সরকারি সংগ্রহ বাড়লেও লাভ নেই ক্ষুদ্র কৃষকের

আপডেট : ০৪ মার্চ ২০১৯, ২২:৩৮

অভ্যন্তরীণ বাজার থেকে আরো ১ লক্ষ টন সিদ্ধ চাল সংগ্রহের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এ নিয়ে আমন মৌসুমে মোট ৮ লক্ষ টন সিদ্ধ চাল সংগ্রহ করা হবে। কিন্তু সরকারি সংগ্রহের পরিমান বাড়ালেও লাভ নেই ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের। বাজারে এর কোন প্রভাব নেই। সাধারণত: মৌসুমের সময় ধানের দাম তুলনামূলক কম থাকলেও পরে দাম বাড়ে। এবার তাও হয়নি। উল্টো মৌসুমের চেয়েও এখন ধানের দাম কম।

সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, ধান-চাল সংগ্রহ অভিযানের অন্যতম যে উদ্দেশ্য (বাজার স্থিতিশীল রেখে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক চাষীদের কষ্টার্জিত ফসলের নায্যমূল্য নিশ্চিত করা) তা পূরণ হচ্ছে কিনা সেটা খতিয়ে দেখা উচিত। সংগ্রহ নীতিমালায় কৃষকের স্বার্থ আদৌ রক্ষা হচ্ছে কিনা সেই প্রশ্ন উঠছে ঘুরেফিরে।

বর্তমানে দেশের উত্তরাঞ্চলের হাটবাজারে প্রতিমণ স্বর্ণা-৫ জাতের ধান ৬৩০ থেকে ৬৮০ টাকা, রনজিত ৬৭০ থেকে ৬৯০ টাকা ও বিআর-৪৯ জাতের ধান ৬৬০ থেকে ৭০০ টাকা দরে কেনাবেচা হচ্ছে। অর্থাত্ প্রতি কেজি ধান বিক্রি হচ্ছে (সর্বোচ্চ ৭০০ টাকা ধরে) ১৮ টাকা ৯২ পয়সায়। অথচ কৃষি মন্ত্রণালয়ের হিসেবে এবার প্রতি কেজি আমন ধানের উত্পাদন ব্যয় নির্ধারন করা হয়েছে ২৫ টাকা ৩০ পয়সা। এই হিসেবে কেজিপ্রতি ধানে কৃষকের লোকসান হচ্ছে ৬ টাকার বেশী।

সংশ্লিষ্টরা জানান, আমন মৌসুমে পর্যাপ্ত বৃষ্টি না হওয়ায় বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই সেচের ওপর নির্ভর করতে হয়েছে। ফলে বিঘা প্রতি উত্পাদন খরচ বেড়েছে ৩ থেকে ৪ হাজার টাকা। সেইসাথে বেড়েছে শ্রমিকের মজুরি। কিন্তু সে অনুপাতে বাড়েনি ধানের দাম। এছাড়া সরকার কৃষকের কাছ থেকে সরাসরি ধান না কিনে ব্যবসায়ীদের কাছে থেকে চাল কিনছে। ফলে অভ্যন্তরীণ বাজার থেকে সরকারের চাল সংগ্রহ অভিযানের কোন সুফল পাচ্ছে না কৃষক। সংগ্রহ অভিযান চালকল মালিক নির্ভর হওয়ায় তারাই লাভবান হন।

খাদ্য মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, ধান গুদামে রাখার জন্য যে পরিমান শুষ্ক থাকা প্রয়োজন। কৃষকরা সেভাবে ধান সরবরাহ করতে পারেন না। এটি কৃষকদের কাছে থেকে সরাসরি ধান কেনার ক্ষেত্রে একটি বড় বাধা। তবে কৃষকদের সাথে সরাসরি আলোচনার মাধ্যমে এ সমস্যার সমাধান করা সম্ভব। এক্ষেত্রে প্রয়োজন উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত। ২০০৬ সালের জাতীয় খাদ্য নীতিতেও অতিরিক্ত উত্স হিসেবে উন্মুক্ত প্রতিযোগিতামূলক দরপত্রের মাধ্যমে অভ্যন্তরীণ বাজার থেকে খাদ্যশস্য সংগ্রেহর নির্দেশনা রয়েছে।

১৯৯৬ সালের কৃষিশুমারি অনুযায়ী ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক, মাঝারি ও বড় কৃষকের সংখ্যা যথাক্রমে ৭৯ দশমিক ৮৭ শতাংশ, ১৭ দশমিক ৬১ ও ২ দশমিক ৫২ শতাংশ। ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক চাষীরা মহাজনের কাছ থেকে চড়া সুদে ঋণ করে ফসল ফলান। তারা ফসল ওঠার সাথে সাথে তা বিক্রি করে দেন। এ সময় যদি তাদের কষ্টার্জিত ফসল যদি সরকার নায্যদামে সংগ্রহ করে তাহলে তারা উপকৃত হবে।

শেরপুর (বগুড়া) সংবাদদাতা আব্দুল মান্নান ভূঁইয়া জানান, বগুড়ার শেরপুরে ধানের দাম অব্যাহতভাবে পড়ে যাওয়ায় কৃষকরা হতাশ হয়ে পড়েছেন। চলতি বোরোর উত্পাদন খরচ মেটাতে কম দামে ধান বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন তাঁরা। ধুনট উপজেলার বিশ্বহরিগাছা গ্রামের কৃষক শহিদুল ইসলাম জানান, দেড়/দুই মাসের ব্যবধানে প্রতিমণ ধানের দাম প্রায় ১০০ টাকা থেকে ১২০ টাকা পর্যন্ত কমে গেছে। শেরপুর উপজেলাসহ উত্তরাঞ্চলের বাজারে বর্তমানে প্রতিমণ স্বর্ণা-৫ জাতের ধান ৬৩০-৬৮০টাকা, রনজিত ৬৭০-৬৯০টাকা ও বিআর-৪৯জাতের ধান ৬৬০-৭০০ টাকা দরে কেনাবেচা হচ্ছে।

রায়গঞ্জ ( সিরাজগঞ্জ) সংবাদদাতা দীপক কুমার কর জানান, উপজেলার ধান ব্যবসায়ী মিলার আব্দুর রউফ সরকার ইত্তেফাককে বলেন, সরকার অভ্যন্তরীণ বাজার থেকে অতিরিক্ত আরো যে ১ লক্ষ টন সিদ্ধ চাল কেনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তাতে বাজারে তেমন কোন প্রভাব পড়বে না। কারণ, এতে মিল প্রতি ১ থেকে ২ টন চাল বরাদ্দ পাবে। অথচ মিলারদের কাছে এরচেয়ে বেশী পরিমান চাল সবসময় মজুত থাকে।

এ প্রসঙ্গে খাদ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আরিফুর রহমান অপু গতকাল ইত্তেফাক বলেন, এ সমস্যার সমাধানে কৃষকদের কাছ থেকে সরাসরি ধান কিনতে হবে। তবে গুদামে রাখতে ধান একটি নির্দিষ্ট পরিমান শুস্ক থাকা প্রয়োজন। আমাদের কৃষকরা এই শুস্ক ধান দিতে পারেন না। তবে ইতিমধ্যে বিষয়টি নিয়ে উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সাথে কথা হয়েছে। যদি আমরা কয়েকটি সাইলো নির্মাণ করতে পারি তাতে কৃষকরা যে ধানই দিক না কেন তা আমরা শুকিয়ে তারপর গুদামে রাখলাম। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমরা যদি কৃষকদের কাছ থেকে সরাসরি ১০ লক্ষ টন ধান কিনতে পারি তাহলে বাজারে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।