রাজধানীর ধানমন্ডিতে ইমিগ্রেশন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তরের (ডিআইপি) সাবেক এডিজি রফিকুল ইসলাম ভূঞার রেখে যাওয়া শত কোটি টাকার সম্পত্তি দখল করতে তার একমাত্র ছেলে অর্নবকে হত্যা করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। নিহতের মা হালিমা খাতুন এই অভিযোগের তীর ছুড়ে দিয়েছেন অর্নবের চাচা ওসমান গনি ভূঞা, তার স্ত্রী মাসুদা বেগম মায়াসহ ১২ জনের দিকে। এই ঘটনায় গতকাল শনিবার ধানমন্ডি থানা পুলিশ আদালতের নির্দেশে একটি হত্যা মামলা লিপিবদ্ধ করেছে।
পারিবারিক সূত্র জানায়, ওসমান গনি ভূঞা এক সময় পুলিশের সাব-ইন্সপেক্টর (এসআই) ছিলেন। ১৯৯৯ সালে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী রুবেল হত্যা ঘটনায় এসআই ওসমান গনিকে চাকরিচ্যুত করা হয়। ২০১৭ সালে অর্নবের বাবা রফিকুল ইসলামের মৃত্যুর পর সেই ওসমান গনি ছিলেন শত কোটি টাকার সম্পত্তি দেখাশোনার দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি।
পারিবারিক সূত্র জানায়, গত ২ মে সকালে ধানমন্ডির ১১ নম্বর সড়কের ৩১ নম্বর বাড়ির ১৩ তলার ছাদ থেকে পড়ে নিহত হন আল মোকাববর অর্নব ইসলাম (৩২)। এ ঘটনায় নিহতের ছোট বোন সাউদা ইসলাম পূর্ণা বাদী হয়ে ধানমন্ডি থানায় একটি অপমৃত্যুর মামলা করেন।
পরিবারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, অর্নবের বাবা রফিকুল ইসলাম ভূঞা ইমিগ্রেশন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (এডিজি) ছিলেন। অর্নবের মা হালিমা খাতুন সোনালী ব্যাংকের পদস্থ কর্মকর্তা। কিন্তু দাম্পত্য কলহের জের ধরে ২০ বছর আগে তাদের মধ্যে ছাড়াছাড়ি হয়। হালিমা ধানমন্ডিতে পৃথক ফ্ল্যাট নিয়ে বসবাস করেন। বাবার কাছে থেকে যায় তিন সন্তান। অর্নব মোহাম্মদপুরের ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল গ্রীন হেরাল্ড থেকে ও লেভেল ও এ লেভেল সম্পন্ন করেন। অর্নবের বড় বোন লন্ডন প্রবাসী। ছোট বোন সাউদা ইসলাম পূর্ণা শান্তা মরিয়ম ইউনিভার্সিটিতে অধ্যয়নরত। অর্নব প্রায় ৮-৯ বছর পূর্বে পড়াশোনা ছেড়ে তার বাবার সম্পত্তি ও প্রতিষ্ঠান দেখাশোনা করতেন।
পারিবারিক সূত্র আরো জানায়, চাকরি জীবনে তিনি ঢাকা ও গ্রামের বাড়ি কিশোরগঞ্জের তাড়াইলে বিপুল পরিমাণ সম্পত্তি কিনেছেন। ২০১৬ সালে রফিকুল ইসলামের বিরুদ্ধে ১ কোটি ৬৮ লাখ টাকার দুর্নীতির অভিযোগ নিয়ে তদন্তে নামে দুদক।
চাকরিরত অবস্থায় ২০১৭ সালে পাসপোর্ট অধিদপ্তরের এডিজি রফিকুল ইসলাম মারা যান। তার মৃত্যুর পর এই সম্পদের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে পারিবারিক বিরোধ প্রকট হয়ে ওঠে। রফিকুল ইসলামের মৃত্যুর আগে তার এই সম্পদ দেখাশোনা করতেন তারই ছোট ভাই ওসমান গনি ভূঞা। এরই জেরে পরিকল্পিতভাবে অর্নবকে হত্যা করা হয়েছে বলে ওসমান গনির বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানায়, অর্নবের মোবাইল ফোনের কল রেকর্ড ও ডিজিটাল তথ্য বিশ্লেষণ করছে পুলিশের ফরেনসিক বিভাগ। তদন্তে দেখা গেছে, মৃত্যুর আগে অর্নবের মোবাইলে আসা সর্বশেষ কলটি কিশোরগঞ্জের এক প্রভাবশালী জমি ব্যবসায়ীর। ঐ ব্যবসায়ীর সঙ্গে রফিকুল ইসলামের পরিবারের কিছু বিতর্কিত জমি বিক্রির বিষয়ে আলোচনা চলছিল বলে পরিবার দাবি করেছে।
সূত্রগুলো আরো জানায়, অর্নব জমি বিক্রিতে আপত্তি জানিয়েছিলেন। মৃত্যুর আগে অর্নব সেগুনবাগিচায় তার বাবার নামে কেনা ১৬০০ বর্গফুটের একটি ফ্ল্যাট বিক্রি করেন ২ কোটি টাকায়। এই ফ্ল্যাট বিক্রি নিয়ে চাচা ওসমান গনির সঙ্গে দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়েন।
এ ব্যাপারে অর্নবের মা হালিমা খাতুন বলেন, ফ্ল্যাট বিক্রি করার সিদ্ধান্ত অর্নবের। বিক্রি করে যে টাকাটা পেয়েছিল, সেটা তারা দুই বোন ও এক ভাইয়ের মধ্যে সমহারে ভাগাভাগি করে নেয়।
এদিকে, গত ২ মে অর্নবের রহস্যজনক মৃত্যুর পর কিশোরগঞ্জের সম্পত্তি রক্ষায় আইনি পদক্ষেপ নেওয়া শুরু করেছেন হালিমা খাতুন। তার আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে কিশোরগঞ্জ জেলা জজ আদালত সম্পত্তির ওপর 'স্থিতাবস্থা' জারি করেছে। পরিবারের দাবি, সম্পত্তি দেখভালের দায়িত্বে থাকা কয়েক জন কর্মচারিও হুমকি পাচ্ছেন।
ধানমন্ডি থানা পুলিশ জানিয়েছে, ঘটনাটিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা হচ্ছে। তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, কল রেকর্ডে উঠে আসা জমি ব্যবসায়ী এবং অর্নবের চাচা ওসমান গনিকে পুনরায় জিজ্ঞাসাবাদের পরিকল্পনা রয়েছে। একই সঙ্গে সিআইডির সাইবার টিম অর্নবের ইমেইল ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যাকাউন্টে কোনো হুমকি, চাপ বা ব্ল্যাকমেইলের তথ্য রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখছে।
পুলিশ আরো জানিয়েছে, ভিসেরা রিপোর্ট হাতে পাওয়ার পর মৃত্যুর প্রকৃত কারণ সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যাবে। রিপোর্টে কোনো নেশাজাতীয় দ্রব্য বা বিষক্রিয়ার আলামত মিললে মামলার গতিপথ পরিবর্তন হতে পারে।
এ বিষয়ে অর্নবের চাচা ওসমান গনি ভূঞার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, 'আমি কেন তাকে হত্যা করতে যাব। তাকে হত্যা করে আমার কি লাভ? আমি তো অর্নবকে কোলে পিঠে করে মানুষ করেছি। এই অভিযোগ মিথ্যা। এর কোনো আইনি ভিত্তি নেই।'
এ ঘটনার পর অর্নবের মা হালিমা খাতুন ঢাকার আদালতে গত ৮ জুন ১২ জনকে আসামি করে একটি হত্যা মামলার অভিযোগ করেন। আদালত অভিযোগটি ধানমন্ডি থানায় পাঠিয়ে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেয়।
গতকাল ধানমন্ডি থানার ওসি ইমদাদুল ইসলাম ইত্তেফাককে বলেন, 'আদালতের নির্দেশে গতকাল শনিবার অভিযোগটি মামলা হিসেবে নথিভুক্ত করা হয়েছে। মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা হলেন এসআই আব্দুল করিম।'
ওসি মামলার বরাত দিয়ে বলেন, 'এই মামলায় আসামিরা হলেন, ওসমান গনি ভূঞা, তার স্ত্রী মাসুদা বেগম মায়া, গৃহপরিচারিকা জস্টিনা মং, তানজিলা বেগম, ডেমরার রফিকুল ইসলাম স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ ঝর্ণা লুৎফা, ঐ কলেজের স্টাফ ছ্যাদি, মাহি, কিশোরগঞ্জের তাড়াইলের জাহেদ ভূঁঞা, তার স্ত্রী সেনুয়ারা বেগম, চট্টগ্রামের পাসপোর্ট ও ভিসা অফিসের উপসহকারী পরিচালক মৃদুল ভূঁঞা, শাহজালাল বিমানবন্দরের ডাটা এন্ট্রি কন্ট্রোল অপারেটর দুলদুল ভুঞা ও কিশোরগঞ্জের তাড়াইলের হারুন অর রশিদ ভূঁঞা।
ধানমন্ডি থানার ওসি আরো বলেন, এই ঘটনায় দায়ের করা অপমৃত্যুর মামলাটি এই মামলার সঙ্গে সংযুক্ত করা হবে। কারণ একই ঘটনায় একই অভিযোগে দুটি মামলা থাকার কোনো বিধান নেই।

