স্বজনদের জন্য দীর্ঘ প্রতীক্ষা আর চোখের জলে নিঃসঙ্গ অবস্থায় এবারও ঈদের দিন কাটলেন গাজীপুরের বয়স্ক পুনর্বাসন কেন্দ্রের নিবাসীরা। তারা ঈদে পেয়েছেন নতুন কাপড় আর ভাল খাবার। কিন্তু অধিকাংশের সময় কেটেছে স্বজনদের সাক্ষাতের প্রতীক্ষায়।
বেশ কয়েকজন নিবাসী তাদের স্বজনদের নানা স্মৃতির কথা স্মরণ করে আবেগ-আপ্লুত হয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েছেন। অনেকে আবার নিজের পরিবার, স্বামী বা স্ত্রী ও সন্তানদের কথা স্বরণ করে চোখের জলে বুক ভাসিয়েছেন। আবার কেউ কেউ চরম দুঃখে ও ক্ষোভে স্বজনদের কথা ও নামও বলতে চাননি।
ঈদের পর দিন রবিবার দুপুরে গাজীপুর সদর উপজেলার মনিপুর বিকেবাড়ি এলাকায় অবস্থিত গিভেন্সী গ্রুপের পরিচালনাধীন বয়স্ক পুনর্বাসন কেন্দ্রে গিয়ে বৃদ্ধ নিবাসীদের কথা বলে এসব করুণ কাহিনী জানা যায়।
কেন্দ্রের নিবাসী এসএম জামান (৭০) জানান, একসময় তিনি ঢাকা কোর্টের দলিল লেখক ছিলেন। তার বাড়ি কুমিল্লার মেঘনা থানার চরকাঠালিয়া গ্রামে।
তিনি জানান, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে তার বড় ছেলে স্বামীম ভান্ডারি তাকে এই কেন্দ্রে রেখে গেছেন। তার দুই ছেলে ও এক মেয়ে আছে। ২০০৭ সালে তার স্ত্রী মারা যায়। তার ছেলেরা বেকার। ঘর বাড়া নিয়ে তারা থাকেন। পিতাকে ভরণ পোষণ করার সঙ্গতি নেই তাদের। এজন্য তার ছেলে তাকে এখানে রেখে গেছেন।
জামানের আশা ছিল অন্তত ঈদের দিন ছেলেরা তাকে দেখতে আসবে। কিন্ু্ত তার সে আশা পূরণ হয়নি। ঈদের দিনের প্রতিটি মূহুর্ত কেটেছে প্রতীক্ষার প্রহর গুনে।
গত ৫/৬ মাস পূর্বে বয়স্ক পুনর্বাসন কেন্দ্রে নিবাসী হয়ে আসেন আলী হোসেন (৭২)। তিনি ঢাকার দোহার থানার সুতারপাড়া এলাকার বাসিন্দা। তার এক ছেলে ও তিন মেয়ে রয়েছে। মেয়েদের বিয়ে হয়ে গেছে। একমাত্র ছেলে রবিউল তাকে এই কেন্দ্র দিয়ে গেছে। ঈদে সন্তানদের জন্য অপেক্ষা করলেও থাকলেও শেষ পর্যন্ত কারো দেখা পাননি।
কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলার রিফাইতপুর গ্রামের জিয়ার রহমান (৬২)। এক সময় তিনি ব্যবসা করে সংসার চালাতেন। তার দুই সংসারে তিন মেয়ে ও এক ছেলে। প্রথম পক্ষে দুই মেয়ে এবং দ্বিতীয় পক্ষে এক ছেলে এবং এক মেয়ে। এখন কাজ করতে পারেন না বলে কেউ তার খোঁজ নেন না। এক বন্ধুর মাধ্যমে ২০/২৫ দিন আগে তিনি এ কেন্দ্রে আসেন। আশা করেছিলাম ঈদে হয়ত ছেলে-মেয়েরা কেউ দেখতে আসবে। কিন্ত শেষ পর্যন্ত কেউ আসেনি। এটাই শুধু আক্ষেপ।
তিনি জানান, ঈদের দিন কেন্দ্রের কর্তৃপক্ষ থেকে নতুন পাঞ্জাবি ও লুঙ্গি দিয়েছেন। দেয়া হয়েছিল বিশেষ খাবারও।
প্রায় এক বছর এ কেন্দ্রে আসেন শয়িরতপুরের আব্দুল কাদেরের স্ত্রী ময়না বিবি (৮৫)। স্বামী মারা গেছে প্রায় ২০ বছর আগে। তার তিন ছেলে ও দুই মেয়ে আছে। বড় ছেলে আব্দুল কদ্দুস সৌদী প্রবাসী, অপর দুই ছেলে তোতা মিয়া এবং দুলাল গার্মেন্টসে চাতরি করেন। মেয়েদের বিয়ে হয়ে গেছে। কোন ছেলেই তার ভরণ পোষণ করতে চায় না। তাই তিনি একা একাই এখানে চলে এসেছেন।
মাঝে মধ্যে ছেলে মেয়েরা দেখা করতে আসে। ঈদে কেউ দেখা করতে এসেছিল কি-না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ঈদের পর দিন রবিবার আসার কথা ছিল। তবে কেউ আসেনি।
তিনি বলেন, এই কেন্দ্রের একটি রুমে একত্রে তারা ১০ জন থাকেন। এরাই এখন তার আত্মীয়।
চট্টগ্রামের সন্দীপ এলাকার আব্দুল মান্নান মাস্টারের স্ত্রী মনোয়ারা বেগম (৭৫)। তিনি প্রায় ১১ বছর যাবৎ এই কেন্দ্রের নিবাসী। তিনি জানান, প্রায় ২০ বছর আগে স্বামী মারা গেছেন। তার কোন সন্তান নেই। তারা এক ভাই এক বোন। স্বামী মারা যাওয়ার পর তিনি ভাই আব্দুল আজিজের সঙ্গে নারায়নগঞ্জের পঞ্চবটি এলাকায় বসবাস করতেন। ভাইটি মারা পর তিনি স্বামীর বাড়ি চট্টগ্রামের সন্দীপ চলে যান। সেখানে প্রায় এক মাস অবস্থান করলেও স্বামীর স্বজনরা তার কোন খোঁজ খবর নিতো না। পরে তিনি ময়মনসিংহের তারাইল থানার শিমুলহাটি গ্রামে বাপের বাড়িতে চলে আসেন। সেখানেও ঠাঁই না হওয়ায় এই কেন্দ্রে আসেন। এরকম অনেকের ঈদ কেটেছে স্বজনদের জন্য প্রহর গুনে।
বয়স্ক পুনর্বাসন কেন্দ্রের তত্ত্বাবধায়ক আবু শরীফ জানান, কেন্দ্রটিতে এক হাজার লোকের পুনর্বাসনের সক্ষমতা রয়েছে। এই কেন্দ্রে বর্তমানে ১৯৩ জন বৃদ্ধ-বৃদ্ধা রয়েছেন। এবারের ঈদে ৬০ জন ১০ দিনের ছুটিতে নিয়ে তাদের স্বজনদের সঙ্গে ঈদ উদযাপন করতে গেছেন।
