ওদের পরিবারে এখনও নিরব কান্না। চার বছর পরও শোকের ছায়া কাটেনি। ক্ষোভ-হতাশা আর উদ্বেগ-উত্কণ্ঠায় সময় পার করছেন আমিনবাজারের নিহত ছয় ছাত্রের স্বজনরা। মনের অজান্তেই প্রিয় সন্তানকে এখনও খুঁজে ফিরছেন বাবা-মায়। সন্তানহারা বেদনা কোনো ভাবেই যেন পিছু ছাড়ছে না। মা-বাবাসহ স্বজনদের এই চাপাকষ্ট আরো কয়েকগুন বেড়ে যায় যখন, বছর ঘুরে চলে আসে এই দিন। বিনা অপরাধে ‘ডাকাত’ বলে মিথ্যা তথ্য দিয়ে পিটিয়ে হত্যা করার বিষয়টি স্বজনরা মনে করলেই গুমরে কেঁদে ওঠেন। এভাবে কেন পিটিয়ে হত্যা করা হলো এবং এর নেপথ্যে কারা জড়িত- সে বিষয়ে এখনও জট খুলছে না। এ ঘটনায় গ্রেফতার ২৩ জনের সকলেই জামিনে ছাড়া পেয়েছেন। চার্জশিটভুক্ত আসামিরা এখন স্বজনদের হুমকি দিচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
২০১১ সালের ১৭ জুলাই রাতে (শবেবরাতের রাত) রাজধানীর উপকণ্ঠ আমিনবাজারের বড়দেশি গ্রামে পিটিয়ে হত্যা করা হয় ছয় ছাত্রকে। সেখানকার স্থানীয় মাদক ব্যবসায়ীদের নেতৃত্বে বেশ কিছু লোকজন ছাত্রদের ডাকাত বলে মিথ্যা গুজব ছড়িয়ে নৃসংশভাবে মারপিট করে। এতে ছয়ছাত্র ঘটনাস্থলেই নির্মমভাবে মারা যান। গুরুতর আহত হয়ে কোনো রকমে প্রাণে বেঁচে যান আল-আমিন নামে নিহতদের এক বন্ধু। নিহতরা হলেন- ম্যাপল লিফের ‘এ’ লেভেলের ছাত্র শামস রহিম শাম্মাম (১৮), মিরপুর সরকারি বাঙলা কলেজের স্নাতক পর্যায়ের ছাত্র তৌহিদুর রহমান পলাশ (২০), ইব্রাহিম খলিল (২১) একই কলেজের একাদশ শ্রেণীর কামরুজ্জামান কান্ত (১৬), তেজগাঁও কলেজের টিপু সুলতান (১৯), বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব বিজনেস অ্যান্ড টেকনোলজির (বিইউবিটি) বিবিএ দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র সিতাব জাবির মুনিব (২০)। এরা পরস্পরের বন্ধু ছিলেন।
কান্ত’র বাবা সুরুজ মিয়া বলেন, এই মামলায় ভিকটিমদের পরিবারের পক্ষ থেকে কেউ আদালতে সাক্ষী দিতে পারেনি। পরে আদালতে খোঁজ নিয়ে জানা যায়- সাক্ষী দেয়ার বিষয়ে আদালতের নির্দেশনাপত্র দারুস সালাম থানায় পাঠানো হয়। থানায় খোঁজ নিয়ে জানা যায়, এসআই মেহেদী হাসান আদালতের ঐ নির্দেশনা ভিকটিমদের পরিবারের কারো কাছে পৌঁছে দেননি। তিনি আদালতকে জানিয়ে দেন, ভিকটিমদের পরিবারের কাউকে খুঁজে পাওয়া যায়নি। এ ঘটনার তিনি আদালতে গিয়ে সাক্ষী প্রদানের অনুমতি চাইলে আগামী ২৭ জুলাই তার সাক্ষী প্রদানের দিন ধার্য করা হয়। আদালত কান্ত’র বাবা আব্দুল কাদের সুরুজ মিয়া, ইব্রাহিমের মা বিউটি বেগম, টিপু সুলতানের বাবা আব্দুর রশিদ, সিতাব জাবির মুনিবের বাবা আমিনুল ইসলাম চন্দন, বেঁচে যাওয়া আল আমিন ও তার বাবাকে সাক্ষী প্রদানের অনুমতি দেয়।
নিহতদের একাধিক স্বজনের অভিযোগ, মামলার চার্জশিটে ঘটনার সঙ্গে জড়িত অন্যতম কয়েকজনকে বাদ দেয়া হয়েছে। সে কারণে নিহতের স্বজনরা চার্জশিটের বিরুদ্ধে ‘না রাজি’ দিয়েছেন। কিন্তু আদালত সেটি আমলে নেয়নি। স্বজনদের মতে, ছয়-সাতজন প্রভাবশালীকে মামলা থেকে বাদ দেয়া হয়েছে। প্রকৃত আসামির সংখ্যা হওয়ার কথা ২০-২৫ জন। কিন্তু মামলা দুর্বল করতে চার্জশিটে ৬০ জনের নাম দেয়া হয়েছে। এই ৬০ জনের মধ্যে অনেকেই বৃদ্ধ ও প্রতিবন্ধী।
স্বজনরা আরো অভিযোগ করেন, ঘটনার মূলহোতা স্থানীয় মাদক ব্যবসায়ী আবদুল মালেক, আবদুল হামিদ, অখিল, ইসমাইল হোসেন রেফু, শাহীনসহ চার্জশিটভুক্ত আসামিরা হুমকি দিয়ে যাচ্ছে। বারবার আসামিরা নিহতের স্বজনদের আদালতে না যাওযার জন্য ভয়-ভীতি প্রদর্শন করছেন। ঐ ঘটনায় বেঁচে যাওয়া আল-আমিন এখনও জখমের চিহ্ন বয়ে বেড়াচ্ছেন। একমাত্র জীবন্ত সাক্ষী হওয়ায় তাকে ও তার বাবাকে হুমকি দিয়ে যাচ্ছে আসামি পক্ষ।