এই পৃথিবীতে প্রতিদিনই হচ্ছে নিত্যনতুন আবিষ্কার। আর বর্তমান প্রযুক্তি বিশ্বের সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হচ্ছে চালকবিহীন বিমান বা ড্রোন। আর এবার এই ড্রোন বানিয়েই সারা দেশে তাক লাগিয়ে দিয়েছে ইন্ডেপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটির তিন ছাত্র। তাদের এই দলটির নাম (এআই স্কোয়াড), যার পূর্ণরূপ হলো আর্টিফিসিয়াল ইন্টালিজেন্স স্কোয়াড। সম্প্রতি তারা তাদের তৈরি নতুন একটি প্রযুক্তি নিয়ে আইসিটি এক্সপো ২০১৫-এর ইনোভেশন জোনে প্রদর্শন করে। তারা এই ড্রোনটির নামকরণ করেছেন আনমেন্ড এরিয়াল ভেহিকেল নামে। তারুণ্যের এই উদ্যোগ নিয়ে লিখেছেন রুবাইয়া নাসরিন সেঁজুতি
স্বপ্ন দেখা বাংলাদেশকে বাস্তবায়নে রূপ দিতেই আইইউবির কজন তরুণ প্রকৌশলী শিক্ষার্থীর উদ্যোগে গড়ে ওঠে এআই স্কোয়াড। তাদের যাত্রা ২০১৩ থেকে শুরু হলেও সম্প্রতি তারা তাদের তৈরি নতুন একটি প্রজেক্ট আইসিটি এক্সপো ২০১৫-এর ইনোভেশন জোনে প্রদর্শন করে, যার নাম আনমেন্ড এরিয়াল ভেহিকেল (মনুষ্যবিহীন যন্ত্রচালিত বিমান)। এটা ১৫-২০ ফুট রানওয়ে ব্যবহার করে উড্ডয়ন ও অবতরণ করতে পারে। যার অবকাঠামো সম্পূর্ণ দেশীয় প্রযুক্তিতে তাদের নিজেদের তৈরি করা। যেখানে একটি ড্রোন বানানো কিছুটা ব্যয় সাপেক্ষ বটে সেখানে দেশীয় প্রযুক্তির প্রয়োগে এটি ৩৫ থেকে ৪০ হাজারেই সম্ভব হয়েছে। যদিও এটিকে ড্রোন বলতে একদমই নারাজ জয়ন্তু। তার ভাষ্যে, ড্রোন চলে স্যাটেলাইটের মাধ্যমে, আর তাদের প্রজেক্ট চালাতে তা কন্ট্রোল করতে হয়। এটি ১৫-২০ কেজি ওজন নিয়ে উড়তে পারে, আর ভেতরে লাগানো আছে আইআর নাইট ভিশন ক্যামেরা, যেটা দিন ও রাত উভয় সময় পরিষ্কার ভিডিও ছবি নিরবচ্ছিন্নভাবে গ্রাউন্ড কন্ট্রোল স্টেশনে সরাসরি পাঠাতে সক্ষম, যা একই সময়ে দেখা যাবে এবং নিজ থেকে রেকর্ড হবে। এটি অবশ্যই যেকোনো জায়গার সিকিউরিটি ডেভেলপমেন্টে অত্যন্ত সহায়ক। শুধু ওজন বহনের ক্ষমতা থেকেই এটি পুলিশ বা সেনাবাহিনীর সহায়তা করবে। দুর্গম বা বন্যাগ্রস্ত এলাকার মানুষদের ত্রাণ পাঠাতে এটি ব্যবহার করা যাবে। এমনকি এটি দিয়ে ১৫-২০ বিঘা কৃষি জমিতে অনায়াসে এক ঘণ্টায় সমানভাবে সার ও কীটনাশক ব্যবহার করা সম্ভব। এটি উপরে ৩০০ ফিট এবং সমতলে ১.৫ কিলোমিটারজুড়ে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। এটি বাড়িয়ে ৩০-৪০ কিলোমিটার করার জন্য কাজ করে যাচ্ছেন তারা। বাংলাদেশে পর্যাপ্ত পরিমাণে এয়ারপোর্ট নেই, আর পাহাড়ি অঞ্চলও রয়েছে। বান্দরবান বা রাঙামাটির মতো এলাকাগুলোতে রানওয়ে না থাকায় সেনাবাহিনী দেশকে বাঁচাতে পারলেও নিজেদের নিরাপত্তার অভাবে ভোগে। কিন্তু এই প্রজেক্ট ব্যবহার করে চালকবিহীন বিমানকে ১০-১৫ ফিটে অবতরণ করানো সম্ভব।
জয়ন্তর মতে, যারা আমাদের নিরাপত্তাকর্মে জড়িত তাদের নিরাপত্তা সবার আগে জরুরি। তাদের প্রযুক্তির মূল লক্ষ্য হলো এর মাধ্যমে বাংলাদেশের সমুদ্রসীমা পাহারা দেওয়া। সম্প্রতি বাংলাদেশ যে বিশাল সমুদ্রসীমা জয় করেছে তা বাংলাদেশ নৌবাহিনীর পক্ষে শুধু জাহাজ দিয়ে পাহারা দেওয়ার চেয়ে এটি ব্যবহার করে তাদের কার্যক্রম জোরদার করতে পারে। এটি জাহাজ থেকে খুব সহজে উড্ডয়ন ও অবতরণ করান সম্ভব। এর মাধ্যমে খুব অল্প খরচে সহজেই সমুদ্রসীমা পাহারা দেওয়া যেতে পারে, যেখানে হেলিকপ্টার দিয়ে পাহারা দেওয়া ব্যয় সাপেক্ষ বটে। ৪ জনের গ্রুপে জয়ন্তর সহযোগিতায় আছে সাকিবুল হাসান আবির, আকিল হামিদ চৌধুরী ও প্রণবেশ সরকার জারা; যারা আইইউবিতে কম্পিউটার সায়েন্স ও ইইইর শেষ বর্ষে অধ্যয়নরত। এছাড়াও উপদেষ্টা হিসেবে আছেন ড. মাহমুদ হাসান এবং গণিত বিভাগের শিক্ষক আরিফুল কবির, যার সহযোগিতা ও অনুপ্রেরণাতে মূলত এতদূর আসতে পারা বলে জানালেন জয়ন্ত। এদিকে আরেক সহযোগী আবির বললেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগিতাও অনস্বীকার্য। ডিপার্টমেন্টের ল্যাব সর্বক্ষণই উন্মুক্ত ছিল তাদের কাজ করার জন্য। এদের আরও কিছু প্রজেক্টের মাঝে রয়েছে কোয়াড কপ্টার, অক্টো কপ্টার যেগুলো ১.৫ কিলোমিটার দূর থেকে স্থিরচিত্র ও ভিডিও প্রেরণে সক্ষম। গত ২ বছর ধরে তারা কোয়াড কপ্টারের সাহায্যে বিভিন্ন এরিয়াল স্থিরচিত্র ধারণ করতে সক্ষম হয়েছে যেটা কিনা ৭০০ গ্রাম ওজন ধারণ করে উড়তে পারে। আরও কাজ চলছে ওয়াই সিক্স কপ্টারের যেটাকে আমেরিকাতে এম্বুল্যান্স ড্রোন বলা হয়। কারণ এটির মাধ্যমে আমেরিকার ডেলফট বিশ্ববিদ্যালয় ও টেকনোলজির শিক্ষার্থী হূদরোগীর দ্রুত প্রাথমিক চিকিত্সা পৌঁছে দিতে সক্ষম হোন।
আই স্কোয়াড টিমটি সবসময় চেষ্টা করে যাচ্ছেন নিজেদের জ্ঞানকে কাজে লাগিয়ে আর অক্লান্ত পরিশ্রম করে এগিয়ে যাওয়ার। আর তাই তো নিজেদের যাচাই করে দেখার সুযোগ ছাড়েন না। বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের চেষ্টা তাদের শুরুর থেকেই। আর তাই ২০১৪ সালে অংশগ্রহণ করেন প্রথম জাতীয় হোভার প্রদর্শনীতে, তারপর প্রথম জাতীয় এরো ডিসাইনিং প্রতিযোগিতা এবং প্রদর্শনীতে অংশগ্রহণ করে হয়ে যান সেকেন্ড রানার আপ। বেস্ট ফ্লাইট অ্যাওয়ার্ড জিতে নেন ইন্ডিয়াতে এই বছর অনুষ্ঠিত আরসি এয়ারক্রাফট কর্মশালা ও প্রতিযোগিতায়। একই সাথে ইন্ডিয়াতে আরসি হভার্ক্রাফট কর্মশালা ও প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করেন তারা। এই বছরেই নিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে অনুষ্ঠিত হয়ে যাওয়া এরো ফেস্ট ২০১৫ প্রতিযোগিতায় রোটারি শাখায় প্রথম স্থান অধিকার করেন। এরপরও থেমে থাকেনি দলটি, প্রশংসার নেশায় আর ভালো কিছু করার আশায় কাজ করে চলেছে অবিরত। এমনকি অরনিথপার কর্মশালা ও প্রতিযোগিতায় যেটার সনদপত্র ইউএসএ অরনিথপার জোন থেকে প্রদান করা হয় সেখানেও প্রথম পুরস্কার ছিনিয়ে আনেন। এছাড়াও অংশগ্রহণ করেছেন সিলেট এ ইয়ুথ বাংলা ফেস্টিভ্যাল, আন্তর্জাতিক ইনোভেশন সামিটে। তাদের সাফল্যের পেছনে রয়েছে তাদের অক্লান্ত পরিশ্রম আর একাগ্রতা। এমনকি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অব ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড কম্পিউটার সায়েন্সের ডিন ড. আলী সিহাব সাব্বির স্যারের সাথে কথা বললে তিনি জানান, জয়ন্তুর গ্রুপটির কাজের জন্য তিনি গর্বিত। ভবিষ্যতে তাদের আরও ভালো করার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের মাধ্যমে আর্থিক সহযোগিতা করার উদ্যোগ নিয়েছেন তিনি।