চলতি ২০১৫-১৬ অর্থবছরের প্রথমার্ধের (জুলাই-ডিসেম্বর) মুদ্রানীতিতে অনুত্পাদনশীল খাতে ঋণের লাগাম টেনে ধরে উত্পাদনশীল খাতে বিনিয়োগের দিকে নজর দেয়ার কথা বলা হয়েছে। ঢালাওভাবে ঋণ বিতরণের পরিবর্তে মানসম্পন্ন ঋণ দেয়ার জন্য ব্যাংকগুলোকে নিতে হবে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ। আর ব্যাংকগুলোর নিজস্ব দক্ষতা বৃদ্ধির পাশাপাশি খেলাপী ঋণও কমাতে হবে। সেটা হলে ব্যাংক ঋণের সুদের হার কমে যাবে।
এদিকে বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হারে বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে। রফতানিকারকদের উত্সাহিত করতে ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়ন এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের পরিমাণও কমে আসার কথা বলা হয়েছে। এছাড়া রফতানিনির্ভর শিল্প, ক্ষুদ্র ও মাঝারি খাত, নারী উদ্যোক্তাসহ নির্দিষ্ট কিছু খাতে ব্যাপক অর্থ জোগানের ব্যবস্থা করা হয়েছে। সব মিলিয়ে এবারের মুদ্রানীতিতে আর্থিক খাতে গতি ফেরাতে বেশকিছু বিষয়ে সংস্কারের ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে। এসব ইঙ্গিতগুলো বাস্তবে রূপ দেয়া গেলে মূল্যস্ফীতিকে সংযত রেখে কাঙ্ক্ষিত প্রবৃদ্ধি অর্জন সহজ হয়ে যাবে। দেশের অর্থনীতি একটি টেকসই ভিত্তির উপর দাঁড়াবে।
গত বৃহস্পতিবার ঘোষণা করা মুদ্রানীতি বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বেসরকারী খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধির ঊর্ধ্বসীমা ডিসেম্বর পর্যন্ত ১৪ দশমিক ৩ এবং জুন’১৬ পর্যন্ত ১৫ শতাংশ ধরা হয়েছে। অথচ আগের মুদ্রানীতিতে বেসরকারি খাতে অভ্যন্তরীণ ঋণ প্রবৃদ্ধি জুন পর্যন্ত ১৫ দশমিক ৫ শতাংশ লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল। অবশ্য জুন পর্যন্ত ১৩ দশমিক ৬ শতাংশের মতো অর্জিত হতে পারে বলে বাংলাদেশ ব্যাংক মনে করছে। সে হিসাবে আগের প্রক্ষেপনের চেয়ে এবারের মুদ্রানীতিতে লক্ষ্যমাত্রা কমেছে। আর প্রকৃত প্রবৃদ্ধির চেয়ে কিছুটা বাড়িয়ে ধরা হয়েছে। অন্যদিকে এবারের মুদ্রানীতিতে অভ্যন্তরীণ ঋণ যোগানের প্রবৃদ্ধি ডিসেম্বর পর্যন্ত ৮ শতাংশ এবং ২০১৬ সালের জুন পর্যন্ত ২৩ দশমিক ৭ শতাংশ প্রক্ষেপন করা হয়েছে। যদিও গত অর্থবছরের দ্বিতীয়ার্ধের মুদ্রানীতিতে অভ্যন্তরীণ ঋণ যোগানের প্রবৃদ্ধি প্রক্ষেপিত ১৭ দশমিক ৪ শতাংশ ছিল। মে মাস পর্যন্ত প্রবৃদ্ধি ১০ দশমিক ৪ শতাংশ হয়েছে। জুনে তা কিছুটা বাড়লেও ১১ শতাংশের নিচে থাকবে বলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে। এ বিষয়ে মুদ্রানীতির ঘোষণায় বলা হয়েছে, উচ্চতর প্রবৃদ্ধির হার অর্জনের জন্য অভ্যন্তরীণ ঋণ যোগানের উচ্চ লক্ষ্যমাত্রা ধার্য করা প্রয়োজন বলে অনেক মহল ধারণা পোষণ করেন। কিন্তু অর্থনীতির প্রকৃত খাতে বিরাজমান ভৌত অবকাঠামোগত অপ্রতুলতা এবং অন্যান্য প্রতিবন্ধকতা নিরসন না করে, অপরিমিত তারল্যস্ফীতি আনা মোটেই প্রবৃদ্ধিবান্ধব হবে না। শুধুমাত্র অনুত্পাদনশীল, বেশি ঝুঁকিনির্ভর কর্মকান্ড উত্সাহিত করে, মূল্যস্ফীতি এবং সামাজিক বৈষম্য বৃদ্ধির ইন্ধন যোগাবে। এজন্য আমরা বিগত কয়েক বছর ধরে মুদ্রানীতিতে সংযত ও সতর্ক ভঙ্গি বজায় রেখে ঋণ যোগান প্রবৃদ্ধির পর্যাপ্ততার দিকে নজর রাখার পাশাপাশি মাত্রাতিরিক্ত স্ফীতি এড়িয়ে চলা হয়েছে। অর্থছাড়ে আরও সতর্ক ও সংযত হয়েছে।
মুদ্রানীততে ব্যাপক মুদ্রার প্রবৃদ্ধি বিগত অর্থবছরের ১৩ দশমিক ১ শতাংশের বিপরীতে ২০১৬ অর্থবছরের জন্য ১৫ দশমিক ৬ শতাংশে প্রাক্কলিত হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে রিজার্ভ মুদ্রা যোগানে আগের অর্থবছরের ১৪ দশমিক ৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধির বিপরীতে ২০১৬ অর্থবছরের জন্য প্রাক্কলিত প্রবৃদ্ধি ধরা হয়েছে ১৬ শতাংশ। দেশে বিনিয়োগ কার্যক্রম জোরদার হওয়ার ফলে ব্যাংকিং খাতের নীট বৈদেশিক সম্পদের প্রবৃদ্ধি আগের অর্থবছরের চেয়ে মন্থর হয়ে ৩ দশমিক ৩ শতাংশে দাঁড়াবে বলে বাংলাদেশ ব্যাংক মনে করে। বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভের বর্তমান বৃদ্ধি হারেও বেশ খানিকটা শিথিলতা আসবে বলে আশা করা হচ্ছে। বৈদেশিক লেনদেনের চলতি খাতের ঘাটতিও অভ্যন্তরীণ বিনিয়োগ জোরদার হওয়ার কারণে বৃদ্ধি পাবে, তবে জিডিপির দুই শতাংশের মতো মাত্রার প্রাক্কলিত ঘাটতি কোনো উদ্বেগের কারণ হবে না বলে মনে করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
অন্তর্ভুক্তিমূলক, পরিবেশবান্ধব অর্থায়নের পাশাপাশি ঋণের গুণগত মানের নজর দেয়ার বিষয়ে জোর দিচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এক্ষেত্রে ব্যাংকগুলোর খেলাপী ঋণ কমিয়ে আনার কথা বলা হচ্ছে। একইসঙ্গে তাদের দক্ষতা বাড়ানোর কথা বলা হচ্ছে। এদুটি বিষয় নিশ্চিত করতে পারলে স্বাভাবিকভাবেই ঋণের সুদের হার কমে আসবে। অন্যদিকে পয়েন্ট-টু-পয়েন্ট এবং খাদ্য ও জ্তালানি বহির্ভুত কোর মূল্যস্ফীতি নিম্নগামী হলে নীতি সুদহার অর্থাত্ রেপো, রিভার্স রেপো সুদহার সঙ্গতিপূর্ণ মাত্রায় নামিয়ে আনা হবে বলেও স্পষ্ট করেন গভর্নর ড. আতিউর রহমান।
আর্থিক খাতের উন্নয়নের জন্য ভূমিকা পালনকারী দেশের পুঁজিবাজারও স্থিতিশীল থাকা প্রয়োজন। তাই পুঁজিবাজারের স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে বাংলাদেশ ব্যাংকের সহায়ক ভূমিকা অব্যাহত থাকবে বলে মুদ্রানীতিতে ইঙ্গীত করা হয়েছে। মুদ্রানীতির ঘোষণায় বলা হয়েছে, ২০১০ সালের পুঁজিবাজারের ধ্বসের পর থেকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সহযোগিতার হাত প্রসারিত রয়েছে। এ খাতকে স্থিতিশীল রাখতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রয়োজনীয় সহযোগিতা ও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ থাকবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ঘোষিত মুদ্রানীতিতে বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হারে বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে। রফতানিকারকদের উত্সাহিত করতে ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়ন এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের পরিমাণও কমে আসার কথা বলা হয়েছে।
বর্তমানে অন্তর্ভুক্তিমূলক এসব অর্থায়ন উদ্যোগ এবং পরিবেশবান্ধব উত্পাদন প্রক্রিয়া অবলম্বন প্রকল্পের অর্থায়নের ব্যবস্থা করছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এ প্রক্রিয়া চালু থাকার পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ বাজারের সঞ্চয় যোগান বর্ধিত মাত্রায় সঞ্চালিত রফতানিনির্ভর শিল্প, মাইক্রো, ক্ষুদ্র ও মাঝারি খাত, নারী উদ্যোক্তাসহ নির্দিষ্ট কিছু খাতে ব্যাপক অর্থ জোগানের ব্যবস্থা করা হয়েছে। ৫০ কোটি ডলারের (প্রায় চার হাজার কোটি টাকা) দুটি তহবিল করার ঘোষণা দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। প্রথমটি হলো অভ্যন্তরীণ ও রপ্তানি উভয় বাজারের জন্য উত্পাদনমুখী প্রকল্পগুলোর মধ্য বা দীর্ঘমেয়াদি বৈদেশিক মুদ্রা অর্থায়নের জন্য। এটি বিশ্বব্যাংক থেকে আহরণ করা ৩০০ মিলিয়ন ডলারের একটি তহবিল। আর দ্বিতীয়টি হলো রপ্তানিমুখী বস্ত্র, পোশাক ও চামড়া শিল্পে পরিবেশবান্ধব উত্পাদন প্রক্রিয়া অবলম্বনের অর্থায়নের বিপরীতে বাংলাদেশ ব্যাংকের নিজস্ত সূত্রের ২০০ মিলিয়ন ডলার পুন:অর্থায়ন সহায়তা। যা নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য খুবই সহায়ক হবে।
নতুন অর্থবছরের মুদ্রানীতি কার্যক্রমের আওতায় অন্তর্ভুক্তিমূলক, পরিবেশবান্ধব অর্থায়ন উত্পাদনমুখী উদ্যোগমালায় দক্ষভাবে সঞ্চালনের লক্ষ্যে কিছু উদ্যোগের কথা বলা হয়েছে। এক্ষেত্রে আর্থিক খাতে ঋণ শৃঙ্খলা, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, কর্পোরেট সুশাসন ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে মুদ্রানীতিতে জোর দেয়া হয়েছে। অন্তর্ভুক্তিমূলক পরিবেশবান্ধব মুদ্রা ও আর্থিক নীতিভঙ্গিগুলোর ওপরও বিশেষভাবে গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।
মুদ্রানীতিতে দেয়া এসব ইঙ্গিত যদি বাস্তবরূপ লাভ করে তবে বাজেটে নেয়া লক্ষ্যমাত্রা অর্থাত্ দেশজ উত্পাদনে ৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন এবং ৬ দশমিক ২ শতাংশ মূল্যস্ফীতির মাত্রা ধরে রাখাটা কঠিন কাজ হবে না। তবে এবারের মুদ্রানীতিতে নেয়া এসব পদক্ষেপ কতটা কাজে দিবে আর সে অনুযায়ী লক্ষ্য পূরণ কতটা হবে সে বিষয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়।
