মেটার স্মার্ট চশমায় গোপনে নারীর ভিডিও ধারণ, বাড়ছে উদ্বেগ ও আতঙ্ক

আপডেট : ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২০:০৬

মেটার তৈরি ‘রে-ব্যান মেটা’ স্মার্ট চশমা ব্যবহার করে রাস্তায় অপরিচিত নারীদের অজান্তে গোপনে ভিডিও ধারণ এবং তা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। এতে জনসমক্ষে নারীদের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা, সম্মতি ও নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। ভারতে এমন একটি ঘটনার জেরে মেটার বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপও নেওয়া হয়েছে।

বৃহস্পতিবার (১৭ সেপ্টেম্বর) যুক্তরাজ্যভিত্তিক সাংবাদমাধ্যম ইনডিপেনডেন্ট জানায়, ভারতের কলকাতার ৩৫ বছর বয়সী অধ্যাপক ইয়ামিনি গত জুনের এক সন্ধ্যায় বাড়ি ফেরার পথে এক অপরিচিত ব্যক্তির মুখোমুখি হন। রাত সোয়া ৮টার দিকে কিছুটা নির্জন এলাকায় লোকটি তাকে থামিয়ে বলে, দূর থেকে তাকে দেখে ‘কিউট’ মনে হয়েছে। ইয়ামিনি দ্রুত পরিস্থিতি শেষ করতে ভদ্রভাবে জবাব দিয়ে চলে যান। তখন তিনি জানতেন না, লোকটি তার সঙ্গে হওয়া কথোপকথনটি মেটার স্মার্ট চশমা দিয়ে গোপনে ভিডিও করছিল।

পরদিন এক শিক্ষার্থীর কাছ থেকে তিনি জানতে পারেন, ওই ভিডিওটি ইনস্টাগ্রামে প্রকাশ করা হয়েছে। ভিডিওটির নির্মাতা নিজেকে ‘পিক-আপ আর্টিস্ট’ হিসেবে তুলে ধরে রাস্তায় নারীদের সঙ্গে কীভাবে কথা বলতে হয়, তার উদাহরণ হিসেবে ইয়ামিনির সঙ্গে কথোপকথনটি ব্যবহার করেছিলেন। ভিডিওটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং ২৩ লাখের বেশি মানুষ তা দেখেন।

ভিডিওটি দেখার পর ইয়ামিনি আরও উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন। কারণ এতে তিনি দেখতে পান, লোকটি তাকে কিছুক্ষণ অনুসরণ করার পর কথা বলতে এগিয়ে এসেছিল। ভিডিওটি দেখেই তিনি বুঝতে পারেন, ঘটনাটি শুধু একটি আকস্মিক কথোপকথন ছিল না।

এ ধরনের ঘটনা শুধু ভারতেই নয়, বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে ঘটেছে। চলতি বছর ২২ বছর বয়সী ব্রিটিশ শিক্ষার্থী ইসোবেল থম্পসনও অভিযোগ করেন, এক ব্যক্তি মেটার স্মার্ট চশমা দিয়ে তাকে ধারণ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিডিও প্রকাশের কথা জানিয়েছিলেন। এতে তিনি আতঙ্কিত বোধ করেন।

ইয়ামিনির পক্ষে ভারতের ইন্টারনেট ফ্রিডম ফাউন্ডেশন (আইএফএফ) মেটাকে আইনি নোটিশ পাঠিয়েছে। ভিডিওর সব কপি সরানো, সংশ্লিষ্ট অ্যাকাউন্ট ও ডিভাইসের তথ্য প্রকাশ, প্রমাণ সংরক্ষণ, ক্ষমা চাওয়া এবং প্রায় ২ কোটি ৫ লাখ রুপি ক্ষতিপূরণসহ বিভিন্ন দাবি জানানো হয়েছে।

মেটার দাবি-তাদের স্মার্ট চশমায় গোপনীয়তা রক্ষার ব্যবস্থা রয়েছে। চশমায় ভিডিও ধারণের সময় একটি এলইডি বাতি জ্বলে, যা বন্ধ করা যায় না। কেউ সেটি ঢেকে দিলে ক্যামেরা নিষ্ক্রিয় হয়ে যায় বলেও জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।

তবে ইয়ামিনি জানান, ওই ব্যক্তির চশমায় তিনি কোনো রেকর্ডিং লাইট দেখতে পাননি। সাধারণ একটি চশমার ভেতরে ক্যামেরা থাকতে পারে-এমন সম্ভাবনাও তাঁর মাথায় আসেনি।

গত জুলাইয়ে ইনস্টাগ্রামের প্রধান অ্যাডাম মোসেরি জানিয়েছিলেন, অপরিচিত মানুষকে হয়রানি করে এমন ভিডিও, বিশেষ করে ‘পিক-আপ লাইন’ ধরনের গোপনে ধারণ করা ভিডিও সরিয়ে ফেলার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। মেটার নীতিমালাতেও হয়রানি ও যৌন-ইঙ্গিতপূর্ণভাবে কাউকে উপস্থাপনের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে।

পুলিশে অভিযোগ জানানোর পর ইয়ামিনির ঘটনায় অন্যায় বাধা প্রদান ও স্টকিংসহ কয়েকটি ধারায় মামলা হয়েছে। তবে এই ঘটনায় সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব পড়েছে ইয়ামিনির মানুষের প্রতি বিশ্বাসে। রাস্তায় কেউ এগিয়ে এলেই এখন তিনি এখন সন্দেহ করেন, তাকে গোপনে ধারণ করা হচ্ছে কি না।

ইয়ামিনির মতে, মোবাইল ফোন দিয়ে কেউ প্রকাশ্যে ভিডিও করলে অন্তত তাকে আপত্তি জানানোর সুযোগ থাকে। কিন্তু স্মার্ট চশমার ক্ষেত্রে সেই সুযোগটিই থাকে না। ফলে নিজের ছবি ও ব্যক্তিগত মুহূর্তের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারানোর অনুভূতি তৈরি হয়।

মেটা জানিয়েছে, ইয়ামিনিকে নিয়ে তৈরি ভিডিওটি পরে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে এবং তারা স্মার্ট চশমার গোপনীয়তা সুরক্ষা আরও শক্তিশালী করার কাজ চালিয়ে যাবে।

 

ইত্তেফাক/এসএইচ