সাংবাদিক হাবিবুর রহমান মিলনের জীবনাবসান

আপডেট : ১৫ জুন ২০১৫, ০১:৩১

চলে গেলেন প্রগতিশীল সাংবাদিকতার অনন্য ব্যক্তিত্ব হাবিবুর রহমান মিলন। শনিবার রাত তিনটায় রাজধানীর ল্যাবএইড হাসপাতালে তিনি ইন্তেকাল করেন (ইন্নালিল্লাহি ... রাজিউন)। তিনি দীর্ঘদিন যাবত্ কিডনি ও ফুসফুসে জটিলতাসহ নানা রোগে ভুগছিলেন। তাঁর বয়স হয়েছিল ৮০ বছর। গতকাল দুপুর একটার দিকে হাবিবুর রহমান মিলনের লাশ জাতীয় প্রেস ক্লাবে আনা হলে সেখানে এক শোকাবহ পরিবেশের সৃষ্টি হয়। একই অবস্থার সৃষ্টি হয় দৈনিক ইত্তেফাকে তাঁর মরদেহ পৌঁছালে। তার বন্ধু, শুভার্থী ও সহকর্মীরা শোকে আকুল হয়ে শেষবারের মত শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করেন প্রবাদতুল্য এই সাংবাদিককে। হাবিবুর রহমান মিলনের মৃত্যুতে রাষ্ট্রপতি মো: আবদুল হামিদ, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু, রেলমন্ত্রী মোঃ মুজিবুল হক, জাতীয় সংসদের স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী,  ডেপুটি স্পিকার মো. ফজলে রাব্বী মিয়া, জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ আ স ম ফিরোজ গভীর শোক ও দু:খ প্রকাশ করে শোক-সন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের প্রতি সমবেদনা প্রকাশ করেছেন।

 
জাতীয় পার্টির (জেপি) চেয়ারম্যান এবং পরিবেশ ও বন মন্ত্রী আনোয়ার হোসেন মঞ্জু এবং মহাসচিব ও সাবেক শিক্ষা মন্ত্রী শেখ শহীদুল ইসলাম প্রবীণ সাংবাদিক ও দৈনিক ইত্তেফাকের উপদেষ্টা সম্পাদক হাবিবুর রহমান মিলনের মৃত্যুতে গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন। এক বিবৃতিতে জেপি নেতৃদ্বয় মরহুমের রুহের মাগফিরাত কামনা করেন এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারবর্গের প্রতি আন্তরিক সমবেদনা জ্ঞাপন করেন।
 
এদিকে গতকাল জাতীয় প্রেসক্লাবে অনুষ্ঠিত মরহুমের জানাজার নামাজ শেষে জাতীয় পার্টির (জেপি) পক্ষ হতে দলের অতিরিক্ত মহাসচিব সাদেক সিদ্দিকী মরহুমের কফিনে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ ও শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।
 
দৈনিক ইত্তেফাকের উপদেষ্টা সম্পাদক, প্রেস ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশ (পিআইবি)-এর চেয়ারম্যান ও একুশে পদকপ্রাপ্ত সাংবাদিক হাবিবুর রহমান মিলনের অস্তিত্বে মিশে ছিল সাংবাদিকতা। তিনি ছিলেন ন্যায়, নীতি ও আদর্শের এক প্রতিষ্ঠানতুল্য ব্যক্তিত্ব। জাতীয় প্রেস ক্লাব ছিল তার সেকেন্ড হোম। সবসময় প্রেসক্লাবে ছুটে আসতেন। মানুষ হিসাবে ছিলেন অজাতশত্রু। মানুষের সঙ্গে মিশবার ক্ষেত্রে ছোট-বড় ভেদাভেদ করতেন না।
 
হাবিবুর রহমান মিলন অসুস্থতার কারণে গত ২ জুন হাসপাতালে ভর্তি হন। তিনি হূদরোগ, কিডনি জটিলতাসহ বার্ধক্যজনিত বিভিন্ন সমস্যায় ভুগছিলেন। হাবিবুর রহমানের মৃত্যুর পর মরদেহ হাসপাতাল থেকে তার ইস্কাটনের বাসায় আনা হয়। সাংবাদিকদের শ্রদ্ধা জানানোর জন্য রবিবার দুপুরে তার কফিন জাতীয় প্রেস ক্লাবে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখান থেকে লাশ নেয়া হয় পিআইবিতে। এরপর লাশ নেয়া হয় তার কর্মস্থল দৈনিক ইত্তেফাক কার্যালয়ে। পরে মরহুমের লাশ বারডেম হাসপাতালের মরচুয়ারিতে রাখা হয়েছে। হাবিবুর রহমান মিলনের এক ছেলে পাঁচ মেয়ের মধ্যে এক মেয়ে থাকেন অস্ট্রেলিয়ায়। তিনি দেশে পৌঁছালে আজ সোমবার মিরপুর শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে এই সাংবাদিককে দাফন করা হবে বলে পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
 
প্রেস ক্লাব ও ইত্তেফাক এ শোকের ছায়া
 
গতকাল রবিবার মরহুমের প্রথম নামাজে জানাজা বাদ জোহর জাতীয় প্রেস ক্লাব চত্বরে অনুষ্ঠিত হয়। দ্বিতীয় নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত হয় কাওরান বাজারে তাঁর দীর্ঘ ৫০ বছরের কর্মস্থল দৈনিক ইত্তেফাকের সামনে।
 
জাতীয় প্রেস ক্লাবে আয়োজিত নামাজে জানাজায় শরীক হন তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু এমপি, খাদ্যমন্ত্রী কামরুল ইসলাম, আওয়ামী লীগের প্রচার ও প্রচারণা সম্পাদক সাবেক মন্ত্রী হাছান মাহমুদ, তথ্য সচিব মরতুজা আহমেদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক, বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান সম্পাদক আবুল কালাম আজাদ, সমকাল সম্পাদক গোলাম সারওয়ার, সিপিবি-এর সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম, বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন একাংশের (বিএফইউজে) সভাপতি মনজুরুল আহসান বুলবুল ও মহাসচিব আব্দুল জলিল ভূঁইয়া, জাতীয় প্রেস ক্লাবের সাবেক সভাপতি রিয়াজউদ্দিন আহমেদ, দৈনিক সংবাদের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক খন্দকার মুনীরুজ্জামান, জাতীয় প্রেস ক্লাবের সাবেক সাধারণ সম্পাদক স্বপন কুমার সাহা, ভোরের কাগজের সম্পাদক শ্যামল দত্ত, বিএফইউজে অপরাংশের সভাপতি শওকত মাহমুদ, জাতীয় প্রেস ক্লাবের সভাপতি মুহম্মদ শফিকুর রহমান, সাধারণ সম্পাদক কামরুল ইসলাম চৌধুরী, পিআইবি’র সাবেক মহাপরিচালক অধ্যাপক আবদুস সালাম, ডেফোডিল ইউনিভার্সিটির প্রো-উপাচার্য অধ্যাপক ড. গোলাম রহমান, প্রেস কাউন্সিলের চেয়ারম্যান বিচারপতি মমতাজ উদ্দিন আহমেদ, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি আলতাফ মাহমুদ ও সাধারণ সম্পাদক কুদ্দুস আফ্রাদ প্রমুখ।
 
জানাজার আগে মরহুমের স্মৃতিচারণ করে বক্তৃতা করেন জাতীয় প্রেসক্লাবের সভাপতি মুহম্মদ শফিকুর রহমান, সাধারণ সম্পাদক কামরুল ইসলাম চৌধুরী, বিএফইউজের সভাপতি মনজুরুল আহসান বুলবুল। মরহুমের পুত্র তাহমিনুর রহমান সুমন সংক্ষিপ্ত বক্তব্য রাখেন।
 
নামাজে জানাজার পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী (মিডিয়া) মাহবুবুল হক শাকিল ও প্রধানমন্ত্রীর উপ-প্রেস সচিব আশরাফুল আলম খোকন মরহুমের কফিনে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান। পরে জাতীয় প্রেসক্লাব, বিএফইউজে, ডিইউজেসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও সংগঠনের পক্ষ থেকে ফুল দিয়ে তার স্মৃতির প্রতি শেষ শ্রদ্ধা জানানো হয়।
 
প্রেসক্লাবে জানাজায় শরীক হন বাংলাদেশ ফেডারেল ইউনিয়ন অব নিউজপেপার প্রেস ওয়ার্কার্স-এর সভাপতি মো. আলমগীর হোসেন খান, মহাসচিব মো. কামাল উদ্দিন, সহ-সভাপতি মো. গোলাম সরওয়ার আজাদ, কোষাধ্যক্ষ মো. তাজাম্মেল হক, দৈনিক ইত্তেফাক (এনএনপিপি) ওয়ার্কার্স ইউনিয়নের সাবেক সহকারী সম্পাদক মো. আমজাদ হোসেন, বাংলাদেশ সংবাদপত্র কর্মচারী ফেডারেশনের সভাপতি মো. মতিউর রহমান তালুকদার, মহাসচিব মো. খায়রুল ইসলাম।
 
কাওরান বাজারে দৈনিক ইত্তেফাকের সামনে দ্বিতীয় নামাজে জানাজায় অংশ নেন পরিবেশ ও বন মন্ত্রী আনোয়ার হোসেন মঞ্জু। জানাজা শেষে মরহুমকে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান ইত্তেফাকের সিটি এডিটর আবুল খায়ের, ইউনিট চিফ খোন্দকার গোলাম জিলানী, ডেপুটি ইউনিট চিফ মো. আল-মামুনসহ সাংবাদিকবৃন্দ। এছাড়াও ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান দৈনিক ইত্তেফাক (এনএনপিপি) ওয়ার্কার্স ইউনিয়নের সভাপতি মো. আলমগীর হোসেন খান, সাধারণ সম্পাদক মো. তাজাম্মেল হক ও প্রেসের সদস্যবৃন্দ, দৈনিক ইত্তেফাক কর্মচারী ইউনিয়নের সভাপতি কাজী বজলুর রহমান, সাধারণ সম্পাদক শ্রী দিপক চন্দ্র রায়, সহকারী সম্পাদক মো. আবু জাফর ও সাধারণ কর্মচারীবৃন্দ।
 
এছাড়াও তার মৃত্যুতে শোক জানিয়েছে স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম, সিপিবি, ছাত্রলীগ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া প্রেসক্লাব, বৃহত্তর কুমিল্লার ইতিহাস, ঐতিহ্য সংরক্ষণ ফাউন্ডেশন, দৈনিক ইত্তেফাক সংবাদদাতা সমিতি, সংবাদপত্র কর্মচারী ফেডারেশন, দাউদকান্দি প্রেসক্লাব প্রভৃতি সংগঠন।
 
জীবনবৃত্তান্ত
 

হাবিবুর রহমান মিলনের জন্ম ১৯৩৫ সালের ২৩ জানুয়ারি ব্রা?হ্মণবাড়িয়া জেলার সরাইল থানার উচালিয়াপাড়া গ্রামে। কিশোরগঞ্জ জেলার তাতারকান্দি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে মেট্রিক পাস, তত্কালীন জগন্নাথ কলেজে বিএ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে এমএ পাস করেন। ১৯৬৩ সালে দৈনিক সংবাদে সহ-সম্পাদক হিসাবে সাংবাদিকতা শুরু। দৈনিক পয়গাম ও দৈনিক আজাদের সহ-সম্পাদক, দৈনিক বাঙলার (তত্কালীন দৈনিক পাকিস্তান) স্টাফ রিপোর্টার হিসেবে কর্মরত থাকার পর ১৯৬৫ সালে সিনিয়র সহ-সম্পাদক হিসাবে দৈনিক ইত্তেফাকে যোগদান করেন। পর্যায়ক্রমে একই পত্রিকার ফিচার সম্পাদক, মফস্বল সম্পাদক এবং সিনিয়র সহকারী সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। দীর্ঘ তিন দশক তিনি দৈনিক ইত্তেফাকে ‘সন্ধানী’ ছদ্মনামে ‘ঘরে-বাইরে’ শিরোনামে উপ-সম্পাদকীয় লিখেছেন। কর্মজীবনে সাংবাদিকতার পাশাপাশি তিনি ছিলেন সাবেক পূর্ব পাকিস্তান সাংবাদিক ইউনিয়নের যুগ্ম-সম্পাদক ও সহ-সভাপতি, ঐক্যবদ্ধ বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি, মিডিয়া ওয়াচের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ যৌতুক প্রতিরোধ সমিতির প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক, বঙ্গবন্ধু পরিষদের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা, বৈশাখী ও অন্যান্য নাট্যগোষ্ঠীর প্রতিষ্ঠাতা, থিয়েটার আর্টস ও গ্রন্থিক নাট্যগোষ্ঠীর উপদেষ্টা এবং বাংলাদেশ সাংবাদিক অধিকার ফোরামের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি। ২০১২ সালে সাংবাদিকতায় বিশেষ অবদানের জন্য একুশে পদক ছাড়াও জাতির জনক পদক, শহীদ সোহরাওয়ার্দী পদক, বিএফইউজে পদক, ব্যারিস্টার এ রসুল স্বর্ণপদক ও সম্মাননা প্রভৃতি সম্মানে ভূষিত হন। প্রকাশিত গ্রন্থ:কলাম-সংগ্রহ ‘ঘরে-বাইরে’ এবং ‘দারিদ্র্য ও মানবতা’।