বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য একেবারে শুরুতেই বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে বিনিয়োগ নীতিমালা। বিদ্যুত্-জ্বালানি আর অবকাঠামোর দুর্বলতা তো আছেই, তারপরও বাংলাদেশে সরাসরি বৈদেশিক বিনিয়োগ (এফডিআই) করতে আগ্রহীদের মুখোমুখি হতে হচ্ছে নানা জাটিলতার। শিল্পনীতি, বিনিয়োগ বোর্ড আর বিনিয়োগ নীতিমালার নানা অস্পষ্টতার ফলেই হোঁচট খেতে হচ্ছে বিনিয়োগকারীদের। পরিবর্তনশীল আগামী বিশ্বের উদীয়মান ১১টি দেশের তালিকায় রয়েছে বাংলাদেশ। আর সরকারের লক্ষ্য ২০২১ সালের আগেই মধ্য আয়ের দেশে উন্নীত হওয়া। সেজন্য প্রয়োজন বড় বৈদেশিক বিনিয়োগ; কিন্তু এদেশের মোট দেশজ আয়ের (জিডিপি) তুলনায় মাত্র ১ শতাংশ হারে বৈদেশিক বিনিয়োগ আসছে যা দক্ষিণ এশিয়ার অন্য দেশগুলোর চেয়ে অনেক কম। বাংলাদেশে সরাসরি বৈদেশিক বিনিয়োগ পরিস্থিতি নিয়ে এক গবেষণা প্রতিবেদনে এসব কথা উল্লেখ করেছে জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগী সংস্থা (জাইকা)।
‘প্রিপারেটরি স্টাডি ফর দ্যা ফরেন ডিরেক্ট ইনভেস্ট প্রজেক্ট ইন পিপলস রিপাবলিক অব বাংলাদেশ’ শিরোনামে বাংলাদেশের বিনিয়োগ পরিস্থিতি, বিভিন্ন নীতিমালা বিশ্লেষণসহ বিনিয়োগ সম্ভাবনা নিয়ে বিস্তারিত তুলে ধরা হয়েছে প্রতিবেদনে।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, শতভাগ বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের পরিবেশ বাংলাদেশের রয়েছে; কিন্তু বাস্তবতা অনেক ভিন্ন। ব্যবসায়িক কার্যক্রমের সহজীকরণ সূচকে দেখ যায় আসিয়ানভুক্ত দেশগুলোর চেয়ে বাংলাদেশ অনেক পিছিয়ে রয়েছে। বিশেষ করে থাইল্যান্ড ও ভিয়েতনাম থেকেও বাংলাদেশের ব্যবসায়িক সুবিধা অনেক কম। বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণে সবচেয়ে বড় সুযোগ হচ্ছে কর্পোরেট ট্যাক্স হার; কিন্তু আসিয়ানভুক্ত দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশে কর্পোরেট ট্যাক্সের পরিমাণ অনেক বেশি। তাছাড়া নতুন বিনিয়োগের জন্য কর রেয়াত সুবিধাও স্বল্পমেয়াদে দেয়া হচ্ছে। উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে শ্রীলংকা, থাইল্যান্ড, ভিয়েতনামে ন্যূনতম কর্পোরেট ট্যাক্স হলো ১০ শতাংশ যেখানে বাংলাদেশে ন্যূনতম এ হার সাড়ে ২৭ শতাংশ। প্রতিবেশি অন্য দেশগুলোতে ব্যবসা শুরু করলে কোন প্রতিষ্ঠানকে কয়েক বছর কর রেয়াত সুবিধা দেয়া হয় যা বাংলাদেশে কয়েক ধাপে কম সময়ের জন্য দেয়া হয়।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ১৯৮০ সালেই ফরেন ইনভেস্টমেন্ট প্রমোশন এন্ড প্রটেকশন অ্যাক্ট জারি করা হয়। এর আর্টিকেল ৩ অনুযায়ী, যেসব শিল্প উত্পাদন ব্যবস্থা বাংলাদেশে নেই অথচ প্রয়োজন, সেসব খাতে বিদেশি বিনিয়োগকে স্বাগত জানানো হবে। জাইকার প্রতিবেদনে এ বিষয়টিকে অস্বচ্ছ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এই অ্যাক্ট এ আরো উল্লেখ রয়েছে, দেশে সামাজিক প্রয়োজন রয়েছে অথচ চাহিদার তুলনায় অপ্রতুল—এমন শিল্প খাতে বিদেশি বিনিয়োগে উত্সাহ ও সহায়তা প্রদান করা হবে। জাইকার প্রতিবেদন অনুযায়ী, এখানে কোন ধরনের শিল্প বাংলাদেশে প্রয়োজন বা সামাজিক প্রয়োজন তার সুস্পষ্ট নির্দেশনা নেই।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সাবেক চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ আবদুল মজিদ ইত্তেফাককে বলেন, নীতিমালার কিছু অস্পষ্টতার ফলে এর কাঙ্ক্ষিত সুফল মিলছে না। ’৮০র দশকে শ্রমঘন শিল্পের প্রতি গুরুত্ব দেয়া হলেও দেখা গেছে ’৯০-এর দশকে বিশ্ব প্রযুক্তি নির্ভর উত্পাদনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। আমাদের দেশে বৈদেশিক বিনিয়োগের অনেক সুযোগ রয়েছে। বিনিয়োগে বাধা কাটাতে এর সাথে সংশ্লিষ্ট বিনিয়োগ বোর্ড, শিল্প নীতিসহ অন্যান্য নীতিমালার সমন্বয় জরুরি বলে তিনি মনে করেন।
জাইকার প্রতিবেদন বিশ্লেষণে দেখা যায়, বাংলাদেশে ব্যবসায়িক পরিবেশের জন্য নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুত্ সরবরাহ না থাকাকে সবচেয়ে বড় সমস্যা বলে উল্লেখ করা হয়েছে। একই সাথে ভূমি নিবন্ধন, কর প্রদান, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও চুক্তির বাস্তবায়নে সমস্যা রয়েছে। বাংলাদেশে বিনিয়োগ উত্সাহিত করতে আর্থিক সুবিধার পাশাপাশি অন্যান্য সুবিধা যেমন ওয়ান স্টপ সার্ভিস সুবিধা দেয়া জরুরি। যদিও বিনিয়োগ বোর্ডে এ সুবিধা চালু রয়েছে। এরপরও বিনিয়োগ, বাণিজ্য, কর, ওয়ার্ক পারমিট, ভিসা সুবিধার মতো বিষয়গুলো ওয়ান স্টপ সার্ভিস সুবিধার আওতায় আসা প্রয়োজন। আসিয়ানভুক্ত দেশগুলো দীর্ঘমেয়াদে কর্পোরেট ট্যাক্স রেয়াত সুবিধা দিচ্ছে। সেই সুবিধার তুলনায় বাংলাদেশের কর্পোরেট ট্যাক্স রেয়াদ সুবিধা অনেক কম। বিশেষ করে মিয়ানমারে বিনিয়োগ সুবিধা বাংলাদেশের চেয়ে উন্নত।
অন্যদিকে বিনিয়োগ বোর্ড অ্যাক্ট ১৯৮৯ অনুযায়ী সকল বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানকে বিনিয়োগ বোর্ড থেকে নিবন্ধন নেয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে; কিন্তু এ বিভাগ বিনিয়োগকারীদের সকল সুবিধা দিতে পারে না। জাতীয় শিল্পনীতির সাথেও বিনিয়োগ বোর্ডের দূরত্ব রয়েছে। সংরক্ষিত শিল্প এবং নিয়ন্ত্রিত শিল্প জাতীয় শিল্পনীতির বিষয়গুলো স্পষ্ট নয়। বাংলাদেশে এফডিআই আকর্ষণ করতে হলে প্রতিবেশি দেশগুলোর মতো সুযোগ সুবিধা দেয়া প্রয়োজন বলে উল্লেখ করা হয়েছে প্রতিবেদনে। শুধু কর সংক্রান্ত নীতির সহজীকরণ নয়, এর জন্য অন্যান্য সুবিধার বিষয়গুলোর উন্নতি করা প্রয়োজন। সরকারের লক্ষ্য অনুযায়ী ২০২১ সালের মধ্যে মধ্য-আয়ের দেশে উন্নীত হতে হলে বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। এর জন্য প্রয়োজনে শিল্পখাতের উত্পাদনে ভিন্নতা আনতে হবে, সেই সাথে শিল্প উন্নয়নে নীতিমালা যথাযথ বাস্তবায়ন করতে হবে। দেশের কারিগরি দক্ষতার উন্নতি করতে হবে।
