আইনস্টাইনের স্রষ্টা ও ধর্ম ভাবনা

আপডেট : ৩১ জুলাই ২০১৫, ০১:১৯

একজন বিজ্ঞানী তার চিন্তাশক্তি এবং মস্তিষ্কজাত গবেষণার মাধ্যমে যখন কোন আবিষ্কারের সিদ্ধান্তে উপনীত হন, তখন তা’ সত্য ও বাস্তব বলে বিবেচিত হয়। আর একজন ধর্মবিদ যখন একই প্রক্রিয়ায় মস্তিষ্কজাত এবং তত্সঙ্গে হূদয়জাত ধর্ম গবেষণার মাধ্যমে বিশ্বাসে ও সিদ্ধান্তে উপনীত হন, তখন তা’ সত্য ও বাস্তব বলে বিবেচিত হবে না-এর কোন যৌক্তিকতা নেই। মানুষের জ্ঞান-বুদ্ধি ও বিবেচনার ক্ষেত্রে কতগুলো পর্যায় আছে। ধর্ম পর্যায়ে এসে বিজ্ঞানী আর আধ্যাত্মিক বিজ্ঞানী দু’পর্যায়ে দু’পথে চলে যান। ধর্ম আধ্যাত্মিকতার চূড়ান্ত পর্যায়ে বিজ্ঞানী পৌঁছতে পারেন না। সকল অদেখাকে রহস্যময় বা অবিশ্বাস্য ভাবার চেতনা যুক্তিসিদ্ধ ও বাস্তবসিদ্ধ নয়। দর্শনের চরম রূপকে অগ্রাহ্য করার প্রবণতা বিজ্ঞানীদের জ্ঞান ও বুদ্ধি চর্চার তথা ধর্ম দার্শনিকতাকে অবহেলারই এক আত্মঘাতী প্রবণতা ছাড়া আর কিছু নয়।

 
বিখ্যাত দার্শনিক ও বৈজ্ঞানিক আলবার্ট আইনস্টাইন তাঁর “আমার দৃষ্টিতে জগত্” শীর্ষক প্রবন্ধের শেষ দিকে স্রষ্টা ও ধর্ম সম্পর্কে কিছু মতামত দিয়েছেন। তাঁর এই প্রবন্ধটির ইংরেজি নাম ‘The world I see it’. ‘Ideas and Opinions’ নামক গ্রন্থে এই প্রবন্ধটি অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। সঞ্জা বার্গম্যানের অনূদিত গ্রন্থ থেকে এ ব্যাপারে সম্যক ধারণা পাওয়া যায়। {তথ্যসূত্র: বিজয় শাশ্বত (স্মরণিকা), শিক্ষা মন্ত্রণালয়, ডিসেম্বর ২০১৪} প্রথমে তাঁর যুক্তিনিষ্ঠ কিছু বাণী তুলে ধরতে চাই; “আমরা মরণশীল! কী অদ্ভুত আমাদের ভাগ্য! আমরা প্রত্যেকে এখানে স্বল্প সময়ের অতিথি। আমরা কেউ জানি কেন আমাদের এখানে আগমন। ...গভীর চিন্তায় না গিয়েও প্রতিদিনের জীবন যাত্রার অভিজ্ঞতা থেকে আমরা বুঝে থাকি যে, আমরা একে অন্যের জন্য বাঁচি। ... সরল জীবনযাত্রার প্রতি আমার আকর্ষণ তীব্র এবং এ বোধ প্রায়ই আমাকে পীড়া দেয় যে, আমি আমারই মতো অন্য মানুষদের শ্রম অন্যায়ভাবে আত্মসাত্ করছি। শ্রেণি-বৈষম্যকে আমি অন্যায় মনে করি এবং শেষ বিশ্লেষণে দেখতে পাই, এ বৈষম্যের ভিত্তি শক্তি প্রয়োগ। আমি এও বিশ্বাস করি যে, সরল ও আড়ম্বরহীন জীবন প্রত্যেকের জন্যই শারীরিক ও মানসিকভাবে উভয় দিক দিয়েই ভালো।” চমত্কার বর্ণনা, যুক্তি ও বিশ্বাসে এবং সুপ্রতিক্রিয়ায় আমাদের আপ্লুত করে আইনস্টাইনের এসব অমিয় বাণী।
 
আইনস্টাইনের এসব বক্তব্যে কয়েকটি শব্দ ও বাক্যাংশ চয়ন ও প্রয়োগ তাত্পর্যপূর্ণ। যেমন: মরণশীল, ভাগ্য, স্বল্প সময়ের অতিথি, সরল জীবনযাত্রার প্রতি আকর্ষণ, অন্যায় মনে করি ইত্যাদি। এরপর উক্ত প্রবন্ধে আইনস্টাইন আরো লিখেন, “দার্শনিক অর্থে মানুষের স্বাধীনতায় আমি একটুও বিশ্বাস করি না। তবে মানুষ যে কোন বাইরের চাপে কাজ করে তা নয়, অন্তরের তাগিদেও সে কাজ করে। ‘মানুষ বাস্তবসম্মতভাবে যা খুশি তাই করার ইচ্ছা করতে পারে না, কিন্তু যতটুকু করার ইচ্ছা করতে পারে, তার মধ্যে সে যা করতে চায় তা করতে পারে’-শোপেন হাওয়ারের এ উক্তি তরুণ বয়স থেকেই আমার মনে প্রকৃত প্রেরণার উত্স হয়ে আছে।” বক্তব্যের এ অংশে মানুষের সীমাহীন স্বাধীনতায় অস্বীকৃতি, অন্তর তাগিদে কাজ করার কথা এবং ‘অন্তর’কে স্বীকৃতি দেয়া এবং মানুষ যা’ খুশি তা’ করার ইচ্ছায় অক্ষমতা এবং কিছু করতে পারার স্বীকৃতি ইত্যাদি লক্ষণীয়।
 
এবার আসা যাক, আইনস্টাইন ধর্ম ও স্রষ্টা সম্পর্কে সরাসরি কী বলেছেন উক্ত প্রবন্ধে। আইনস্টাইন লিখেন, “মধুরতম অনুভূতি আমরা লাভ করতে পারি রহস্য সন্ধানের কৌতূহল-সমৃদ্ধ অভিজ্ঞতা থেকে। প্রকৃত শিল্পকলা এবং প্রকৃত বিজ্ঞানের সূচনাবিন্দুতে থাকে রহস্য উদঘাটনের তীব্র আগ্রহ। এ আগ্রহ যার শেষ হয়ে যায়, যে আর বিস্মিত হয় না, কৌতূহলের আনন্দে কর্মচঞ্চল হয় না, সে মৃত-তার দৃষ্টিশক্তি নির্বাপিত। ধর্মের জন্ম দিয়েছে রহস্য সন্ধানের এ অভিজ্ঞতাই-সেক্ষেত্রে এ অভিজ্ঞতার মধ্যে ভয়ও যুক্ত থাকতে পারে। রহস্যময় অজানা কোনো কিছুর অস্তিত্ব সম্পর্কে জানার আগ্রহ আর গভীরতম যুক্তিবোধ ও দীপ্তিময় সৌন্দর্যবোধভিত্তিক আমাদের ইন্দ্রিয়লব্ধ তীব্র অনুভূতির আমরা আমাদের সত্তায় অনুভব করতে পারি তাদের আদি ও অবিকৃত রূপের মধ্যে। এ আগ্রহ ও অনুভূতি দ্বারাই গঠিত হয় প্রকৃত ধর্মবোধ। এ অর্থে এবং কেবল এ অর্থেই আমি গভীর ধর্মবোধসম্পন্ন মানুষ। আমি এমন কোনো ঈশ্বর কল্পনা করতে পারি না, যিনি তার সৃষ্ট জীবকে পুরস্কৃত করেন কিংবা শাস্তি দেন অথবা যিনি আমাদের ইচ্ছাশক্তির মতো কোনো প্রকার ইচ্ছাশক্তির অধিকারী। আমি কল্পনা করতে পারি না এবং কখনো কল্পনা করতে চাইও না যে, দৈহিক মৃত্যুর পরেও কোনো ব্যক্তির সত্তা বেঁচে থাকে। দুর্বল প্রকৃতির লোকেরা ভয় ও স্বার্থবোধ বশে এ ধরনের ধারণা পোষণ করতে পারে।”
 
মহান বিজ্ঞানীর এসব মন্তব্য ও প্রতিক্রিয়া থেকে বিশ্লেষণমূলক বিষয়গুলো হচ্ছে: প্রকৃতির অপার রহস্য সন্ধানের কৌতূহল থেকেই বিজ্ঞানের কৌতূহল। রহস্য সন্ধানের এ অভিজ্ঞতা থেকেই ধর্মের জন্ম বলে তিনি মনে করেন। ধর্মের এ অভিজ্ঞতায় ‘ভয়’ও যুক্ত থাকতে পারে। তিনি আরো বলেন, “আমাদের ইন্দ্রিয়লব্ধ তীব্র অনুভূতির আদি ও অবিকৃত রূপে আগ্রহ ও অনুভূতি দ্বারাই গঠিত হয় প্রকৃত ধর্মবোধ। শুধু এ অর্থেই তিনি গভীর ধর্মবোধসম্পন্ন মানুষ। কিন্তু এমন কোন ঈশ্বর কল্পনা করতে আইনস্টাইন নারাজ, যিনি তার সৃষ্ট জীবকে পুরস্কৃত করেন কিংবা শাস্তি দেন অথবা যিনি আমাদের ইচ্ছাশক্তির মতো কোনপ্রকার ইচ্ছাশক্তির অধিকারী। তাছাড়া দৈহিক মৃত্যুর পরেও কোন ব্যক্তির সত্তা বেঁচে থাকে- এতে তার কোন আস্থা নেই। (চলবে)
 

লেখক: কবি, সহকারী অধ্যাপক ও সাংবাদিক। সম্পাদক, মাসিক বাংলা আওয়াজ