পানি বাড়ছে উত্তরের নদ-নদীতে

আপডেট : ১২ জুন ২০১৫, ২৩:৪৭

অবিরাম বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা ঢলে যমুনা, তিস্তা ও ব্রহ্মপুত্রে পানি বাড়তে শুরু করেছে। প্লাবিত হচ্ছে অনেক এলাকা। কোথাও কোথাও দেখা দিয়েছে ভয়াবহ ভাঙন। দুই-একটি স্থান থেকে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ ভেঙে যাওয়ার খবরও পাওয়া গেছে। বন্যা ও ভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বাড়ি-ঘর, চাষের জমি, রাস্তা-ঘাট, শিক্ষা-ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, সরকারি অফিস।

 
সারিয়াকান্দি (বগুড়া) সংবাদদাতা জানান, বগুড়ার সারিয়াকান্দিতে যমুনা নদীতে পানি বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। স্রোতে নির্মাণাধীন বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের ৫০ মিটার এলাকা ভেঙে গেছে । নৌবাহিনী এই বাঁধ তৈরির কাজ করছে। গতকাল শুক্রবার বিকাল সাড়ে চারটায় উপজেলার কামালপুর ইউনিয়নের হাওরাখালি দড়িপাড়া এলাকায় বাঁধটি ভেঙে যায়। কামালপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মোখলেছার রহমান জানান, বাঁধটি ভেঙে যাওয়ায়  হাওরাখালি ও দড়িপাড়া এলাকার দেড় শতাধিক বাড়ি-ঘরের ক্ষতি হয়েছে। পানি উন্নয়ন বোর্ড সারিয়াকান্দির উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী আব্দুল মোতালেব নির্মাণাধীন বাঁধ ভেঙে যাওয়ার কথা স্বীকার করে বলেন, ২০ কোটি  টাকা ব্যয়ে নৌবাহিনী বাঁধটি নির্মাণ করছে। ইতোমধ্যে বাঁধ নির্মাণের  ৭০ ভাগ কাজ সমাপ্ত হয়েছে।
 
ঝিনাইগাতীতে  ১০ হাজার মানুষ পানিবন্দী
 
ঝিনাইগাতী (শেরপুর) সংবাদদাতা জানান, গত তিন দিনের অবিরাম বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে শেরপুরের সীমান্তবর্তী ঝিনাইগাতী উপজেলায় বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। পানিবন্দী হয়ে পড়েছেন বিভিন্ন গ্রামের প্রায় ১০ হাজার মানুষ। পানির তোড়ে মহারশি নদীর রামেরকুড়া, দিঘীরপাড় ও বনগাঁওসহ বিভিন্নস্থানে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ ভেঙে আবাদি জমিতে বালুরস্তর পড়েছে। মহারশি, কালঘোষা, সোমেশ্বরী ও মালিঝি নদীর পানিতে বিভিন্ন স্থানে রাস্তা-ঘাট ভেঙে অভ্যন্তরীণ সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। পানিতে তলিয়ে গেছে অসংখ্য পুকুর, সাক-সবজির বাগান ও কৃষকের বীজতলা।
 
ব্রহ্মপুত্রের পানি বিপদসীমা ছুঁয়েছে
 
গাইবান্ধা প্রতিনিধি জানান, গত তিনদিনের ভারি বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা ঢলে গাইবান্ধায় ব্রহ্মপুত্র নদ গতকাল শুক্রবার বিকালে বিপদসীমা ছুঁয়েছে। এছাড়া যমুনা, তিস্তা, করতোয়া ও ঘাঘট নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় নদী তীরবর্তী নিম্নাঞ্চলগুলো প্লাবিত হয়েছে। সুন্দরগঞ্জ, ফুলছড়ি, সাঘাটা ও গাইবান্ধা সদর উপজেলার চরাঞ্চলের অনেক এলাকায় পানি ঢুকে পড়েছে। শুক্রবার বিকালে ফুলছড়ির তিস্তামুখ ঘাট পয়েন্টে ব্রহ্মপুত্রের পানি বিপদসীমা ছুঁয়েছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আব্দুল আউয়াল মিয়া জানান, ব্রহ্মপুত্র বিপদসীমা ১৯.৮২ সে.মি স্পর্শ করেছে। তবে অন্য নদীর পানি এখনও বিপদসীমার নিচে রয়েছে।
 
সাঘাটায় আগাম বন্যার আশঙ্কা
 
সাঘাটা (গাইবান্ধা) সংবাদদাতা জানান, উজান থেকে পাহাড়ি ঢল নেমে আসায় ও ভারি বর্ষণে গাইবান্ধার সাঘাটা উপজেলায় আগাম বন্যার আশংকা দেখা দিয়েছে। উপজেলার উপর দিয়ে প্রবাহিত যমুনা নদীর পানি অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পাওয়ায় চরাঞ্চলসহ বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের পূর্বাংশ প্লাবিত হয়েছে।
 
তিস্তা ফুলে ফেঁপে উঠেছে
 
নীলফামারী প্রতিনিধি জানান, দু’দিনের টানা বর্ষণ আর উজানের পানিতে ফুলে ফেঁপে উঠেছে তিস্তা। বিপদসীমা ছুঁই ছুঁই করছে। তিস্তা ব্যারাজের ৬৫ কিলোমিটার উজানে থাকা ভারতের গজলডোবা ব্যারাজের সব গেট খুলে দেয়া হয়েছে বলে স্থানীয় সূত্রগুলো দাবি করেছে। ফলে যে কোন সময় তিস্তার পানি বিপদসীমা অতিক্রম করতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন পাউবোর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
 
তিস্তায় ভাঙন
 
গঙ্গাচড়া (রংপুর) সংবাদদাতা জানান, গত দুই দিনের প্রবল বর্ষণে রংপুরের গঙ্গাচড়ায় তিস্তার পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় উপজেলার পাইকান ও চিলাখাল এলাকায় তিস্তার ভাঙনে ২০ পরিবারের বাড়িঘর জমি ও গাছপালা তিস্তায় বিলীন হয়েছে। হুমকিতে মুখে রয়েছে মূল বাঁধসহ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। ভাঙন কবলিত এলাকায় মানুষের মাঝে আতংক বিরাজ করছে।
 
সরেজমিন এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, কোলকোন্দ ইউনিয়নের চিলাখাল এলাকার নুরুল হোদা, বিধবা ছকিনা, ইয়াছিন, রবিউল, রশিদ, জহুদ্দি, হাফিজুল, নজরুল, পাইকান হাজীপাড়া, পীরপাড়ার মর্তুজা, কিবরিয়া, মুকুল, আরফিন, গোলাম রসুল, জাহাঙ্গীর, তোফাজ্জল, মন্তাজ, নজরুল আলম বাদশা, শাহজাদার বাড়ি-ঘর তিস্তায় ভেঙে গেছে। এছাড়া অনেকে বাড়ি ঘর সরিয়ে নিচ্ছে। ভাঙন হুমকির মুখে রয়েছে চিলাখাল ও জুম্মাপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, পাইকান ইউসুফিয়া মাদ্রাসা, সাউদপাড়া মাদ্রাসাসহ এতিমখানা, পোস্ট অফিস, মসজিদ, পীর সাহেবের মাজার শরীফ ও তিস্তা প্রতিরক্ষা মূল বাঁধ।
 
এলাকার সাবেক ইউপি সদস্য ও চিলাখাল প্রাথমিক বিদ্যালয় কমিটির সভাপতি নুরল হোদা জানান, চিলাখাল বেড়িবাঁধ ভেঙে যাওয়ায় মূল বাঁধ হুমকির মুখে পড়েছে। ভাঙন রোধে এখনই ব্যবস্থা না নিলে চিলাখাল সরকারি প্রাথমিক স্কুলটি ভেঙে যাবে। রংপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপসহকারী প্রকৌশলী শহিদুর রহমান বলেন, ভাঙন রোধে ইতিমধ্যে জিও ব্যাগে বালু ফেলার ব্যবস্থা করা হয়েছে।
 
ব্রহ্মপুত্রে ভাঙন
 
রাজীবপুর (কুড়িগ্রাম) সংবাদদাতা জানান, কুড়িগ্রামের রাজীবপুরে ব্রহ্মপুত্র নদে ভয়াবহ ভাঙন দেখা দিয়েছে। এরই মধ্যে নয়াচর বাজারের পশ্চিম দিকের সড়ক, নয়াচর ইসলামি ফাযিল মাদ্রারাসা, নয়াচর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ঐতিহ্যবাহী নয়াচর বাজারের পশ্চিম অংশ নদের গর্ভে হারিয়ে গেছে। ভাঙনের মুখে রয়েছে মোহনগঞ্জ ইউনিয়ন পরিষদ ভবন ও নয়াচর পুলিশ ফাঁড়ি (পুলিশ নেই)। ভাঙনের আশংকায় নয়াচর পুলিশ ফাঁড়ি ভবন ও গাছপালা নিলামে বিক্রি করে দেয়া হয়েছে। নিলামে বিক্রির প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে ইউনিয়ন পরিষদ ভবন। চরম আতংকে দিন কাটাচ্ছেন নয়াচর বাজারের প্রায় পাঁচ শতাধিক ব্যবসায়ী।
 
মোহনগঞ্জ ইউপি চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন আনু জানান, গত ২৫ বছরে ব্রহ্মপুত্রের ভাঙনে ইউনিয়নের ৮০ ভাগ এলাকা চলে গেছে। বাকী ছিল ইউনিয়ন পরিষদ ও নয়াচর বাজার। সেটাও এবার আর রক্ষা করা যাবে না ব্রহ্মপুত্রের কবল থেকে। বর্তমানে যে পরিস্থিতি দেখা দিয়েছে তাতে যে কোনো মুহূর্তে নদের গর্ভে হারিয়ে যাবে নয়াচর বাজার ও ইউনিয়ন পরিষদ ভবন। জরুরী ভিত্তিতে ভাঙন প্রতিরোধে ব্যবস্থা নেয়া হলে হয়তো মোহনগঞ্জ ইউনিয়নের অস্থিত্ব রক্ষা করা সম্ভব হবে।
 
নয়াচর বাজারের বাসিন্দা আজিজুল হক জানান, এর আগে আমরা এলাকাবাসী, উপজেলা চেয়ারম্যান ও এমপির সহযোগিতায় বাঁশের পাইলিং করেছিলাম। কিন্তু কয়েক দিনের কালবৈশাখী ঝড়ের সঙ্গে নদের ভাঙন ভয়াবহ রূপ নেয়। ভাঙনে ২০টি বাঁশের পাইলিং নদে হারিয়ে গেছে।
 
ব্রহ্মপুত্রের ওই ভাঙনের খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে ছুটে যান স্থানীয় সংসদ সদস্য রুহুল আমিন, রাজীবপুর উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান শফিউল আলম ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আব্দুল লতিফ খান। ভাঙনের মুখ থেকেই মোবাইল ফোনে ভাঙনের চিত্র অবহিত করেন কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ড নির্বাহী প্রকৌশলী ও কুড়িগ্রাম জেলা প্রশাসককে। এসময় সংসদ সদস্য রুহুল আমিন জানান, ভাঙন প্রতিরোধে জরুরিভাবে ব্যবস্থার নেয়ার কথা বলা হয়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ডকে। উপজেলা চেয়ারম্যান শফিউল আলম জানান, অস্থায়ী ভিত্তিতে হলেও দ্রুত ভাঙন ঠেকানোর ব্যবস্থা নিতে হবে।
 
জামালপুরে পানি বাড়ছে, ভয়াবহ  ভাঙন
 
জামালপুর প্রতিনিধি জানান, টানা বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে জামালপুরে যমুনার পানি বৃদ্ধি পেয়ে বাহাদুরাবাদ ঘাট পয়েন্টে ১৯ দশমিক ৩৫ সেন্টিমিটার অর্থাত্ বিপদসীমার ১৫ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে বলে জানিয়েছেন পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো’র) নির্বাহী প্রকৌশলী নবকুমার। পানি বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে দেখা দিয়েছে ভয়াবহ ভাঙন। ইসলামপুর কুলকান্দি শক্ত অবকাঠামো বাঁধ থেকে শুরু করে গুঠাইল বাজার শক্ত অবকাঠামো বাঁধ পর্যন্ত যমুনার বাম তীরে ভাঙন ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। গত দু’দিনে ইসলামপুর উপজেলার বেলগাছার ঘোনাপাড়া, গোয়ালের ডোবা, মাঝপাড়া, মধ্য বেলগাছা থেকে শুরু করে গুঠাইল বাজার পর্যন্ত বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে ভয়াবহ ভাঙন শুরু হয়েছে। দু’দিনে প্রায় ৩০টি পরিবারের বসতবাড়ি গাছ-পালা নদী গর্ভে বিলীন হয়েছে।
 

স্থানীয় এমপি আলহাজ্ব ফরিদুল হক খান দুলাল গুঠাইল বাজার ও হার্ডপয়েন্ট রক্ষায় অবিলম্বে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।