রাজনৈতি অস্থিরতায় অর্থনীতির ক্ষয়-ক্ষতির চেয়ে দুর্নীতির কারণে বেশি ক্ষতি হচ্ছে বলে মনে করেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। তিনি বলেন, ‘দুর্নীতির কারণে দেশের মোট দেশজ উত্পাদনের (জিডিপি) দুই থেকে তিন শতাংশ ক্ষতি হচ্ছে। এ ক্ষতি মোকাবিলায় নেয়া পদক্ষেপ পর্যাপ্ত নয়।’
বাংলাদেশে অবস্থিত বিভিন্ন উন্নয়ন সহযোগী দেশ ও সংস্থাগুলো নিয়ে গঠিত স্থানীয় পরামর্শক গ্রুপের (এলসিজি) সঙ্গে এক বৈঠকে এ কথা বলেন অর্থমন্ত্রী।
সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরকিল্পনার খসড়া নিয়ে ঢাকার শেরেবাংলা নগরের এনইসি সম্মেলনকক্ষে এ বৈঠকের আয়োজন করা হয়। পরিকল্পনামন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল, অর্থ ও পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী এম এ মান্নান এবং উন্নয়ন সহযোগী বিভিন্ন সংস্থা প্রতিনিধিরাও এ সময় উপস্থিত ছিলেন। এলসিজির কো-চেয়ার ডিএফআইডির আবাসিক প্রতিনিধি সারা কুক এবং ইআরডি সিনিয়র সচিব মো. মেজবাহ উদ্দিন উদ্বোধনী বক্তব্য দেন। পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য ড. শামসুল আলম ৭ম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার বিভিন্ন বিষয় তুলে ধরেন।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘তথ্য-প্রযুক্তির ব্যবহার দুর্নীতি কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। দেশ নিম্ন-মধ্য আয়ের দেশে উন্নতি হলেও অসমতা এখনো বিদ্যমান। এ দেশে আয় বৈষম্য বেশি। এটাকে গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে। অর্থনৈতিক শক্তির মাধ্যমে অন্যান্য সমস্যাগুলোও দূর হয়ে যাবে।’
মুহিত বলেন, ‘আাাগামী পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা অনুযায়ী কর্মসংস্থান তৈরি করা এবং বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ বাড়ানো বড় চ্যালেঞ্জ। ৭ম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পা অনুযায়ী সরকারের ১ কোটি ৭৮ লাখ নতুন কর্মসংস্থান তৈরির লক্ষ্য রয়েছে, যা অতি উচ্চাভিলাষী। বর্তমানে জিডিপির ২২ ভাগ বেসরকারি বিনিয়োগকে ২০২০ সালে সাড়ে ২৬ ভাগে উন্নতি করার লক্ষ্য থাকছে নতুন পরিকল্পনায়।’
এ বিষয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘আমাদের বেসরকারি খাতের অনেক সুপ্ত ক্ষমতা রয়েছে, যা সক্রিয় করা প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে বৈদেশিক সহায়তা বেসরকারি খাতের উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে পারে বলে তিনি মনে করেন।’
সরাসরি বৈদেশিক বিনিয়োগের (এফডিআই) বিষয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘আমাদের দেশে ২০১৪ সালে এফডিআই এসেছে ১.৫৭ বিলিয়ন ডলার। ৭ম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা অনুযায়ী—২০২০ সালের মধ্যে এফডিআই ৯.৬ বিলিয়ন ডলারে উন্নতি করার লক্ষ্য রয়েছে। এ বিষয়ে উন্নয়ন সহযোগীরা বড় ভূমিকা রাখতে পারে। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) সংজ্ঞা অনুযায়ী—দেশে বেকারের সংখ্যা নির্ধারণ করা হয়। এ সংজ্ঞায় দেশে বেকারের বাস্তব চিত্র আসেনি। বাস্তবে দেশে বেকারের সংখ্যা আরো বেশি। ৭ম পঞ্চাবার্ষিক পরিকল্পনায় শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি এবং দক্ষতা উন্নয়নে জোর দেয়া প্রয়োজন। বিকেন্দ্রীকরণকে গুরুত্ব দিতে হবে। আমরা মাওয়ার কাছে একটা স্যাটেলাইট শহর গড়ে তুলব। ২০২০ সালের মধ্যে এটা হবে।’
নিম্ন-মধ্য আয়ের দেশে উপনীত হওয়ায় বাংলাদেশকে অভিনন্দন জানিয়ে বক্তব্য দেন এলসিজি কো-চেয়ার সারা কুক। তিনি বলেন, ‘দারিদ্র্য হ্রাসে বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য উন্নতি করেছে। অনেক এমডিজি ইতিমধ্যেই অর্জিত হয়েছে। মধ্য-আয়ের দেশে উন্নীত হওয়ার জন্য বাংলাদেশকে উন্নয়ন সহযোগীরা সহায়তা অব্যাহত রাখবে আশা করি।’
পরিকল্পনামন্ত্রী বলেন, ‘৬ষ্ঠ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা বাস্তবায়নে আমাদের যে সমস্ত ত্রুটি ছিল, সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় তা আর থাকবে না।’
সভা সূত্রে জানা গেছে—আলোচনায় অংশ নিয়ে বিশ্ব ব্যাংক প্রতিনিধি উল্লেখ করেন, প্রকল্পের গুণমান বজায় রেখে সর্বনিম্ন খরচে সময়মতো প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে হবে। অভ্যন্তরীণ সম্পদ আহরণ বাড়াতে ভ্যাট, আয়কর আইনে সংস্কার আনতে হবে। সমস্ত ক্রয় ই-প্রকিউরমেন্টের আওতায় আনতে হবে। সরকারি সংস্থায় অডিটে বেসরকারি অডিট ফার্মকে সম্পৃক্ত করতে হবে। বিশ্ব বাজারে পণ্যের মূল্য এখন কম। সরকারকে ভর্তুকি ব্যবস্থাপনা নিয়ে ভাবতে হবে।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের পক্ষ থেকে উল্লেখ করা হয়—সরকারি অর্থ ব্যবস্থায় সংস্কার আনতে হবে। সামাজিক খাতে বরাদ্দ বাড়াতে হবে। নীতি নির্ধারণের ক্ষেত্রে আরো গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় অনুসরণ করে সব স্তরে সুশীল সমাজকে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। বিদ্যমান ভূমি ব্যবস্থাপনা সংস্কার আনতে হবে।
ডিএফআইডি প্রতিনিধিরা বলেন—বিচার ব্যবস্থাকে তথ্যপ্রযুক্তির আওতায় আনা হচ্ছে—এটা ভালো। তবে তথ্য প্রযুক্তি শুধু যেন কোর্ট পর্যন্ত না থাকে। যে সমস্ত প্রতিষ্ঠান আইনি সহায়তা দিয়ে থাকে, তারাও যেন তথ্যপ্রযুক্তির আওতায় আসে।
উল্লেখ্য, ৭ম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা অনুযায়ী—চলতি অর্থবছর থেকে পরবর্তী ৫বছরের মধ্যে অর্থাত্ ২০২০ সালের মধ্যে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৮ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য রয়েছে। সেই সাথে মূল্যস্ফীতির হার সাড়ে ৫ শতাংশে বেধে রাখাসহ বেসরকারি বিনিয়োগের পরিমান জিডিপির ৩৩.৪ এবং সরকারি বিনিয়োগ ৭.৮ শতাংশ এবং জাতীয় সঞ্চয় হার ৩২.১ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য রয়েছে।
