একদিনে ঝরল ২৯ প্রাণ

আপডেট : ২৩ জুলাই ২০১৫, ২৩:২৮

পরিবারের সঙ্গে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করতে নির্বিঘ্নে বাড়ি ফিরেছিলেন ওরা সবাই। কিন্তু কর্মস্থল ঢাকায় ফিরতে অনেককেই প্রাণ দিতে হচ্ছে। ঈদের পরে গত কয়েকদিনে সড়ক দুর্ঘটনা বেশ বেড়ে গেছে। শুধুমাত্র গতকাল বৃহস্পতিবার একদিনেই ঝরে গেল ২৯ প্রাণ। অনেকেই বলছেন, সড়কপথ যেন এখন মৃত্যু ফাঁদে পরিণত হয়েছে।

 
গতকাল গাজীপুরে একই পরিবারের ৭ জনসহ ৮ জন, টাঙ্গাইলে ৮ জন, সিলেটে শিশুসহ ৪ জন, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, মুন্সিগঞ্জ, কুমিল্লা ও মাগুরায় দুই জন করে এবং নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জে একটি শিশু মারা গেছে। কোথাও ডেমু ট্রেনের সঙ্গে অটোরিকশার ধাক্কা, আবার কোথাও নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে বাস পড়েছে খাদে। আবার মোটরসাইকেল নিয়ে আরোহীই পড়েছেন খাদে। এছাড়া কুষ্টিয়া ও ভোলায় সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হয়েছেন আরো ৩৭ জন।
 
হাইওয়ে পুলিশের ডিআইজি মল্লিক ফখরুল ইসলাম ইত্তেফাককে বলেন, ‘বৃহস্পতিবার যে ঘটনাগুলো ঘটেছে সেগুলো চালকের বেপরোয়া গতি ও অসতর্কতার কারণে। এগুলোর একটিও মুখোমুখি ঘটনার কারণে ঘটেনি।’ তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেন, ‘বৃহস্পতিবার বিকালেই ঢাকা-চট্টগ্রাম সড়কের ইলিয়টগঞ্জ এলাকায় আমার সামনেই একটি ট্রাক উল্টে খাদে পড়ে গেল। এগুলো আমরা কিভাবে প্রতিরোধ করব। চালকদের সতর্ক হতে হবে।’
 
আমাদের গাজীপুর প্রতিনিধি জানান, ঈদের ছুটি শেষে অটোরিকশায় বাসায় ফেরার পথে গাজীপুরের একটি অরক্ষিত রেল ক্রসিংয়ে ডেমু ট্রেনের ধাক্কায় তিন শিশুসহ আটজনের মৃত্যু হয়েছে। এদের মধ্যে ৭ জন একই পরিবারের। আর অন্যজন অটোরিকশা চালক। বেলা পৌনে ৩টার দিকে ধীরাশ্রম স্টেশনের দক্ষিণ দিকে হায়দরাবাদ এলাকায় এই দুর্ঘটনা ঘটে।
 
প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাত দিয়ে ওসি রেজাউল হাসান রেজা বলেন, যাত্রী নিয়ে অটোরিকশাটি রেললাইন পার হওয়ার সময় ইঞ্জিন বন্ধ হয়ে যায়। এ সময় ঢাকা থেকে গাজীপুরগামী ডেমু ট্রেনের ধাক্কায় ঘটনাস্থলেই আট আরোহীর মৃত্যু হয়। ট্রেনের ধাক্কা লাগার পর অটোরিকশাটি ট্রেনের ইঞ্জিনের সঙ্গে আটকে যায়। ওই অবস্থায় ট্রেনটি অটোরিকশাটিকে ছেঁচড়ে প্রায় আধা কিলোমিটার দূরে গিয়ে থামে বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান।
 
নিহতরা হলেন- শাহ আলম (২৭), তার স্ত্রী পিয়ারা বেগম (২১), তাদের ছেলে ইয়াসির (৪) ও মেয়ে সাদিয়া (৬), পিয়ারার বোন সফুরা (১২), শাহ আলমের মামাতো ভাই তুর্ণ (২৪), চাচাতো ভাই আল আমীন (২৮) এবং অটোরিকশার চালক মোস্তাফা (২০)।
 
জয়দেবপুর রেলওয়ে জংশন পুলিশ ফাঁড়ির এএসআই দাদন মিয়া জানান, ওই ক্রসিংয়ে কোনো প্রতিবন্ধক সংকেতের ব্যবস্থা ছিল না। নিহত শাহ আলমের আরেক মামাতো ভাই ইউসুফ আলী, যিনি ঘটনাস্থলের কাছে বোর্ডবাজার এলাকায় থাকেন। তিনি বলেন, শাহ আলমের বাড়ি নরসিংদী সদরের জিতরামপুর গ্রামে। সেখানে ঈদ করে স্ত্রী-সন্তান ও ভাইদের নিয়ে বোর্ডবাজারে খাইলপুর এলাকায় বাসায় ফিরছিলেন তারা।
 
আমাদের টাঙ্গাইল প্রতিনিধি ও বাসাইল সংবাদদাতা জানান, টাঙ্গাইল-ঢাকা মহাসড়কের বাসাইল উপজেলার পাটখাগুড়িতে একটি বাস খাদে পড়ে গেলে একজন মহিলাসহ আটজন যাত্রী নিহত ও অন্তত ২০ জন আহত হয়েছেন। বেলা তিনটার দিকে এই দুর্ঘটনা ঘটে। আহত ১৬ জনকে টাঙ্গাইল মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। বাস চালক ও হেলপারের ভাগ্যে কি ঘটেছে তা জানা যায়নি। দুর্ঘটনার পর মহাসড়কের দু’পাশে অন্তত ২০ কিলোমিটার যানজটের সৃষ্টি হয়। দু’ঘন্টা পর তা স্বাভাবিক হয়ে আসে।
 
হাইওয়ে পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) হুমায়ুন কবির জানান, টাঙ্গাইলের ধনবাড়ি উপজেলা থেকে ছেড়ে আসা ঢাকাগামী বিনিময় পরিবহনের বাসটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে পার্শ্ববর্তী খাদে পড়ে যায়। ঘটনাস্থলেই আটজন নিহত হন। দুর্ঘটনার শব্দ ও বাসটির যাত্রীদের চিত্কারে আশপাশের লোকজন ও পথচারীরা এগিয়ে গিয়ে উদ্ধার কাজে অংশ নেন। পরে পুলিশ ও দমকল বাহিনী তাদের সাথে যোগ দেয়। নিহতদের মধ্যে দুজনের পরিচয় পাওয়া গেছে। তারা হলেন— জামালপুরের সরিষাবাড়ি উপজেলার চরগোপালদীঘি গ্রামের রফিকুল ইসলামের ছেলে জাকির হোসেন (২৩) ও টাঙ্গাইলের মধুপুরের বেলায়েত হোসেনের ছেলে খোয়াজ আলী (৪০)।
 
আমাদের ওসমানীনগর (সিলেট) সংবাদদাতা জানান, সিলেটের ওসমানীনগরে একটি বাস নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে  পুকুরে পড়ে ৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। নিহতদের মধ্যে দুই নারী, এক পুরুষ ও একটি শিশু রয়েছে। নিহতদের মধ্যে দুই মহিলার পরিচয় পাওয়া গেলেও ক্ষত-বিক্ষত থাকায় পুরুষ লাশটির পরিচয় এখনও সনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। নিহতরা হলেন— হবিগঞ্জ সদর উপজেলার নোয়াগাঁও গ্রামের সুজিনা বেগম (৩৫) ও মুন্নি বেগম (৪০)। শিশু মেহেদী হাসান শাওনের (৪) ও তার বাবা মইন উদ্দিন। বাড়ি হবিগঞ্জের নওগাঁ। দুর্ঘটনায় প্রায় ৩৫ জন আহত হয়েছে। তাদের ১২ জনকে সিলেট ওসমানী হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
 
ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের উপজেলার ব্রাহ্মণ গ্রাম নামক স্থানে বেলা সাড়ে ১২টায় ব্রাহ্মণবাড়িয়ার যুগান্তর পরিবহনের সিলেটগামী বাস নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে পুকুরে পড়ে যাওয়ায় এ দুর্ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় বৃহস্পতিবার সাড়ে ১২টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত মহাসড়কের এ অংশে যান চলাচল বন্ধ থাকায় যাত্রী সাধারণ চরম দুর্ভোগের স্বীকার হন।
 
আমাদের ব্রাহ্মণবাড়ীয়া সংবাদদাতা জানান, সরাইল উপজেলায় বাসচাপায় সিএনজিচালিত অটোরিকশার দুই যাত্রী নিহত হয়েছেন। উপজেলার ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের ইসলামাবাদ নামক স্থানে গতকাল সকাল ১০টার দিকে এ দুর্ঘটনা ঘটে। নিহতরা হলেন— ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর উপজেলার ঘাটুরা এলাকার দরবেশ আলী (৩৭) ও হবিগঞ্জের মাধবপুর উপজেলার ধর্মগর এলাকার ব্রাহ্মণবাড়িয়া সরকারি কলেজের অনার্স দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র ইনজামামুল হক (২৫)। এই ঘটনায় আহত হয়েছেন আরও তিনজন।
 
আমাদের মুন্সীগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, দুপুরে ঢাকা-মাওয়া মহাসড়কে দুই মোটরসাইকেল আরোহী নিহত হয়েছেন। সন্ধ্যা পর্যন্ত তাদের পরিচয় জানা যায়নি। তাদের কোন স্বজনও খোঁজ নিতে হাসপাতালে যাননি।
 
আমাদের মাগুরা সংবাদদাতা জানান, মাগুরা-ফরিদপুর মহাসড়কের কছুন্দী এলাকায় বাসের চাপায় মোটরসাইকেলের দুই আরোহী নিহত হয়েছেন। গতকাল বিকালে এ দুর্ঘটনা ঘটে। নিহতরা হলেন- ফরিদপুরের মধুখালী উপজেলার সীতারামপুর গ্রামের একরাম হোসেনের ছেলে শামছুর রহমান শামীম (২৫) ও একই এলাকার গাড়াখোলা গ্রামের কুরবান আলীর ছেলে ওবাইদুর (২৭)। মাগুরা হাইওয়ে পুলিশের উপ-পরিদর্শক (এসআই) কুমারেশ চন্দ্র জানান, বিকালে ফরিদপুর থেকে মাগুরাগামী একটি মোটরসাইকেলকে কছুন্দী এলাকায় বিপরীতমুখী একটি বাস চাপা দেয়। এতে ঘটনাস্থলেই আরোহী শামীম ও ওবাইদুরের মৃত্যু হয়।
 
আমাদের সিদ্ধিরগঞ্জ সংবাদদাতা জানান, সিদ্ধিরগঞ্জে সড়ক দুর্ঘটনায় ৭ বছরের শিশু শফিউদ্দিনের মৃত্যু হয়েছে। ঘটনাটি ঘটেছে সকালে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের শিমরাইল মোড়ে। ঈদ উত্সব শেষে গ্রাম থেকে দুই শিশু পুত্রকে নিয়ে সিদ্ধিরগঞ্জে পৌঁছে বাস থেকে নামলে এ ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় পুলিশ হেলপারসহ কাভার্ডভ্যান আটক করলেও চালক পালিয়ে যায়। জানা যায়, কুমিল্লার বুড়িচং থানার পাচুরা গ্রাম থেকে ঈদ পালন শেষে তাহমিনা বেগম দুই শিশুসহ সিদ্ধিরগঞ্জের শিমরাইল মোড়ে বাস থেকে নেমে রাস্তা পার হচ্ছিল। এ সময় ঢাকাগামী বাপ্পী পরিবহনের কাভার্ডভ্যান শিশু শফিউদ্দিনকে চাপা দিলে ঘটনাস্থলেই সে মারা যায়।
 
কুমিল্লা প্রতিনিধি জানান, কুমিল্লায় ঢাকাগামী কর্ণফুলী এক্সপ্রেস ট্রেনের ধাক্কায় সিএনজি অটোরিকশা চালকসহ ২ জন নিহত হয়েছেন। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় কুমিল্লার সদর দক্ষিণ উপজেলার জেলখানা বাড়ি রেল ক্রসিং এলাকায় এ দুর্ঘটনা ঘটে।
 
লাকসাম জংশন রেলওয়ে থানার ওসি আহসান হাবিব জানান, সদর দক্ষিণ উপজেলার টঙ্গিরপাড় গ্রামের মমিনুল ইসলামের পুত্র অটোরিকশা চালক আবুল খায়ের (৩২) এবং অটোরিকশা যাত্রী একই গ্রামের আবদুর রশিদের পুত্র মাসুদ রানা (২৮) মারা যান।
 

কুষ্টিয়ার খোকসায় নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে সড়কের পাশের গাছের সঙ্গে ধাক্কা লেগে পদ্মা-গড়াই বাসের চালকসহ অন্তত ৩০ জন আহত হয়েছেন। তাদের মধ্যে কয়েকজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। খোকসা উপজেলার শিমুলিয়া বাজারের পাশে গতকাল সকালে এ দুর্ঘটনা ঘটে। এছাড়া ভোলার বোরহানউদ্দিন উপজেলার মনিরাম এলাকায় একটি ট্রাক ও যাত্রীবাহী বাসের মুখোমুখি সংঘর্ষে সাতজন আহত হয়েছেন। গতকাল দুপুর আড়াইটার দিকে এই দুর্ঘটনা ঘটে।