ঈদের ছুটিতে কুয়াকাটা

আপডেট : ১৪ জুলাই ২০১৫, ১৬:১৮
 
ভ্রমণের জন্য নির্দিষ্ট কোনো দিন কিংবা মৌসুম নেই। প্রকৃতির সাথে করতে চাইলে বছরের যেকোনো সময়ই তা সম্ভব। কিন্তু এই গরমের মৌসুমে কোথায় যাওয়া যায়? খানিকটা ভাবতেই নয়নাভিরাম সমুদ্র সৈকত কুয়াকাটার কথা মনে পড়ল। স্টিমার ঘাটের পাশের বাসিন্দা হওয়ায় হুট করে টিকেট কাটতে ঝামেলা হলো না। রাত ৯টায় সদরঘাট থেকে বরিশালের পথে লঞ্চ ছেড়ে যায়। কেবিনের অবস্থা মোটামুটি মানের। সরাসরি কুয়াকাটার লঞ্চ না থাকায় প্রথমে যাব বরিশাল। সঠিক সময় পৌঁছলে নামব সকালে। কেবিনে ট্র্যাভেল ব্যাগ রেখে ছাদে গিয়ে উঠি। সেখানেও প্রচুর মানুষ গাদাগাদি করে বসে আছে। আগামী দুই দিন ছুটি, তাই অনেকেই ভ্রমণে বের হয়েছে। ধারণ ক্ষমতার চাইতে লঞ্চে মানুষের সংখ্যা বেশি। বুড়িগঙ্গা পার হয়ে শীতলক্ষ্যা নদীতে যেতেই আচমকা ঝড়ো হাওয়া শুরু হয়, সেই সাথে গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি। কেবিনে চলে এলাম। অর্ডার দেওয়া ভাত, তরকারি খাচ্ছি আর মনে মনে ভাবছি এই বুঝি শেষ খাওয়া। ঝড় এলেই লঞ্চ ডুবে—এমন সংবাদের সাথে এই দেশবাসীর রয়েছে খুবই পরিচিতি। ঝড় থামলে, ঘুমের রাজ্যে হারিয়ে যাই। এক ঘুমেই সকাল ৬টায় বরিশাল লঞ্চ ঘাট। সকালে টয়লেট ব্যবহার করতে গিয়ে এক অন্যরকম অভিজ্ঞতা হয়। নারী, শিশু, বৃদ্ধ আর পুরুষের বিশাল সিরিয়াল। কী আর করা, যেতেই যখন হবে। লঞ্চ ঘাটের পাশে এক রেস্টুরেন্টে পেট পুরে সকালের নাশতা খেয়ে পটুয়াখালিগামী বাস স্ট্যান্ডে যাই। স্ট্যান্ডের লোকজন জিজ্ঞাসা করে, সিটিং বাসে নাকি লোকালে যাবেন। বললাম সিটিং বাসে। সিটিংয়ে গিয়ে বসি। এটা যে একটু পরেই চিটিংয়ে পরিণত হবে সেটা বসার পরপরই আন্দাজ করতে পারি। গাড়ি একটু পর পর থেমে থেমে লোক উঠায় আর নামায়, সাথে বকরি, ভেড়া, হাঁস, মুরগি। কপাল ভালো বাছুর-গরু তুলেনি! পটুয়াখালি পৌঁছার পর কুয়াকাটার বাসে চড়ি। সে আরেক কাহিনি। কুয়াকাটায় পৌঁছে হোটেল খোঁজার ঝামেলা পোহাতে হয়নি। আগেই কুয়াকাটা গেস্ট হাউসে রুম ঠিক করা ছিল। রুমে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে সোজা বিচে—ওয়াও! এত সুন্দর সি-বিচ। পাশেই নারকেল বিথি। কক্সবাজারের মতো ততটা উত্তাল নয়, তবে মোহনীয়। আছড়ে পড়া ফেনা তোলা ঢেউ মনে শিহরণ জাগায়। নিরিবিলি বেলাভূমি প্রেয়সীর জন্য পদ্য লেখার কথাই মনে করিয়ে দেয়। কচি ডাবের পানি পান করে ঝাঁপিয়ে পড়ি সাগরের নোনা জলে। ঢেউয়ের সাথে মিতালি করে দীর্ঘ সময় কাটাই। সাইক্লোন সেল্টারের উপর থেকে কুয়াকাটার প্রকৃতির এক অন্যরকম দৃশ্য চোখে পড়ে। এবার যাচ্ছি কুয়া দেখতে, যেই কুয়ার জন্যই এই এলাকার নাম হয়েছে কুয়াকাটা। এই কুয়ার রয়েছে সমৃদ্ধ ইতিহাস। কুয়ার পাশেই রয়েছে দেশের সবচেয়ে বড় বৌদ্ধ মন্দির। আদিবাসী রাখাইনদের সঙ্গে আলাপচারিতায় জানা হলো অনেক কিছু। রাতের খাবার খেয়ে রুমে ঘুমের প্রস্তুতি নিলাম। উঠতে হবে শেষ রাতে, গঙ্গামাতির তীরে যাব সূর্যোদয় দেখতে। গেস্ট হাউসের স্বত্বাধিকারী মাতলুব শরিফ যাওয়ার জন্য মোটর বাইক রেডি করে রেখেছেন। ভোর সাড়ে ৪টায় বাইক চালক এসে হাজির। ফজরের নামাজ পড়েই ছুটে চলা, বেলাভূমি পেরিয়ে গঙ্গামাতির দিকে। সাগরের বিশুদ্ধ হাওয়া, লাল কাঁকড়ার দৌড়ে চলা, পাখ-পাখালির কল-কাকলি শুনতে শুনতে উপস্থিত হই। একসময় পূর্ব দিগন্ত রক্তিম করে সূর্য উঁকি দেয়। কী অদ্ভুত সুন্দর! অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকি, ভাগ্য সুপ্রসন্ন তাই আকাশ পরিষ্কার ছিল। সূর্যোদয়ের পুরোটা সময় হাজির ছিলাম। সত্যি বলতে কি, কুয়াকাটার সূর্যোদয়ের মনোরম দৃশ্য আমার কাছে দার্জিলিংয়ের টাইগার হিলের চাইতেও অনেক বেশি অপার্থিব সুন্দর লেগেছে। কুয়াকাটা এমন একটি সৈকত যেখানে এক স্থানেই দাঁড়িয়ে সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত উপভোগ করা যায়। অথচ আমরা দুর্ভাগা জাতি প্রকৃতির এই দানকে যথোপযুক্তভাবে ব্যবহার করতে পারছি না। নাস্তা পর্ব শেষে এবার যাচ্ছি ভ্যানে চেপে লেম্বুর বন। মাঝে শুঁটকি পল্লি, জেলে পল্লিতে বিরতি। গভীর সাগর থেকে ধরে আনা পাঁচ মন ওজনের খটক মাছ দেখা হলো, গন্ধ নেওয়া হলো বিভিন্ন প্রজাতির মাছের শুঁটকির। শাপলা মাছটিকে দৃষ্টি নন্দন লেগেছে। ফাতরার বনে অসংখ্য কাঁটা ভেদ করে ভেতরে প্রবেশ করি। দারুণ রোমাঞ্চকর লেগেছে। পাখির কলতান শুকনো পাতার মর মর শব্দ, বানরের বাঁদরামি দারুণ উপভোগ করেছি। এবার যাচ্ছি রাখাইনদের প্রতিষ্ঠিত শপিং সেন্টারে। দোকানের অধিকাংশ বিক্রেতাই রাখাইন তরুণী। এরপর আবারও সমুদ্র স্নান, বিকেলে সূর্যাস্ত দেখার প্ল্যান। বেলাভূমিতে হাঁটতে হাঁটতে পশ্চিম দিকে তাকিয়ে আছি। হঠাত্ দেখা হলো ঢাকার এক জোড়া কপোত-কপোতির সাথে। তাদের সাথে কুশলাদি বিনিময় করতে করতেই সূর্য লাল আভা ছড়িয়ে সেদিনের মতো ডুব দিল। পরের দিন সকালে ঢাকা ফিরব। তাই গভীর রাত পর্যন্ত সৈকতে পাতা স্লিপিং চেয়ারে বসে সময় কাটালাম। ভাব জমালাম অথৈ জল আর আকাশের তারার সাথে। পর্যটকদের নিরাপত্তার কোনো কমতি ছিল না, ছিল না উটকো হকারদের উত্পাত।
 
 
 
 
 
যোগাযোগ
 
গাবতলী ও সায়েদাবাদ থেকে বিভিন্ন পরিবহনের বাস সার্ভিস রয়েছে। এছাড়া সদর ঘাট নৌ টার্মিনাল থেকে বরিশাল অথবা পটুয়াখালির জাহাজে করে গিয়ে সেখান থেকে বাসে কুয়াকাটা যাওয়া যায়।
 
 
 
আবাসিক হোটেল
 
রাতে থাকার জন্য পর্যটন কর্পোরেশনের মোটেল, কুয়াকাটা গেস্ট হাউসসহ বেশকিছু বেসরকারি কটেজ, বোর্ডিং, হোটেল রয়েছে। তিন দিনের জন্য জনপ্রতি চার হাজার টাকা হলেই যথেষ্ট।