নদ-নদী সুরক্ষার প্রশ্নে কোনো আপস নাই

আপডেট : ০৪ মার্চ ২০১৯, ২১:১৬

ভূমি ব্যবস্থাপনা ম্যানুয়াল, ১৯৯০ অনুযায়ী নদীর দুই ধারের যে অংশে শুষ্ক মৌসুমে চর পড়ে এবং বর্ষা মৌসুমে ডুবিয়া যায়, তাহা ‘ফোরশোর’ নামে অভিহিত। এই ফোরশোর এলাকায় কোনো ব্যক্তির অধিকার থাকে না। কেহ এই জমি দখল করিলে তিনি অনুপ্রবেশকারী হিসেবে চিহ্নিত হইবেন। কিন্তু আইন অমান্য করিয়া সমগ্র দেশেই চলিতেছে নদ-নদী দখলের মহোত্সব। এমনকি আদালতের নির্দেশও উপেক্ষিত হইতেছে। ভূমি আগ্রাসনে পড়িয়াছে শহরতীরবর্তী প্রায় ৭০টি নদী। ঢাকার চারিপার্শ্বের শীতলক্ষ্যা, বুড়িগঙ্গা, তুরাগ ও বালু নদীর দিকে তাকাইলেও স্পষ্ট হইয়া উঠিবে, দখল ও দূষণের আকার কতটা ভয়াবহ। কেবল নদী নহে, শহরের ভিতর বা পার্শ্ববর্তী খালগুলিও দ্রুত অদৃশ্য হইয়া যাইতেছে। মানিকগঞ্জের সিঙ্গাইরের ধলেশ্বরী ও সাভারের বংশী নদীর দুই তীরে গড়িয়া উঠিয়াছে শত শত অবৈধ স্থাপনা। দখলদারের তালিকায় সাংসদ, পৌর মেয়র ও ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা ও তাহাদের স্বজনদের নাম রহিয়াছে। অন্যদিকে, বগুড়ায় করতোয়া নদীর ৩০ দখলদারের তালিকা জেলা প্রশাসন ওয়েবসাইটে প্রকাশ করিয়াছে। তবে অভিযোগ উঠিয়াছে, ইহাতে সকল দখলদারের নাম আসে নাই, শুধু বগুড়া শহরের অংশেই অবৈধ দখলদার রহিয়াছে কয়েক শত।

বাংলাদেশকে বলা হয় নদীমাতৃক দেশ। এক সময় জালের মতো সমগ্র দেশে ছড়াইয়া-ছিটাইয়া থাকা অসংখ্য খরস্রোতা নদ-নদী আমাদের জীবন-জীবিকা, সভ্যতা ও সংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ করিলেও আজ সেগুলি জীর্ণ-শীর্ণ, মরণাপন্ন। অনেক নদী ইতোমধ্যে মানচিত্র হইতেও হারাইয়া গিয়াছে। স্বাধীন হইবার পর দেশে নদীপথের দৈর্ঘ্য ছিল ২৪ হাজার বর্গকিলোমিটার। কিন্তু দখলদারদের কারণে বর্তমানে তাহা ৩৮০০ বর্গকিলোমিটারে ঠেকিয়াছে। দেড় হাজার হইতে কমিয়া দেশে এখন নদীর সংখ্যা ৩০০। নদী হইতে ভূমি সৃষ্টির জন্য নেওয়া হইতেছে বিচিত্র কলাকৌশল। সৃষ্টি করা হইতেছে কৃত্রিম চর। নদীর উপর আগ্রাসনের কারণে আগামী দিনগুলিতে পরিবেশসহ সার্বিক পরিস্থিতির ভয়াবহ অবনতি অনিবার্য। নদী রক্ষা কমিশন ৫৮টি জেলায় নদী দখলের চিত্র পর্যবেক্ষণ করিয়া দেখিয়াছেন যে, প্রভাবশালীরাই নদী দখল করিয়া বিভিন্ন স্থাপনা, এমনকি শিল্পকারখানা তৈরি করিয়াছে।

দখলের হাত হইতে নদী বাঁচাইতে আবারও শুরু হইয়াছে কর্মসূচি। দখলদার উচ্ছেদে ইতঃপূর্বে বিক্ষিপ্তভাবে সরকারের বিভিন্ন সংস্থা অংশগ্রহণ করিলেও এখন সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলির সমন্বয়ে যৌথ অভিযান পরিচালনার সিদ্ধান্ত নিয়াছে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়। বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করিবে। আর সহযোগিতা করিবে পরিবেশ অধিদফতর, রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) এবং সিটি কর্পোরেশনসহ সাতটি সরকারি সংস্থা। অতীতে নদী দখল ও দূষণ রোধে বহু অভিযান পরিচালিত হইলেও তাহা ফলপ্রসূ হয় নাই বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয়হীনতার কারণে। এই প্রতিবন্ধকতা দূর হওয়ায় আমরা আশাবাদী, নদী দখল ও দূষণসহ বিভিন্ন অনিয়ম রোধে পরিচালিত কার্যক্রমগুলি সফলতার মুখ দেখিবে। আশঙ্কার বিষয় হইল, উচ্ছেদ অভিযানের সমান্তরালে দখল ও দূষণের হারও বৃদ্ধি পাইতেছে। নদ-নদীগুলিকে দখল, দূষণ ও ভরাট হওয়া রোধ করিতে আইনের যথাযথ প্রয়োগ হওয়া দরকার। কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে নদ-নদী দখলের অভিযোগ থাকিলে তাহাকে সর্বপ্রকার নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষণা করিতে নির্দেশ দিয়াছে হাইকোর্ট। অভিযুক্ত ব্যক্তিকে কোনো ব্যাংক হইতে ঋণ না দেওয়ার ব্যবস্থা গ্রহণেরও নির্দেশ দেওয়া হইয়াছে। আমরা এই সিদ্ধান্তকে সাধুবাদ জানাই। মনে রাখা আবশ্যক যে, নদ-নদীর সঙ্গে আমাদের বাঁচামরার প্রশ্ন জড়িত। অতএব, এই ক্ষেত্রে কোনো আপস নাই।