নিখোঁজই রয়ে গেলেন পিনাক লঞ্চের ৬১ যাত্রী

আপডেট : ০৪ আগস্ট ২০১৫, ০২:০৪

এক বছরেও পদ্মায় পিনাক-৬ লঞ্চ ডুবিতে ৬১ জন ‘নিখোঁজ’ই থেকে গেলেন। এদের মারা যাওয়া সংক্রান্ত এখনো কোন ‘মৃত্যু সনদ’ দেয়া হয়নি। লাশ মেলেনি বলে নিখোঁজদের পরিবার সরকারের কাছ থেকে  কোন ক্ষতিপূরণ পায়নি। অপরদিকে, লঞ্চ ডুবির মামলারও অগ্রগতি নেই। মামলায় গ্রেফতার লঞ্চের মালিক আবু বক্কর সিদ্দিক কালু ও তার  ছেলে ওমর ফারুক লিমন জামিনে মুক্তি পেয়েছেন। অন্য আসামিরা আজো গ্রেফতার হয়নি। দুর্ঘটনা রোধে তদন্ত কমিটির ২৫ সুপারিশের একটিও বাস্তবায়ন হয়নি।

 
নৌ পরিবহন মন্ত্রী শাজাহান খান ইত্তেফাককে বলেন, ‘লাশ উদ্ধার না হওয়ার কারণে আমরা কখনোই একজনকে ‘মৃত’ বলতে পারি না। ‘নিখোঁজ’ নিয়ে ভুক্তভোগী পরিবারের মধ্যে কিছু সমস্যাও তৈরি হয়েছে। তবে আমরা ‘মৃত’ ঘোষণাও দিতে পারব না। আইনি এই বাধার কারণেই সরকারের আন্তরিকতা থাকা সত্ত্বেও তাদের আর্থিক সহায়তা দেয়া যায়নি।
 
পিনাক-৬ লঞ্চ ডুবির মাত্র দুদিন আগে ফরিদপুরের ভাঙ্গা থানার রূপার বিয়ে হয়েছিল মিজানুর রহমানের সাথে। লঞ্চ ডুবিতে মিজানুর রহমানের নামটি নিখোঁজের তালিকায় স্থান  পেয়েছে। গতকাল সোমবার রূপার বাবা শাহ আলম বললেন, মেয়েটা দুদিনে বিধবা হয়েছে। স্বামীর কবরটাও দিতে পারেনি। এখন তাদের কেউ খবর রাখে না।
 
একই আক্ষেপ নিয়েই গাজীপুরের রিনা বেগম সারাজীবন ছেলে ইমতিয়াজের পথ চেয়ে থাকবেন। গোপালগঞ্জের মুকসুদপুর থানার বড়দিয়া বামনডাঙ্গা গ্রামের মাহমুদা বেগম প্রতিবছর ভাববেন, তিন বছর বয়সে হারিয়ে যাওয়া ভাগ্নে হানিফ কতটা বড় হচ্ছে? মাদারিপুরের ডাসা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান কাজী সবুজের পরিবারের চার সদস্য ছিলেন পিনাক-৬ লঞ্চে। মা মেহেরুন্নেসা ও শ্যালক সেনা সদস্য আল-আমীনের লাশ পাওয়া গেলেও আজো নিখোঁজ স্ত্রী ময়না আক্তার ও ছেলে তৌফিক কাজী।  তিনি বলেন, লাশ পেলে অন্তত মনটাকে শান্ত করতে পারতাম। ছেলের করবটা জিয়ারত করতে পারতাম।  কাজী সবুজ জানান, আল-আমীনের পরিবারকে মাত্র ৩০ হাজার টাকা দেয়া হয়েছে। অন্য কোন অনুদান-সহযোগিতা না পাওয়ায় তার পরিবার অসহায় অবস্থায় দিন কাটাচ্ছে।
 
সদরপুর (ফরিদপুর) সংবাদদাতা জানান, সদরপুর উপজেলার সাতরশি গ্রামে মোহাম্মদ মাতুব্বরের পুত্র সোবাহান মাতুব্বর, তার স্ত্রী ইতি আক্তার, পুত্র ইভান মাতুব্বর, কন্যা শিমুল পারভীন শিমু, তার স্বামী- রুবেল, তাদের দুই কন্যা ফাইজা ও সাদিয়া লঞ্চ ডুবিতে এখনো নিখোঁজ রয়েছেন। মোহাম্মদ মাতুব্বর জানান, লাশ পাওয়ার জন্য আকুল আবেদন জানিয়ে অদ্যাবধি কারো লাশ পাইনি। সরকার কর্তৃক কোন সাহায্য-সহযোগিতাও পাইনি। কর্মক্ষম পুত্র-কন্যা হারিয়ে আশি বছর বয়সী মোহাম্মদ মাতুব্বর মানবেতর জীবন-যাপন করছেন। মোহাম্মদ মাতুব্বরের বড় কন্যা সাবেক ইউপি সদস্য রেখা বেগম জানান, তার বোন ঢাকা পঙ্গু হাসপাতালের পরিচালক সিরাজুল ইসলামের পিএস ছিলেন। লঞ্চ ডুবিতে নিখোঁজের পর লৌহজং থানার অফিসারদের হাতে-পায়ে ধরে বহু অনুরোধ করেছি। তারা আমার বোনের মৃত্যুর রিপোর্ট দেননি। আমার বোন সরকারি চাকরিরত অবস্থায় মারা গেলেও মৃত্যু সার্টিফিকেট না পাওয়ায় সরকার কর্তৃক কোন সাহায্য-সহযোগিতা পাইনি। স্থানীয় সংসদ সদস্য এই ৭ জন নিখোঁজের ঘটনায় ২০ হাজার টাকা সাহায্য করেছেন। এছাড়া কেউ তাদের কোন প্রকার সাহায্য-সহযোগিতা করেননি।
 

লঞ্চ ডুবির ঘটনার পরদিন বিআইডব্লিউটিএ’র পরিবহন পরিদর্শক জাহাঙ্গীর ভুঁইয়া বাদী হয়ে লৌহজং থানায় ৬ জনের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা দায়ের করেন। আসামিরা হলেন লঞ্চের মালিক আবু বকর সিদ্দিক কালু মিয়া, মালিকের ছেলে ওমর ফারুক লিমন, লঞ্চের আগের মালিক মনিরুজ্জামান খোকন, সারেং (মাস্টার) গোলাম নবী, সুকানী (গ্রিজার) ছবদর হোসেন মোল্লা ও কাওড়াকান্দি ঘাটের ইজারাদার আব্দুল হাই শিকদার। ঘটনার পর র্যাব লঞ্চের মালিক কালু মিয়া ও ছেলে লিমনকে গ্রেফতার করলেও তিন মাস পর তারা জামিনে ছাড়া পেয়ে যান। এক বছর পরেও এই মামলাটির তদন্তের কোন অগ্রগতি হয়নি। ঐ মামলায় আর কোন আসামিকে পুলিশ গ্রেফতার করতে পারেনি। এমনকি আসামিরা এখন মাওয়া ও কাওড়াকান্দি ঘাটে তাদের আগের কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার অভিযোগ রয়েছে। মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই জাফর আলী খান ইত্তেফাককে বলেন, এটি একটি রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ মামলা। মামলার তদন্তে প্রায় ৩০ জনের সাক্ষ্য নেয়া হয়েছে। কোন আসামিকে গ্রেফতার করা সম্ভব হয়নি। কিন্তু এ মামলার তদন্তে সরকারের পক্ষ থেকে একটি দিক-নির্দেশনা আসা প্রয়োজন। ঐ দিক-নির্দেশনা অনুযায়ী মামলাটির তদন্ত কার্যক্রম চলবে।