পুরো পৃথিবীর মানুষ দুটি বিষয়ে বেশ চিন্তিত। একটি হল জলবায়ু পরিবর্তন, অপরটি মানুষের খাদ্য নিরাপত্তার বিষয়। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব পড়েছে খাদ্যশস্য উত্পাদনে। ক্রমবর্ধমান জনগোষ্ঠির খাদ্য চাহিদা পূরণ করতে গিয়ে অনেক ক্ষেত্রে অনেক ছাড় দেয়া হচ্ছে। গুণগত মান যাচাই না করে অনেক কৃষি পণ্য উত্পাদন করা হচ্ছে। যাচাই বাছাই না করে, মাত্রা নিয়ন্ত্রণ না করেই ব্যবহূত হচ্ছে কীটনাশক। ফলে খাদ্যে বিষক্রিয়া থেকে যাচ্ছে। যার প্রভাব পড়ছে ভবিষ্যত প্রজন্মের ওপর।
তবে আশার কথা বাংলাদেশে এসব কীটনাশকসহ সব ক্ষতিকর রাসায়নিক বিষের ব্যবহার কমেছে। কৃষকের মুখেই উচ্চারিত হচ্ছে জৈব ব্যবস্থাপনায় পরিবেশ বান্ধব ফসল উত্পাদনে ‘অর্গানিক ফার্মিং’ এর বিষয়টি। কৃষি মন্ত্রনালয়ের একাধিক বিভাগও কীটনাশকের ব্যবহার কমানোর জন্য কাজ করে যাচ্ছে। কৃষকের সচেতনতা এবং সরকারের উদ্যোগের ফলে দেশে কীটনাশকের ব্যবহার ছয় বছরে কমেছে ২২ ভাগের বেশি।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, এক সময় কীটনাশক ব্যবহূত হতো অপরিকল্পিতভাবে এবং প্রয়োজনের তুলনায় বেশি। আবার কৃষক অজ্ঞতাবশত কীটনাশকের প্রয়োজন না হলেও বীজ বপনের সঙ্গে সঙ্গে জমিতে কীটনাশকের বোতল বা প্যাকেট নিয়ে হাজির হতো, উদ্দেশ্য জমিতে আগাম রোগ প্রতিরোধ করা। কিন্তু সময় পাল্টেছে। সচেতন হচ্ছে কৃষকরা।
কৃষি বিষয়ে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কীটনাশক মিশ্রিত খাবার খেয়ে মানুষের হচ্ছে নানা রোগবালাই। একই সঙ্গে পশুপাখি ও মত্স্যসম্পদ নির্মল পরিবেশের স্থলে বিষাচ্ছাদিত পরিবেশে অবস্থানের কারণে প্রজননক্ষমতা হারিয়ে ফেলছে। পাখি কীটপতঙ্গ খেয়ে কৃষকের উপকার করে। পাখির সংখ্যা হ্রাস পেলে কিংবা বিলুপ্ত হয়ে গেলে কীটপতঙ্গ ও নিত্যনতুন রোগবালাইয়ে ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হবে। হ্রাস পাবে উত্পাদন। তাই কীটনাশকের ব্যবহার কমানো জরুরি।
তথ্য অনুযায়ী দেশে কীটনাশক আমদানি হয় মূলত চীন, ভারত, সিঙ্গাপুর ও জার্মানি থেকে। এসব কীটনাশকের মধ্যে আছে ইনসেকটিসাইড, ফাঙ্গিসাইড, হার্বিসাইড, মিটিসাইড ও রোডেনটিসাইড। ২০০৮ সালে দেশে কীটনাশক আমদানি হয় ৪৮ হাজার ৬৯০ টন। কিন্তু বর্তমানে কমে দাড়িয়েছে ৩৭ হাজার ৭৮১ টন। অর্থাত্ ছয় বছরে দেশে কীটনাশক আমদানি কমেছে ২২ দশমিক ৪ শতাংশ।
কৃষি বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, কীটনাশক ব্যবহার কমিয়ে আনতে বিভিন্ন সময় সরকার সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা (আইপিএম) নামে প্রকল্প গ্রহণ করে। সর্বপ্রথম এ প্রকল্প হাতে নেয়া হয় ১৯৮১ সালে। ২০১৩ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন সময় এ ধরনের কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হয়। এসব কার্যক্রমের মাধ্যমেই মূলত প্রাকৃতিকভাবে পোকা দমনে কৃষকদের প্রশিক্ষণ দেয়া হয়, কীটনাশক ব্যবহার কমাতে যা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০০৮ সালের পর থেকে কমতে থাকে কীটনাশক আমদানি। ২০০৯ সালে দেশে কীটনাশক আমদানি হয় ৪৫ হাজার ১৭২ টন। ২০১০ সালে তা কমে দাঁড়ায় ৪২ হাজার ২৪০ টনে। বর্তমানে তা আবার কমে দাঁড়ায় ৪১ হাজার টনে।
২০০৮ সালে ইনসেকটিসাইডের ব্যবহার ২৫ হাজার ২৩০ টন হলেও ২০১৩ সালে নেমে আসে ১৩ হাজার টনে। বর্তমানেও প্রায় একই পরিমান ব্যবহার হচ্ছে। এছাড়া হার্বিসাইডের ব্যবহার ৪ হাজার ২৫ টন থেকে কমে দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৯৫০ টনে।
বাংলাদেশ ধান গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (ব্রি) এক দশক ধরে চলা গবেষণায় দেখা গেছে, শস্যক্ষেতে এ পর্যন্ত ৬০৭ জাতের পোকা পাওয়া গেছে। এর মধ্যে মাত্র ২৩২টি বা ৩৮ শতাংশ ফসলের জন্য ক্ষতিকর। বাকি সব পতঙ্গই সরাসরি বা পরোক্ষভাবে ফসলের উপকার করছে। এর মধ্যে সরাসরি উপকার করছে ১৮৩টি জাত।
ভেজাল কীটনাশক: ফসলের পোকা ও রোগ দমনে বাজারে যেসব কীটনাশক পাওয়া যায় তার ৩০ ভাগই ভেজাল। ভেজাল কীটনাশক কৃষকের কোন উপকারে আসে না। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল (বিএআরসি) এর এক গবেষণায় দেখা গেছে, বাজারের ৩০ শতাংশ কীটনাশকে কার্যকরী উপাদান নেই। এছাড়া এমনও কীটনাশক পাওয়া গেছে যার মধ্যে কার্যকরী উপাদানের কোন বালাই নেই।
বিএআরসির এক কর্মকর্তা জানান, বাজারে প্রাপ্ত কীটনাশকের নমুনা পরীক্ষায় ৩০ শতাংশের মধ্যেই কার্যকরী উপাদান পাওয়া গেছে নির্ধারিত মাত্রার চেয়ে কম। ক্ষেত্র বিশেষ এই হার নির্ধারিত মাত্রার চেয়ে ৫০ শতাংশেরও কম। গবেষণার ফলে স্পষ্ট যে, কীটনাশক ব্যবহারকারী বিপুল সংখ্যক কৃষক নিত্যই প্রতারিত হচ্ছেন।
তথ্য অনুযায়ী, উত্পাদন পর্যায়ে ফলের ক্ষেত্রে অনুমোদিত মাত্রার ১০ থেকে ১৫ গুণ এবং সবজির ক্ষেত্রে অনুমোদিত মাত্রার ১০ গুণ বেশি মাত্রায় কীটনাশক ব্যবহার করেন কৃষকরা। আমে সাধারণত ১৪টি গ্রুপের বালাইনাশক ব্যবহার হয়। এছাড়া সবজির ক্ষেত্রেও বিভিন্ন গ্রুপের কীটনাশক ব্যবহার হয়।
কীটনাশক বিক্রি থেকে বেশি আয়ের জন্য তরল কীটনাশকের সাথে পানি বা অন্য কোন সহজলভ্য তরল মিশিয়ে পরিমাণ বৃদ্ধি করা হয়। এ কারণে কার্যকরী মাত্রা কমে যায়। কৃষকরা নির্দিষ্ট পরিমাণ কীটনাশক ব্যবহার করে ফল না পেয়ে একই ফসলে আবারো কীটনাশক ব্যবহার করেন। এভাবে ১০ থেকে ১৫ গুণ বেশি কীটনাশক ব্যবহার করতে হয়। এ কারণে আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হন কৃষক।
লাইসেন্স পাওয়া সহজ: দেশে কীটনাশক আমদানির অনুমোদন দিয়ে থাকে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কোয়ারেন্টাইন বিভাগ। কীটনাশকে সঠিকমাত্রায় কার্যকরী উপাদান আছে কীনা তা পরীক্ষা করার দায়িত্ব এ বিভাগের। এ কারণে এ বিভাগের অধীনে ল্যাবরেটরিও রয়েছে। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে মাঠ থেকে এ বিভাগ খুব কমই কীটনাশকের নমুনা এনে তার মাত্রা পরীক্ষা করে। তারা কোম্পানি কর্তৃক সরবরাহ করা কীটনাশকের নমুনা পরীক্ষা করে। ফলে কীটনাশকে ভেজাল প্রমাণিত হয় না।
তবে এ বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, প্রতিটি উপজেলাতে আমাদের কর্মকর্তা আছেন। ব্যবসায়ীরা নীতিমালা মেনে বিক্রি করছে কিনা, তা তারা পর্যবেক্ষণ করেন। পরীক্ষার পরে যদি ভেজালের প্রমাণ পাওয়া যায় তাহলে তার রেজিস্ট্রেশন বাতিল করে দেয়া হয়। কিন্তু বিভাগীয় কর্মকর্তাদের এই বক্তব্যের সঙ্গে বাস্তবের মিল পাওয়া যায় না। বাজারে ভেজাল কীটনাশকের ছড়াছড়ি লক্ষ্য করা যায়।
‘ফেরোমন ট্র্যাপ’ : কীটনাশক মুক্ত সবজি উত্পাদনে জনপ্রিয় হচ্ছে পোকা দমন পদ্ধতি ‘ফেরোমন ট্র্যাপ’। পরিবেশ বান্ধব হওয়ায় কৃষকরাও এতে আগ্রহী হয়ে উঠেছে। এর মাধ্যমে স্ত্রী পোকার সেক্স হরমোন বা লিউ একটি সাবান মিশ্রিত পানির কৌটায় বিশেষভাবে ঝুলিয়ে রাখা হয়। ফলে ক্ষতিকর পুরুষ পোকা সেই হরমোনে আকৃষ্ট হয়ে ক্ষার মিশ্রিত পানির সংস্পর্শে এসে মারা যায়। ফলে স্ত্রী পোকার বংশ বিস্তার কমে যায় ব্যাপক হারে। এ পদ্ধতিতে বেগুন, কাকরোল, শষা, লেবু, কুমড়া ও লাউ জাতীয় সবজি চাষে সাফল্য পাওয়া যাচ্ছে। শুধু তাই নয়, বিষমুক্ত হওয়ায় এসব সবজির কদরও বেড়েছে।
কয়েক বছর আগেও ফসল সুরক্ষায় কীটনাশকের অবাধ ব্যবহারেই আস্থা ছিল কৃষকের। পরিবেশের ওপর এর বিরূপ প্রভাব ও বাড়তি খরচের বিষয়টি ছিল উপেক্ষিত। তবে সে প্রবণতায় এখন ছেদ পড়েছে। কৃষকের মধ্যে সচেতনতাও আগের চেয়ে বেড়েছে। ফল হিসেবে কমছে কীটনাশক ব্যবহার।
