বহুজাতিক অর্থ লগ্নিকারী প্রতিষ্ঠান আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) কর্মকাণ্ডের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। পরিবর্তিত বিশ্ব পরিস্থিতিতে প্রতিষ্ঠানটির কাঠামো এবং কার্যক্রমে পরিবর্তন আনার পক্ষেও মত দিয়েছেন আইএমএফের সাবেক শীর্ষ কর্মকর্তারা। বিশেষ করে চীনের নেতৃত্বে সম্প্রতি এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক (এআইআইবি) যাত্রা শুরু করার পর আইএমএফের ভবিষ্যত্ নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন তারা। ছোট-বড় মিলে এআইআইবিতে ইতোমধ্যে ৫৬টি দেশ যোগ দিয়েছে। ইউরোপের নেতৃত্বে থাকা আইএমএফের ভূমিকা নিয়ে ব্রিটিশ গণমাধ্যম বিবিসি বিস্তারিত প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। বিবিসির রিপোর্টে বলা হয়, গ্রিসের অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলায় আইএমএফ যে পথ নিয়েছে তাতে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে নেতিবাচক মনোভাবই গড়ে উঠছে।
উল্লেখ্য, ১৯৪৪ সালে ব্রিটন উডস্ সম্মেলনের মাধ্যমে আইএমএফ এবং বিশ্বব্যাংক প্রতিষ্ঠা করা হয়। তখনই সিদ্ধান্ত নেয়া হয়, আইএমএফের প্রধান হবেন ইউরোপের কোনো দেশ থেকে। আর বিশ্বব্যাংকের প্রধান হবেন যুক্তরাষ্ট্র থেকে। বিবিসির রিপোর্টে বলা হয়, প্রতিষ্ঠার পর থেকে বিশ্বব্যাংক এবং আইএমএফ বিশ্ব অর্থনীতিতে কোনো কোনো সময় গুরুত্বপূর্ণ আবার কোনো কোনো সময় নেতিবাচক সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
আইএমএফের প্রথম উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক ডেভিড লিপটন বিবিসিকে বলেছেন, আইএমএফের পরিচালন ব্যবস্থা সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে আধুনিকীকরণ করতে হবে। বিশ্ব অর্থনীতিতে এখন আর সনাতনী ব্যবস্থা চালানোর সুযোগ নেই বলে তার অভিমত। তিনি বলেন, বিশ্ব অর্থনীতিতে চীনসহ অনেক দেশ এগিয়ে গেছে। আইএমএফের সক্ষমতা বাড়াতে ওই দেশগুলোকে কাজে লাগানো যেতে পারে।
বিবিসির রিপোর্টে বলা হয়, দেশগুলো যখন সংকটে পড়ে তখনই আইএমএফ নানা শর্তের বেড়াজালে তাদের আবদ্ধ করে। বিশেষ করে ১৯৯৭ এবং ১৯৯৮ সালে পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর অর্থনৈতিক সংকট কাটিয়ে উঠতে আইএমএফ যে ঋণ সহায়তা দিয়েছিল তা ছিল নানা শর্তযুক্ত। গত তিন যুগ ধরে আফ্রিকার দেশগুলোতে আইএমএফ এ কর্মকাণ্ড চালিয়ে আসছে। ইউরোপের দেশগুলোর ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম নেই। ২০১০ সালে আয়ারল্যান্ড, ২০১১ সালে পর্তুগাল এবং বর্তমানে গ্রিসের বেলায়ও তারা নানা শর্ত আরোপ করছে। তবে গ্রিসের বেলায় খুব একটা সুবিধা করতে পারেনি আইএমএফ। প্রতিষ্ঠানটির নানা শর্তের বিষয়ে দেশটির ভেতর থেকেই প্রতিবাদের ঝড় উঠেছে।
প্রসঙ্গত ঋণ দেয়ার সময় আইএমএফ সাধারণত যে শর্ত দেয় সেগুলো হচ্ছে—সরকারের ব্যয় কমিয়ে আনা, কর ব্যবস্থার আমূল সংস্কার, পেনশন ব্যবস্থার সংস্কার এবং দুর্নীতি দমন। এসব করতে গিয়ে সরকারগুলো নিজ দেশেই বন্ধুহীন হয়ে পড়ে। বর্তমানে আইএমএফের এসব শর্তের ব্যাপক সমালোচনা হচ্ছে।
হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক এবং আইএমএফের সাবেক অর্থনীতিবিদ কেনেথ রুগফ বলেছেন, ইউরোপের লোক ছাড়া আইএমএফ চলতে পারে না—এমন ধারণা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। এটি আইএমএফের জন্য বড় সমস্যা। প্রয়োজনবোধে ১৯৪৪ সালে তৈরি করা নিয়ম পাল্টানোর পক্ষেও তিনি। এর থেকে এক ধাপ এগিয়ে অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক এবং বিশ্ব শাসন ব্যবস্থা বিষয়ক বিশ্লেষক ন্যাগারি উডস। তিনি বলেন, উদ্যোক্তারা আইএমএফকে একেবারে প্রান্তিক পর্যায়ে নিয়ে গেছেন।
এদিকে ব্রাজিল, ভারত, চীন, রাশিয়া এবং দক্ষিণ আফ্রিকার উদ্যোগে কিছুদিন আগে প্রতিষ্ঠা পাওয়া ব্রিকস ব্যাংক আইএমএফের জন্য কিছুটা সমস্যা তৈরি করতে পারে বলেও মনে করা হচ্ছে। বিশ্বব্যাংকের ঋণ পরিচালন ব্যবস্থার সাথে ব্রিকসের সামঞ্জস্য আছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
চীনের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা এশিয়ার ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক ইতোমধ্যে তাদের গ্লোবাল ডেভেলপমেন্ট ফান্ড ঘোষণা করেছে। এতে যুক্তরাষ্ট্র যোগ না দিলেও জার্মানি, ফ্রান্স এবং যুক্তরাজ্য যোগ দিতে পারে। আইএমএফের সাবেক উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক ডেভিড লিপটন বলেন, দেশগুলো হয়তো আইএমএফকে পরিত্যাগ করবে না। কিন্তু নানা দিকের ঘটনাবলিই বলে দিচ্ছে প্রতিষ্ঠানটির ভবিষ্যত্ হয়তো হুমকির মধ্যে রয়েছে।
