন দিগন্ত

আপডেট : ৩০ মে ২০১৫, ০০:৫৫

কেনাকাটা নিয়ে কমছে ভাবনা। নগদ টাকা বহনের ঝামেলা, বাজারে গিয়ে সময় নষ্ট—এসবই এখন সেকেলে। নগরজীবনের শত ব্যস্ততার মধ্যে ক্রেতারা এখন সময় বাঁচাতে ঝুঁকছে ইন্টারনেট ভিত্তিক কেনাকাটায়। ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়তে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো সুবিধা পাওয়ায় গড়ে উঠছে নতুন এক উদ্যোক্তা শ্রেণী। যারা ঘরে বসেই কেনাকাটার সুযোগ তৈরি করে দিচ্ছে। সার্চ ইঞ্জিনে গেলেই পাওয়া যাচ্ছে এদের খোঁজ। পত্র-পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিয়েও অনলাইনভিত্তিক কেনাকাটার প্রচার চালানো হচ্ছে।

 
বাংলাদেশে দেরিতে শুরু হলেও বিশ্বে এ ধরনের উদ্যোগ পুরনো। পর্যাপ্ত অবকাঠামো সুবিধা না থাকায় বাংলাদেশে এখাতের উদ্যোক্তা শ্রেণী গড়ে উঠতে দেরি হয়। তথাপি বেশকিছু কেনাকাটার সাইট হয়ে গেছে। এখন শুধু অর্ডার দিলেই হাতে পাওয়া যাবে পছন্দের সব পণ্য।
 
কী চান, এমন কোনো পণ্য নেই যা অনলাইনে কেনা যায় না। বই থেকে শুরু করে মুদি সামগ্রীও পাওয়া যাচ্ছে। হোম ডেলিভারি সুবিধা থাকায় এসব পণ্যের গুণাগুণ যাচাইয়ের সুযোগও থাকছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অবকাঠামোর পাশাপাশি সোশ্যাল মিডিয়াও এর জন্য অনেকখানি অবদান রেখেছে। শুধুমাত্র ডায়াল করলেই দ্রুততম সময়ের মধ্যে পণ্য পৌঁছে যাবে দোরগোড়ায়। দামও সুলভ।
 
ঘড়ি, জুতা, প্যান্ট, শার্ট, গাড়ি, বাড়ি, বই, খাতা, কলম, ফুল, গাছ, মুদি পণ্য– কী নেই। নিত্যপণ্য থেকে শুরু করে ওষুধ ও হেলথকেয়ার পণ্য সবই কেনা যাবে। কোরবানির পশু–সেও কেনা যাচ্ছে অনলাইনে, ঘরে বসেই। গত কোরবানির ঈদে ঢাকায় হাটে না গিয়ে গরু কিনেছেন অনেকেই। ইন্টারনেটভিত্তিক এই কেনাকাটার ব্যবসা যে এখন পৃথিবীব্যাপী কতটা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে, তার উত্কৃষ্ট উদাহরণ চীনের ই-শপিং ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ‘আলিবাবা’। যার প্রতিষ্ঠাতা জ্যক মা। ১৯৯৯ সালে প্রায় শূন্য থেকে যাত্রা করে মাত্র ১৬ বছরের ব্যবধানে ৩০ বিলিয়ন ডলারের বিশাল প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। সেইসাথে প্রতিষ্ঠানটির পণ্য প্রতিদিন পৌঁছে যাচ্ছে কোটি কোটি গ্রাহকের কাছে।
 
বাংলাদেশের ই-শপিং ব্যবসা
 
সংশ্লিষ্টদের মতে, সময়ের সঙ্গে দ্রুত বদলাচ্ছে মানুষের রুচিবোধ। জীবনযাত্রার ধরনও পাল্টাচ্ছে। বিশ্বায়নের যুগে সবকিছুই এখন হাতের মুঠোয়। নগর জীবনে প্রাত্যহিক কেনাকাটাতেও এসেছে পরিবর্তন। জনপ্রিয় হতে শুরু করেছে ইন্টারনেটে কেনাকাটা। যাকে বলা হচ্ছে ই-শপিং। ২০১০-১১ সালে বাংলাদেশে ই-কমার্সে মোট ব্যবসার পরিমাণ ছিল ৮০ কোটি টাকা। সংশ্লিষ্টরা জানান, বর্তমানে প্রতি বছর গড়ে দেড়শ’ থেকে দুইশ’ কোটি টাকার পণ্য অনলাইনে বেচাকেনা হয়। বার্ষিক প্রবৃদ্ধি ১৫ থেকে ২০ শতাংশ। এ খাতের উদ্যোক্তা হাসান জামান বলেন, শুধু কেনাকাটার বিষয় নয়–নতুন উদ্যোক্তা তৈরিতেও তা ভূমিকা রাখছে। সৃজনশীলচিন্তার বিকাশ ঘটিয়ে তরুণরা যোগ হচ্ছেন এই ব্যবসায়। তিনি বলেন, আশা করা যায় এদেশের তরুণ উদ্যোক্তারা মাত্র কয়েক বছরের মাধ্যেই এ খাতকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে।
 
ই-কমার্স থেকে ই-শপিং
 
ইলেকট্রনিক কমার্সকে সংক্ষেপে ই-কমার্স বলা হয়। এটি একটি আধুনিক ব্যবসা পদ্ধতি। ইন্টারনেটের মাধ্যমে এ ব্যবসা এবং লেনদেন পরিচালিত হয়ে থাকে। মূলত ইলেকট্রনিক কমার্স হচ্ছে ডিজিটাল ডাটা প্রসেসিং এবং ট্রান্সমিশনের মাধ্যমে কোন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের ব্যবসা সংক্রান্ত আদান প্রদান। সাধারণত এ কাজটি সম্পাদন করা হয় সবার জন্য উন্মুক্ত একটি নেটওয়ার্ক তথা ইন্টারনেটের মাধ্যমে। তাই বলা যায় ইন্টারনেটের মাধ্যমে কোন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের ব্যবসা সংক্রান্ত আদান প্রদান বা লেনদেন করার প্রক্রিয়াই হচ্ছে ই-কমার্স।
 
সত্তর দশকে ই-কমার্সের সূচনা হয়। কিন্তু বাংলাদেশে এটি শুরু হতে দীর্ঘ সময় লেগেছে। শুরুর দিকে ই-কমার্স বলতে বোঝানো হত ইলেকট্রনিক ডেটা ইন্টারচেঞ্জ (ইডিআই) এবং ইলেকট্রনিক ফান্ড ট্রান্সফার (ইএফটি) এর মতো প্রযুক্তি ব্যবহার করে আর্থিক লেনদেন। এর ফলে ব্যবসায় পারচেজ অর্ডার কিংবা ইনভয়েসের মতো বাণিজ্যিক ডকুমেন্টগুলো ইলেকট্রনিক উপায়ে পাঠানোর সুযোগ তৈরি হয়। 
 
ইন্টারনেট তথ্য মতে, মিশেল আলড্রিচ এর হাত ধরে ১৯৭৯ সালে যুক্তরাজ্যে অনলাইন শপিং এর পদ্ধতি আবিষ্কৃত হয়। ১৯৯০ সাল থেকে ই-কমার্সে যুক্ত হয় এন্টারপ্রাইজ রিসোর্স প্ল্যানিং সিস্টেম। ২০০০ সালের দিকে অসংখ্য ইউরোপীয় এবং আমেরিকান ব্যবসা প্রতিষ্ঠান তাদের সেবাগুলো ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ওয়েবে দিতে শুরু করে। বর্তমানে ই-কমার্স, ই-শপিং কিংবা অন্য অনেক নামেও এটি পরিচিতি লাভ করেছে।
 
প্রক্রিয়াটি যেভাবে সম্পন্ন হয়
 
বাংলাদেশে অনলাইন কেনাকাটার বহু ওয়েব সাইট রয়েছে। সার্চ ইঞ্জিনে গিয়ে যে কোন একটি বাছাই করতে হবে। কোন কোনটা রয়েছে বিশেষ পণ্যভিত্তিক। আবার কোন সাইটে সব পণ্যই পাওয়া যাবে। পণ্যের দামও দেয়া থাকবে। যদিও ক্ষেত্রভেদে দামের কিছুটা হেরফের হয়ে থাকে। নির্দিষ্ট পণ্য বাছাই করে ক্লিক করতে হবে অর্ডার দেয়ার জন্য। তারপর ক্রেতার কাছে স্বয়ংক্রিয়ভাবে অর্থ প্রদান করতে বলা হয়। ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে এই অর্থ প্রদান করতে হয়। তারপর ক্রয়াদেশের তথ্য ই-মেইলে ক্রেতা-বিক্রেতা ও ওয়্যারহাউজে পৌঁছে যায়। বিক্রেতা প্রতিষ্ঠান নিজস্ব অথবা তাদের নিবন্ধিত কোন পরিবহন সংস্থার মাধ্যমে ক্রেতাকে পণ্য পাঠিয়ে দেয়। আবার কোন কোন প্রতিষ্ঠান পণ্য সরবরাহ করে নগদ টাকা সংগ্রহ করে থাকে।
 
প্রযুক্তির উত্কর্ষে আধুনিক কেনাবেচা
 

প্রযুক্তির উন্নয়নের ফলে বেচাকেনায়ও এই আধুনিক পদ্ধতি প্রসার লাভ করতে শুরু করে। ধনী দেশ থেকে স্বল্পোন্নত দেশেও জনপ্রিয় হচ্ছে এই পদ্ধতি। এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, বিশ্বজুড়ে কম্পিউটার ব্যবহার করে ক্রয়াদেশ দেয়া ক্রেতা আর মোবাইলে ক্রয়াদেশ দেয়া ক্রেতার সংখ্যা প্রায় সমান। তার মানে, মোবাইল ফোনের ব্যাপক প্রসারের কারণেও মানুষ যখন যে অবস্থায় আছে- সেখান থেকে তার প্রয়োজনীয় পণ্যটি কিনে নিতে পারছে। এতে সময় সাশ্রয় হচ্ছে দুদিক থেকেই। কেনাকাটার জন্য আলাদা সময় নিয়ে বাজারে যেতে হচ্ছে না। অন্য কাজের সময়ও নষ্ট হচ্ছে না।