মুহা. রুহুল আমীন
ভেনিজুয়েলার রাজনৈতিক সংকট বেশ ঘনীভূত হচ্ছে। বেশ কিছুদিন ধরে বামপন্থি প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো এবং বিরোধী দলের মার্কিনপন্থি রাজনীতিক হুয়ান গুয়াইদোর মধ্যে নানামুখী দ্বন্দ্ব-সংঘাত চলছে। কিন্তু আস্তে আস্তে সেখানকার ঘটনাপ্রবাহ এ কথা স্পষ্ট করছে যে মাদুরো ও গুয়াইদোর মধ্যকার দ্বন্দ্বকে ভেনিজুয়েলার অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সংঘাত হিসেবে না দেখে তা যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার মধ্যকার দ্বন্দ্ব হিসেবে বিবেচনা করা উচিত।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন পরাশক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে স্নায়ুযুদ্ধের নতুন যুগের সৃষ্টি করেন। দীর্ঘ চার দশক ধরে বিভিন্ন ফ্রন্টে স্নায়ুযুদ্ধ পরিচালনার পর সোভিয়েত নেতা মিখায়েল গর্বাচেভের গ্লাসনস্ত ও পেরেস্ত্রইকা নীতি অনুসরণের পর থেকে কম্যুনিজম রাজনৈতিক মতাদর্শ হিসেবে ম্রিয়মাণ হয়ে পড়ে। গত শতাব্দীর আশির দশকের শেষদিকে স্নায়ুযুদ্ধের অবসান ঘটে এবং সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যায়। এর পরিপ্রেক্ষিতে জেগে থাকে কেবল রাশিয়া। প্রথমদিকে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের কেউ কেউ দুই পরাশক্তির স্নায়ুযুদ্ধের অবসানকে ‘ইতিহাসের সমাপ্তি’ হিসেবে ঘোষণা করেন। কেউ-বা আবার কম্যুনিজমের ধ্বংসস্তূপে পুঁজিবাদের পতাকা উত্তোলনের পূর্বাভাস দেন। এমনকি অনেকে কম্যুনিজমের পরাজয় এবং পুঁজিবাদের বিশ্বজয়ের ঘোষণা দেন। অনেক বিশ্লেষক তখন যুক্তরাষ্ট্রের একক পরাশক্তি হিসেবে আবির্ভাবে অভিনন্দনগাথা রচনা করেন।
কিন্তু সকল বিশ্লেষণ মিথ্যা প্রতিপন্ন করে রাশিয়া একে একে বিশ্বরাজনীতিতে নতুন চাঞ্চল্যকর ঘটনার জন্ম দিয়ে একথা স্পষ্ট করে যে, সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে গেলেও রাশিয়া এখন পূর্বের ন্যায় সোভিয়েত শৌর্য-বীর্য ধারণ করে তথাকথিত একক পরাশক্তি যুক্তরাষ্ট্রকে চ্যালেঞ্জ করার শক্তিতে বলীয়ান আছে। একবিংশ শতাব্দীর প্রথম দশকেই রাশিয়া তার শক্তি প্রদর্শনে মরিয়া হয়ে ওঠে। এখানে উল্লেখ করার প্রয়োজন যে, তথাকথিত একক পরাশক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করার পর থেকে যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বরাজনীতিতে আধিপত্য স্থাপনের নানা কাহিনির জন্ম দিতে থাকে। আফগানিস্তান ও ইরাক আক্রমণ করে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করে দেশদুটিকে। অন্যদিকে, সেসব দেশের প্রতিবাদী যোদ্ধাদেরকে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সাহায্য-সহযোগিতা দানের মাধ্যমে রাশিয়া এটা বুঝাতে চায় যে, যুক্তরাষ্ট্রকে আন্তর্জাতিক সম্পর্কে একচেটিয়া মোড়লিপনা করতে দেওয়া হবে না। এক পর্যায়ে ইরাক ও আফগানিস্তানে যুক্তরাষ্ট্র ও তার ইউরোপীয় পুঁজিবাদী মিত্রদের চাপিয়ে দেওয়া যুদ্ধ বৈশ্বিক পুঁজিবাদের লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হয়।
স্মরণ রাখা দরকার ইতোপূর্বে ইরাকের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধ বাধিয়ে উদীয়মান একক পরাশক্তি যুক্তরাষ্ট্র ক্ষয়িষ্ণু কম্যুনিষ্ট রাষ্ট্র সোভিয়েত ইউনিয়নকে চ্যালেঞ্জ করলেও সে চেষ্টায়ও যুক্তরাষ্ট্র ব্যর্থ হয়। সোভিয়েতের উপসাগরীয় মিত্র ইরানকে কাবু করার লক্ষ্যও ভেস্তে যায়। সদ্য সৃষ্ট ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান সোভিয়েতের সাহায্য-সমর্থন নিয়ে আস্তে আস্তে অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কে গ্রহণযোগ্য শক্তি হিসেবে নিজকে তৈরি করতে থাকে এবং এক পর্যায়ে এ শতাব্দীর দ্বিতীয় দশকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় পুঁজিবাদী রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে সমমর্যাদার ভিত্তিতে পারমাণবিক চুক্তি স্বাক্ষর করে যা যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বাতিল ঘোষণা করে প্রকারান্তরে রাশিয়ার সঙ্গে নতুন দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়ে।
একবিংশ শতাব্দীর আগে এবং শুরুতে আন্তর্জাতিক সম্পর্কে যুক্তরাষ্ট্র যতগুলো দ্বন্দ্ব-সংঘাত তৈরি করেছে, তার প্রায় সবকটিতে রাশিয়া প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে যুক্তরাষ্ট্রের বিরোধিতায় নিয়োজিত থেকেছে। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের এ দ্বন্দ্ব-সংঘাত কি যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার নতুন স্নায়ুযুদ্ধ? নাকি তাদের সম্মুখযুদ্ধ পরিচালিত হচ্ছে তাদের দেশের সীমানার বাইরে, যে যুদ্ধে জড়িত আছে এ দুই পরাশক্তির সীমানার বাইরের রাষ্ট্রিক ও অরাষ্ট্রিক পক্ষসমূহ? এ প্রশ্নের উত্তর অন্বেষণ এখন আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে পরিণত হয়েছে।
আমি পাঠকবর্গকে মধ্যপ্রাচ্যের আঞ্চলিক দ্বন্দ্বের দিকে দৃষ্টি দিতে বলবো। একটু চিন্তা করলেই বোঝা যায় মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা এমনভাবে জড়িয়ে পড়েছে, যেন ইতিহাস তাদেরকে মধ্যপ্রাচ্যের সমগ্র অঞ্চলে তাদের জাতীয় স্বার্থ যথা তেলসম্পদ অর্জনের একচেটিয়া অধিকার দান করেছে! ইরাক আক্রমণের পূর্বে যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রিটেন দাবি করেছিল যে, ইরানের একনায়ক সাদ্দাম হোসেনকে হটিয়ে সেখানে গণতন্ত্র ও সুশাসন প্রতিষ্ঠিত করা হবে। কিন্তু বিশ্ববাসীকে বোকা বানানো যায়নি বেশিদিন। অচিরেই বিশ্বব্যাপী এ তথ্য ফাঁস হয় যে, ইরাক তথা মধ্যপ্রাচ্যের তেলসম্পদ হরণ করার নেপথ্য উদ্দেশ্যেই গায়ে পড়ে ঐ যুদ্ধ বাধানো হয়েছিল। ব্রিটিশ নাগরিকরা তো প্রকাশ্যেই জানিয়ে দিয়েছিলেন যে ব্লেয়ার জাতির কাছে মিথ্যা বলে ইরাক যুদ্ধে জড়িয়েছে। বুশও যুক্তরাষ্ট্রে নিন্দিত হয়েছিলেন।
মধ্যপ্রাচ্যের পরবর্তী লোমহর্ষক লুণ্ঠন কাহিনি সংঘটিত হলো সিরিয়ার মাটিতে। এবারও গণতন্ত্র রক্ষার কথা বলে পাশ্চাত্যের চিরবিশ্বস্ত হাফেজ আল আসাদের পুত্র বাশার আল আসাদকে ক্ষমতাচ্যুত করার যুদ্ধ শুরু করা হলো। এবার কিন্তু রাশিয়া প্রকাশ্যে আসাদের সমর্থনে সৈন্য প্রেরণ করলো। সিরিয়ার মাটিতে আসাদ বিরোধীদেরকে যুদ্ধে হটিয়ে একথাই প্রমাণ করলো মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের জবরদখল নীতি বাস্তবায়নের দিন ফুরিয়ে গেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে স্নায়ুযুদ্ধের নতুন ফ্রন্টে রাশিয়া এখন ইরানের পাশাপাশি তুরস্ক ও চীনকেও মিত্র হিসেবে নির্ভর করতে শুরু করেছে।
মধ্যপ্রাচ্যের বাইরে যদি পূর্ব ইউরোপের রাজনীতি পর্যবেক্ষণ করি, তাহলে সেখানেও আমরা একই চিত্র দেখি। যুক্তরাষ্ট্র পূর্ব ইউরোপে ন্যাটো সৈন্য সরবরাহ করলে, এ অঞ্চলে অস্ত্রের সমারোহ করলে রাশিয়া তার পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে ইউক্রেনের ক্রিমিয়া দখলের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রকে স্পষ্ট বার্তা দেয় যে, পূর্ব ইউরোপে যুক্তরাষ্ট্রকে চ্যালেঞ্জ করতে সর্বশক্তি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে রাশিয়া। রাশিয়ার সঙ্গে ক্রিমিয়ার সংযুক্তির পর বিশ্বমিডিয়ায় এ খবর প্রচারিত হয় যে বিশ্বব্যাপী নতুনরূপে স্নায়ুযুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ায় নতুন এ স্নায়ুযুদ্ধ লাতিন আমেরিকায়ও সম্প্রসারিত হয়েছে। এ অঞ্চলের যেসব রাষ্ট্রে সমাজতন্ত্র ও কম্যুনিজম প্রতিষ্ঠিত সেই রাষ্ট্রগুলোতে যুক্তরাষ্ট্র নানামুখী আঘাত জারি রেখেছে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, ভেনিজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোর বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র লেলিয়ে দিয়েছে স্বঘোষিত প্রেসিডেন্ট হুয়ান গুয়াইদোকে। গত কয়েক সপ্তাহ ধরে বিশ্ববাসী দেখেছে কীভাবে মাদুরোকে ক্ষমতাচ্যুত করে পশ্চিমা পরাশক্তির পুতুল রাজনীতিক গুয়াইদোকে মসনদে বসানোর সুযোগ খোঁজা হচ্ছে। ভেনিজুয়েলার ভুখা-নাঙ্গা মানুষকে ত্রাণদানের নাটক মঞ্চস্ত করে যুক্তরাষ্ট্র ভেনিজুয়েলার ত্রাণবহর পাঠালে মাদুরো তা আটকে দেন। ফেব্রুয়ারি মাসের শেষ সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের ত্রাণবহর ১৭৮ মেট্রিক টন চাল, মটরশুটি ও অন্যান্য খাদ্যদ্রব্য নিয়ে কলম্বিয়া থেকে যখন সীমান্ত অতিক্রম করছিল তখন মাদুরোর সৈন্যরা বাধা দেয়। এক পর্যায়ে সংঘর্ষ বাধে ও চারজনের মৃত্যু হলে যুক্তরাষ্ট্র ভেনিজুয়েলায় প্রতিশোধমূলক সহিংসতা ও দুঃখজনক মৃত্যুর জবাবে ভেনিজুয়েলায় ছয় সামরিক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা জারি করে।
ভেনিজুয়েলাকে কীভাবে সহযোগিতা করা হবে, এ ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়া বিরোধে জড়িয়ে পড়েছে। রাশিয়ার পাশে ইরান ও চীন এসে দাঁড়িয়েছে। জাতিসংঘের এক প্রস্তাবে চীন ও রাশিয়া ভেটো দিয়েছে। ইতোমধ্যে প্রেসিডেন্ট পুতিন ভেনিজুয়েলার ক্ষুধা-জর্জরিত মানুষের জন্য ত্রাণ পাঠানোর ঘোষণা দিয়েছেন। ভেনিজুয়েলার প্রেসিডেন্ট মাদুরো তার দেশের রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত তেল কোম্পানি পিডিভিএস’র দপ্তর পর্তুগালের রাজধানী লিসবন থেকে মস্কোয় স্থানান্তরের নির্দেশ দিয়েছেন। ভেনিজুয়েলার ভাইস প্রেসিডেন্ট দেলসি রডরিগেস ১ মার্চ মস্কো গিয়ে রাশিয়ায় পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই লাভরভের সঙ্গে যৌথ সংবাদ সম্মেলনে ঘোষণা করেন যে, তার দেশ তেলসম্পদ উন্নয়নে রাশিয়ার সঙ্গে কাজ করবে। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ৪৯ জন ভেনিজুয়েলীয় কর্মকর্তা ও তাদের পরিবারের ভিসা বাতিল করেছে।
উপর্যুক্ত ঘটনাবলির আলোকে এ উপসংহারে পৌঁছা যায় যে যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়া ভেনিজুয়েলাসহ সমগ্র বিশ্বে দ্বন্দ্ব-সংঘাতের নতুন যুগে প্রবেশ করেছে। ভেনিজুয়েলাসহ যেসব বৈশ্বিক দ্বন্দ্বে যাতে যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়া জড়িয়ে পড়েছে, সেগুলোকে কোনোভাবেই ঐ দেশসমূহের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব হিসেবে দেখা সংগত হবে না। ঐসব দ্বন্দ্বের শেকড় রয়েছে তাদের সীমানার বাইরে। যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার পরস্পরবিরোধী স্বার্থ-লড়াই এর উত্স। প্রশ্ন হলো, আমরা কি স্নায়ুযুদ্ধের নতুন অধ্যায়ে? নাকি যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার সম্মুখযুদ্ধ শুরু হয়েছে তাদের সীমানার বাইরে, আফ্রো-এশীয়-লাতিন-আমেরিকার যুদ্ধ ময়দানে?
n লেখক :অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ,
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
