কুমিল্লায় ইটভাটা শ্রমিকদের মানবেতর জীবনযাপন

আপডেট : ০৪ মার্চ ২০১৯, ২১:৩৫

 মো. লুত্ফুর রহমান, কুমিল্লা প্রতিনিধি

কুমিল্লার আনাচে-কানাচে ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে উঠা অধিকাংশ ইটভাটায় শিশুসহ নানা বয়সের শ্রমিকরা মানবেতর জীবনযাপন করছে। ভাটাগুলোর প্রায় অর্ধেকেরই নেই বিএসটিআই সনদ, কৃষি ও পরিবেশ ছাড়পত্র। অনেকে আবেদন দাখিল করেই কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন। এ ছাড়া ভাটাগুলোর অধিকাংশের নবায়ন নেই এবং অনেকেই মানছেন না ইট প্রস্তুত ও ভাটা স্থাপন আইন ও শর্তাবলী। নিম্নমানের ইট দিয়ে যেনতেনভাবে তৈরি করা অস্থায়ী একচালা শেডের সরু ঘরের মেঝেতে খড় বিছিয়ে গাদাগাদি করে ঘুমান শ্রমিকরা। বেশ কয়েকটি ইটভাটায় ঘুরে শ্রমিকসহ সংশ্লিষ্ট লোকজনের সাথে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।

এদিকে জেলার চৌদ্দগ্রামের একটি ইটভাটায় সম্প্রতি কয়লা বোঝাই ট্রাক উল্টে শ্রমিকদের থাকার শেডে পড়ে ১৩ জন শ্রমিক ঘুম থেকে চিরঘুমে চলে যাওয়ার ঘটনার পর প্রশাসনের টনক নড়ে। এরপর জেলা প্রশাসন ও পরিবেশ অধিদপ্তরের উদ্যোগে অভিযান চালিয়ে বেশ কয়েকটি ইটেরভাটা মালিককে জরিমানা করা হয়।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, প্রাচীন এ জেলার ১৭টি উপজেলা এলাকায় বৈধ-অবৈধ মিলিয়ে ছোট-বড় অন্তত পাঁচশ ইটের ভাটা রয়েছে। তবে পরিবেশ অধিদপ্তর কুমিল্লার তথ্য অনুযায়ী জেলায় অনুমোদিত ইটভাটার সংখ্যা ৩১৯টি। এরমধ্যে জানুয়ারি পর্যন্ত নবায়নকৃত ১৮৫টি এবং নবায়নবিহীন আছে ৯৩টি। ওই দপ্তরে নতুন ইটভাটার জন্য আবেদন রয়েছে ৪১টি। বাকীগুলোর অনুমোদন নেই। এসব ইটভাটায় আকার ভেদে দেড়শ থেকে তিন শতাধিক নানা বয়সের শ্রমিক কাজ করছে। শ্রমিকদের সিংহভাগের বাড়ি রংপুর, ময়মনসিংহ, নীলফামারী, নেত্রকোনা, বরগুনা, সাতক্ষীরাসহ উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন জেলায়। অধিকাংশ ভাটায় শ্রমিক হিসেবে অনেক শিশু-কিশোর কাজ করছে। এতে শিক্ষার অধিকার থেকে বঞ্চিত হওয়ার পাশাপাশি ভাটার বিষাক্ত ধোঁয়ায় মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ছে তারা। কয়েকটি ইটভাটায় গিয়ে দেখা যায়, বড়দের পাশাপাশি শিশু শ্রমিকরাও কাজ করছে। কাঁচা ইট রোদে শুকানো, ইট তৈরি, ট্রলিতে করে ইট টেনে ভাটাস্থলে পৌঁছানো, মাটি বহন করাসহ সব কাজেই নিয়োজিত আছে এই শিশুরা। শিশুদের অনেকে তাদের বাবা-ভাই কিংবা সর্দারের সঙ্গে এসেছে ছয় মাসের কাজের চুক্তিতে।

একাধিক শ্রমিক সর্দার জানান, বিভিন্ন ইটভাটায় নানা বয়সের শ্রমিকদের সারাদিন কঠোর পরিশ্রমের পর শেডের ভেতর মাটিতে খড় বিছিয়ে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে ঘুমাতে হয়। জেলার প্রায় সবগুলো ব্রিক ফিল্ডের একই চিত্র।

একাধিক ইটভাটার মালিক সূত্রে জানা যায়, স্থানীয়ভাবে ইটভাটায় কাজ করার মতো শ্রমিক পাওয়া যায় না। তাই অধিকাংশ ইটভাটায় উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন এলাকা থেকে দৈনিক মজুরির ভিত্তিতে শ্রমিকদের কাজে নিয়ে আসেন ঠিকাদাররা (সর্দার)। তারা ছোট ছোট গ্রুপে শ্রমিকদের নিয়ন্ত্রণ করে থাকেন।

ভাটা মালিকদের কেউ কেউ জানান, চুক্তির বাইরেও সর্দারদের অনেকে শ্রমিকদের নিকট থেকে মাথাপিছু মজুরির একটি অংশ হাতিয়ে নেন। এ ক্ষেত্রে ইটভাটার মালিক ও সর্দারের মধ্যে শ্রমিক কেনা-বেচা হয়ে থাকে।

একটি ব্রিক ফিল্ডের ম্যানেজার আলমগীর হোসেন বলেন, ‘ভাটার কাজে স্থানীয়ভাবে পারদর্শী শ্রমিক পাওয়া যায় না, আর পেলেও অনেকে চাহিদামতো কাজ করে না। উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন জেলার শ্রমিকরা এই কাজে খুব দক্ষ। তাই এদের দিয়ে কাজ করানো ছাড়া আমাদের উপায় থাকে না, তবে কাজ অনুযায়ী তাদের পারিশ্রমিক দেওয়া হয়ে থাকে।’

অপর একটি ব্রিক ফিল্ডের মালিক আবদুল রেজ্জাক বলেন, ‘শ্রমিকের প্রয়োজন হলে সর্দারের সঙ্গে কথা বলি। তারা শ্রমিক সংগ্রহ করে দেন। কিন্তু শ্রমিকরা কোথায় কিভাবে থাকবে তা আলোচনা করে সিদ্ধান্ত হয়।’

সাদ্দাম হোসেন নামে একজন সর্দার বলেন, চুক্তি অনুযায়ী শ্রমিকদের থাকার ব্যবস্থা ইটভাটা কর্তৃপক্ষ করে থাকে। আমরা শ্রমিক হওয়ায় মালিকেরা দায়সারাভাবে একটা ব্যবস্থা করে দেন। এতে অস্বাস্থ্যকর ও ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে শ্রমিকদের থাকতে হয়। জেলার চৌদ্দগ্রামের কে এন্ড কোং নামক ইটভাটায় কয়লা বোঝাই ট্রাক উল্টে ঘুমন্ত ১৩ জন শ্রমিকের মৃত্যুর ঘটনা এরই কারণ বলে তিনি দাবি করেন। জেলার চান্দিনা উপজেলার মাইজখার ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান হুমায়ুন কবির বাবুল বলেন, ‘ফসলি জমি উজার করে যত্রতত্র ব্যাঙের ছাতার মতো ইটভাটা গজিয়ে উঠেছে। এর বেশিরভাগের মালিক রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়ায় আছে। কিন্তু প্রশাসনের সঠিক তদারকি ও আইনের যথাযথ প্রয়োগ না থাকায় একদিকে যেমন বন্ধ হচ্ছে না শিশু শ্রম, তেমনি সবুজ পরিবেশ ও ফসলি জমির ঘটছে ব্যাপক বিপর্যয়।’

বাংলাদেশ মানবাধিকার বাস্তবায়ন সংস্থা কুমিল্লা শাখার সভাপতি অ্যাডভোকেট নাজমুল আলম চৌধুরী বলেন, শ্রম আইন অনুযায়ী কোনো ব্যক্তি কোনো শিশু বা কিশোরকে চাকরিতে নিযুক্ত করলে তিনি দণ্ডনীয় হবেন। কিন্তু ইটভাটা কিংবা অধিকাংশ কারখানা ও হোটেল রেস্তোরাঁর মালিক এ আইন প্রতিপালন করছেন না এবং এ ব্যাপারে প্রশাসনিকভাবে কঠোর তদারকী প্রয়োজন।

কুমিল্লা সিভিল সার্জন ডা. মুজিবুর রহমান বলেন, ‘ইটভাটায় দীর্ঘসময় কাজ করার ফলে বিষাক্ত ধোঁয়া ও ধুলাবালিতে ত্বক ও নখ নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি রক্তস্বল্পতা, অ্যাজমা, হাঁপানি, ব্রঙ্কাইটিস রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। তাই শ্রমিকদের থাকা-খাওয়ার পরিবেশ রক্ষায় সংশ্লিষ্ট সকলের সতর্ক থাকা বাঞ্ছনীয়।’

কুমিল্লা পরিবেশ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক ছামছুল আলম বলেন, ‘ইটভাটায় শিশু শ্রমিক দিয়ে কাজ করানো এবং অনুমোদন না নিয়ে কেউ ইটভাটা পরিচালনা করলে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। এরই মধ্যে জেলার বিভিন্ন এলাকায় ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনাসহ নানা পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে।’

কুমিল্লা জেলা প্রশাসক মোঃ আবুল ফজল মীর বলেন, ‘ইট প্রস্তুত ও ভাটা স্থাপন (নিয়ন্ত্রণ) আইন অমান্য করে নবায়নবিহীন ও অবৈধভাবে ইটভাটা পরিচালনা, শিশু শ্রমিক দিয়ে ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করানো, ভাটাগুলোয় শ্রমিকদের থাকা ও কাজের পরিবেশ তদারকীর জন্য স্থানীয় প্রশাসনকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। বেশ কয়েকটি ভাটায় ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে জরিমানা আদায় করা হয়েছে। এ অভিযান অব্যাহত থাকবে।’