বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র মুস্তাফিজুর রহমান। ভারতের বিপক্ষে প্রথম ম্যাচে ৫ উইকেট নেয়ার পর দ্বিতীয় মাচে ছয় উইকেট নিয়ে বিশ্বের ক্রিকেটবোদ্ধাদের নজর কেড়েছেন সাতক্ষীরার তরুণ বাহাতি এই পেস বেলার। তার অনবদ্য বোলিং নৈপুণ্যের ওপর ভর করে সফররত শক্তিশালী ভারতকে হারিয়ে টানা দু’টি জয় পেয়েছে বাংলাদেশ। জিতে নিয়েছে কাঙ্খিত সিরিজ। বাংলাদেশের বিজয়ের ‘নায়ক’ মুস্তাফিজের গ্রামের বাড়ি সাতক্ষীরা জেলার কালিগঞ্জ উপজেলার তারালী ইউনিয়নের তেতুলিয়াতে চলছে তাই আনন্দের বন্যা। এই আনন্দের ঢেউ ছড়িয়েছে গোটা সাতক্ষীরা জেলায়। সেখান থেকে সারাদেশে।
রবিবার খেলা শেষ হওয়ার আগেই ফল অনুমান করে নিয়ে অনেক জায়গায় আনন্দ মিছিল বের করে মুস্তাফিজ ভক্তরা। এলাকায় তিনি নাম পেয়েছেন ‘সাতক্ষীরা এক্সপ্রেস’। তার গ্রামবাসীর মন্তব্য, এই সাতক্ষীরা এক্সপ্রেসে চড়ে সামনের দিনগুলোতেও বাংলাদেশ একের পর এক জয়ের বন্দরে পৌঁছে যাবে। বিশ্ব দরবারে মাথা উঁচু করে খেলবে টাইগাররা। মুস্তাফিজের অসাধারণ কীর্তিতে তার তেতুলিয়া গ্রামে বইছে বাঁধভাঙ্গা আনন্দ। বাড়িতে ভিড় জমাচ্ছে নানা শ্রেণির মানুষ। তার বাবা মাকে অভিনন্দন জানাচ্ছেন। এলাকার বিভিন্ন স্থানে চলে মিষ্টি বিতরণও।
বিশেষ করে তার যে ভাই তাকে নিয়ে সাইকেলে প্রশিক্ষণের জন্য সাতক্ষীরায় নিয়ে আসতেন, সেই মোখলেছুর রহমান যেন আনন্দে বাকরুদ্ধ। তার বাবা আবুল কাসেমও ছেলের সাফল্যে গর্বিত। তার সেজ ভাই মোখলেছুর রহমান পল্টু বলেন, এই তো বছর পাঁচেক আগের কথা। সাতক্ষীরায় অনূর্ধ্ব-১৪ ক্রিকেটে বাছাই পর্বে নজর কাড়ে সবার। তারপর তিন দিনের ছোট কোচিং করানো হয়।
এরপর জেলা পর্যায়ে অনূর্ধ্ব-১৬ ক্রিকেট খেলায় সাতক্ষীরার হয়ে প্রথম মাঠে নেমেছিলেন মুস্তাফিজুর। পড়াশোনায় অতটা মন তার কখনোই ছিল না। স্কুল ফাঁকি দিয়ে সে ক্রিকেট খেলতে যেতেন। বাসায় তো বলেই দিয়েছিলেন, আমার দ্বারা ওসব হবে না। তোমরা আর জোর করো না। এরপর থেকে ক্রিকেটই তার ধ্যানজ্ঞান। বরেয়া মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের মাঠে নেট প্যাকটিস করতেন মুস্তাফিজ।
সাতক্ষীরা গণমুখী সংঘের কোচ আলতাফই প্রথম ধরতে পেরেছিলেন মুস্তাফিজের ভেতরের ‘ধারটা’। এরপরে ঘষামাজার কাজটি তিনি শুরু করে দেন। জেলা পর্যায়ে এসে মুস্তাফিজকে আরও পরিণত করে তুলতে পরিশ্রম করেন সাতক্ষীরার জেলা কোচ মুফাসিনুল ইসলাম তপু। সকলের পরিশ্রমের প্রতিদান দিতে পেরেছেন মুস্তাফিজ। পাকিস্তারে বিপক্ষে টি-টোয়েন্টি ম্যাচে তার পারফরম্যান্সই বলছে সে কথা। জেলা পর্যায়ের পর খুব বেশি দিন তাকে অপেক্ষা করতে হয়নি। ডাক পেয়ে যান খুলনার বিভাগীয় দলে খেলার। বছর তিনেক আগে শেরে বাংলা স্টেডিয়ামে ফার্স্ব বোলিং ক্যাম্পে ট্রায়াল দিতে এসে কোচরা আর ছাড়েননি এই প্রতিভাকে। নিয়মিতই অনূর্ধ্ব-১৯ দলে খেলেছেন। বল করতেন জাতীয় দলের নেটেও। তবে সম্ভবনার দ্যুতি ছড়িয়েছেন গত বছর অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপে। শিকার করেছিলেন ৯ উইকেট। হয়েছিলেন দ্বিতীয় সর্বোচ্চ উইকেট শিকারী। গত বছরের মে মাসে ওয়েস্ট ইন্ডিজ সফরে বাংলাদেশ ‘এ’ দলেও স্থান পেয়েছিলেন তিনি। প্রথম শ্রেণিতে খেলা শুরু করেন গত বছর এপ্রিলে।
অভিষেক ম্যাচের চোখ ধাঁধানো পারফরম্যান্স তাই ‘নতুন দিনের বাংলাদেশ’ দলে ভিন্ন এক মাত্রা যোগ করবে বলেই পূর্বাভাস দিচ্ছে। সব মিলিয়ে বলা যায় নতুন বিস্ময় হিসেবে বাংলাদেশ ক্রিকেটে আবির্ভূত হলেন এই তরুণ পেসার।
মুস্তাফিজের বাবা আলহাজ্ব আবুল কাসেম গাজী আবেগ জড়িত কণ্ঠে বলেন, আমার ছেলে যে জাতীয় টিমে খেলছে এটি গর্বের বিষয়। ভারতের বিপক্ষে ছেলের খেলা দেখে সত্যিই আমি অভিভূত। অভিভূত তার মাও। দীর্ঘদিনের লালিত একটি আশা পূরণ হলো। তিনি আরো বলেন, মুস্তাফিজ আমার একার সন্তান নয়। সে দেশের সন্তান। গোটা জাতির হয়ে ২২ গজের রণাঙ্গনে লড়বে। জাতীয় দলের হয়ে ছেলে আগামীতে যেন আরও ভাল খেলতে পারে তার জন্য তিনি দেশবাসীর কাছে দোয়া কামনা করেন।
জন্মের পর সাতক্ষীরার কালিগঞ্জ উপজেলার তারালি ইউনিয়নের তেতুলিয়া গ্রামেই বেড়ে ওঠা। বরেয়া জিলানী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ছাত্র মুস্তাফিজ। তার জন্ম ১৯৯৫ সালের ৬ সেপ্টেম্বর। চার ভাই ও দুই বোনের সংসারে বেড়ে উঠা এই মেধাবী ক্রিকেটারের। তার বড় ভাই একটি মোবাইল কোম্পানির টেরিটরি অফিসার হিসেবে কর্মরত রয়েছেন। মেজ ও সেজ ভাই ঘের ব্যবসায়ী।
তার ক্রিকেট খেলায় আসার পিছনে সেজ ভাই মোখলেসুর রহমানের অবদান অনেক। ক্রিকেট পরিবারে জন্ম নেয়া মুস্তাফিজকে তাকাতে হয়নি পিছনে ফিরে। বড় ভাই এক সময় ক্রিকেট খেলতেন, মেজ ভাইও কম যান না। আর সেজ ভাই এখনও ক্রিকেট খেলেন।
