অরক্ষিত চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল। চিকিত্সা নিতে আসা রোগীরা নিত্য হয়রানি ও দুর্ভোগের শিকার হচ্ছেন। ওয়ার্ড থেকেই রোগীর ব্যবহার্য জিনিসপত্র চুরি হচ্ছে। হাসপাতালের অভ্যন্তরে রোগীর নিরাপত্তা, পরিচ্ছন্নতা ও সেবার জন্য সরকারি, অবৈতনিক ও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান থেকে নেয়া জনবলসহ ৮২১ জন কর্মরত রয়েছেন। দায়িত্ব পালন ও বণ্টনে সমন্বয়হীনতায় হাসপাতালের নিরাপত্তা ও সেবা কার্যক্রম বিঘ্নিত হওয়ার অভিযোগ উঠেছে। অন্যদিকে হাসপাতালের ৮১ একর জায়গার মধ্যে বিপুল পরিমাণ জায়গা বেহাত হয়ে গেছে। কর্তৃপক্ষের দাবি এসব জায়গা রক্ষণাবেক্ষণে পর্যাপ্ত জনবল নেই।
এ প্রসঙ্গে হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল খোন্দকার শহীদুল গণি ইত্তেফাককে বলেন, ‘অপরাধের সঙ্গে সরকারি-বেসরকারি যারাই জড়িত থাকুক রিপোর্ট পেলেই ব্যবস্থা নিয়ে থাকি। ৮১ একর জায়গার উপর চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল অবস্থিত। তিন শিফটের জন্য কমপক্ষে ৬০০ নিরাপত্তা কর্মীর প্রয়োজন। আর আমাদের রয়েছে মাত্র ২২ জন নিরাপত্তা কর্মী। হাসপাতাল এলাকার নিরাপত্তার জন্য ১০০ জন আনসার চেয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠিয়েছি।’
চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর ডা. সেলিম মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর চমেক হাসপাতালের বিপুল পরিমাণ জায়গা অবৈধ দখলে চলে গেছে দাবি করে বলেন, ‘এলএ সার্ভে করে সীমানা নির্ধারণের জন্য জেলা প্রশাসনকে অনেক আগেই বলা হয়েছে। কিন্তু তাদের কোন সাড়া পাওয়া যাচ্ছে না। মেডিক্যাল কলেজটির বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরের প্রক্রিয়া চলছে। এটি বাস্তবায়ন করতে আমাদের প্রচুর জায়গার প্রয়োজন হবে। ফলে হাসপাতালের বৈধ জায়গাগুলো সংরক্ষণ জরুরি হয়ে পড়েছে।’
গত ১৫ জুলাই চট্টগ্রাম মেডিক্যালের ৩৪নং ওয়ার্ড থেকে এক নবজাতক চুরি হয়ে যায়। এ ঘটনায় সন্দেহজনক হিসাবে বেসরকারি নিরাপত্তা কর্মী সুজন দত্ত ও তার স্ত্রী রিনা দে’কে আটক করা হয়েছে। কিন্তু এখনো পর্যন্ত চুরি হওয়া বাচ্চা উদ্ধার হয়নি। এ চুরির ঘটনার পর হাসপাতালের অভ্যন্তরে নিরাপত্তা নিয়ে রোগীরা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন। কর্তৃপক্ষকে নিরাপত্তার বিষয়টি নতুন করে ভাবনায় ফেলেছে।
চট্টগ্রাম অঞ্চলের বিশাল জনগোষ্ঠীর জন্য সরকারিভাবে একমাত্র উন্নত চিকিত্সা কেন্দ্র চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল। ৪০টি ওয়ার্ডে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ২ হাজার রোগী চিকিত্সাধীন থাকেন। এছাড়া ২০টি আউটডোরে প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে অসংখ্য রোগী চিকিত্সা নিতে আসেন। সাধারণত অন্যত্র চিকিত্সা লাভে ব্যর্থ হয়ে উন্নত চিকিত্সার জন্য জটিল রোগীরা এই হাসপাতালে চিকিত্সা নিতে আসে। রোগী ও স্বজনরা জানান, প্রয়োজনের চেয়ে বাড়তি চিকিত্সক থাকায় চিকিত্সা পেতে তেমন সমস্যা হয় না। কিন্তু রোগীরা সেবা কার্যক্রম নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। টাকা ছাড়া সেবা মেলে না।
হাসপাতাল সূত্র জানায়, নিরাপত্তা, পরিচ্ছন্নতা ও সেবা কার্যক্রমের সঙ্গে জড়িত রয়েছেন ৮২১ জন। এদের মধ্যে কর্তৃপক্ষের নিজস্ব জনবল রয়েছে ৪২১ জন। আর বাকিরা বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে নিয়োগপ্রাপ্ত। ৬৩ জন নিরাপত্তা কর্মীর মধ্যে ৪২ জন বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে নেয়া। ১৫৮ জন পরিচ্ছন্ন কর্মী ও ২০০ জন স্পেশাল আয়ার মধ্যে সবই বেসরকারিভাবে নিয়োগপ্রাপ্ত। হাসপাতালে সরকারিভাবে নিয়োগপ্রাপ্ত চতুর্থ শ্রেণির ৫১২ জন কর্মচারীর মধ্যে সুইপার রয়েছে ১৫৫ জন ও এমএলএসএস রয়েছে ২৬০ জন। এরপরও হাসপাতালের কর্মকর্তা, চিকিত্সক ও পরিচ্ছন্নতার কাজে নিয়োজিত রয়েছে বেসরকারি কোম্পানি থেকে নেয়া লোকজন। বেসরকারিভাবে নিয়োগপ্রাপ্ত লোকের কারণে হাসপাতালের অভ্যন্তরে রোগীর জিনিসপত্র চুরি ও হয়রানি বেড়েছে বলে কর্তৃপক্ষের একাধিক কর্মকর্তা অভিযোগ করেছেন।
হাসপাতালে সরকারিভাবে নিয়োগপ্রাপ্ত বিপুল পরিমাণ চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী থাকলেও তাদের দায়িত্ব পালনে দেখা মিলে না। এ প্রসঙ্গে চতুর্থ শ্রেণি কর্মচারী ইউনিয়নের সভাপতি রতন আলী বলেন, ‘অবৈতনিক ও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের লোকের কারণে হাসপাতালে অপরাধ বাড়ছে। কর্তৃপক্ষ তাদের দিয়ে সেবা কার্যক্রম চালাচ্ছে। স্থায়ী লোকেরা এসব অপরাধের সাথে জড়িত নয়।’
হাসপাতালের কার্যক্রম প্রত্যক্ষ ও অপরাধ প্রতিরোধে ৫৭টি ক্লোজড সার্কিট ক্যামেরা বসানো হয়েছে। এর মধ্যে অধিকাংশই নষ্ট। কর্তৃপক্ষের দাবি অপরাধের সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা অনেক ক্ষেত্রে এসব ক্যামেরা নষ্ট করে দিচ্ছে। তাত্ক্ষণিকভাবে এগুলো মেরামত সম্ভব হয় না।