শ্রাবণের এই সময়ে কখনো কড়া রোদ আবার কখনোবা বৃষ্টি। আকাশে সূর্যের হাসি দেখে ছাতার তোয়াক্কা না করেই বেরিয়েছেন ঘরের বাইরে, হঠাৎ এক পশলা বৃষ্টি ভিজিয়ে দিতে পারে আপনাকে। আর এই বৃষ্টিতে ভিজলে ঠাণ্ডা কিংবা জ্বর বাঁধানোর পাশাপাশি নষ্ট হতে পারে প্রিয় পোশাকটিও। বিশেষ করে সুতি কাপড় কিংবা সাদা কাপড়ে বৃষ্টির পানি আর কাদা মাখামাখি হয়ে বিপত্তিতে পড়তে হয় অনেককেই। তাই বলে কি বৃষ্টির ভয়ে ঘরে বসে থাকতে হবে? না, তা নয়। বরং বৃষ্টিকে মানিয়েই আপনাকে প্রয়োজনে বাইরে বের হতে হবে। বৃষ্টির দিনে নিজেকে কীভাবে সামলাবেন তার পরামর্শ জানাচ্ছেন নওশীন শর্মিলী
বৃষ্টির দিনে কেমন পোশাক পরবেন তা আগে জানা উচিত। আর এক্ষেত্রে প্রথমেই আসবে সুতি কাপড়ের প্রসঙ্গ। সাধারণত সুতি কাপড়ের পোশাকের বুনটটাই এমন থাকে যে এ ধরনের কাপড় বৃষ্টিতে ভিজলে তা শরীরের সাথে সেঁটে গিয়ে এক রকমের অস্বস্তিকর অবস্থার সৃষ্টি করে। আবার একটু মোটা তন্তু বা মোটা বুনটের সুতির কাপড় শুকাতে দেরি হয় বলে তা শরীরের সাথে পানির সংস্পর্শটাও রাখে বহুক্ষণ। আর এ কারণে ঠাণ্ডা লাগার ভয়টাও থাকে বেশি।
IMG0
অন্যদিকে সুতি কাপড়ে বৃষ্টির পানি শুকিয়ে গেলে এতে এক ধরনের গুমোট গন্ধ কিংবা ছোট ছোট দাগ হতে পারে, যা বারোটা বাজিয়ে দিতে পারে আপনার প্রিয় পোশাকের। সুতি পোশাকের মতো বৃষ্টির এই সময়টায় মোটা বুনটের কাপড় যেমন আদ্দি বা খদ্দরের পোশাক পরা থেকেও বিরত থাকতে হবে। সেই সাথে বৃষ্টিতে যেসব কাপড় ভিজে গেলে আপনাকে অস্বস্তিকর পরিস্থিতিতে ফেলে দিতে পারে সে ধরনের কাপড়ও এড়িয়ে চলতে হবে। অন্যদিকে বৃষ্টিতে কোনো কারণে আপনার প্রিয় পোশাকটি ভিজে গেলে বাড়ি ফিরে যত দ্রুত সম্ভব তা শুকাতে দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। আর কাদাপানিতে ভিজে গেলে কিংবা দাগ বসে যাওয়ার আশঙ্কা থাকলে তা ধুয়ে দেওয়ার ব্যবস্থাও করতে হবে তাড়াতাড়িই।
এবার আসছি বৃষ্টিদিনের আরামদায়ক পোশাক প্রসঙ্গে। সাধারণত বৃষ্টির সময় বা মেঘলা মেঘলা আবহাওয়ায় এমন পোশাকই নির্বাচন করা উচিত, যা বৃষ্টিতে ভিজলে দ্রুত শুকিয়ে যায়। আবার হুট করে রোদ উঠলেও অস্বস্তি তৈরি করে না। এক্ষেত্রে কৃত্রিম তন্তুজাত কাপড়ই আপনাকে সুরক্ষিত রাখবে। তবে কৃত্রিম তন্তুজাত কাপড়ে যাদের অ্যালার্জি আছে কিংবা যারা এ ধরনের কাপড় পড়ে স্বস্তি পান না; তারা জর্জেট, সিল্ক কিংবা দেশি ভয়েল ধরনের কাপড়ের পোশাক পড়তে পারেন। এ ছাড়া রাজশাহী সিল্ক বা হাফসিল্ক, সুতি জর্জেট বা বেক্সি জর্জেটের তৈরি পোশাকগুলোও বৃষ্টির দিনে আপনাকে স্বাচ্ছন্দ্যে ঘুরে বেড়ানোর স্বাধীনতা দেবে।
সাধারণত বৃষ্টির এই সময়টা নীল, কমলা বা উজ্জ্বল যেকোনো রঙের পোশাকই বেশি মানায়। বিশেষ করে যেসব দিনে আকাশ মেঘলা থাকে সেসব দিনে খানিকটা উজ্জ্বল রঙের পোশাক পরাই ভালো। একইভাবে মেঘের কোল ঘেঁষে বেরিয়ে আসা হঠাত্ রোদেও ভালো লাগে যেকোনো উজ্জ্বল পোশাক। তবে পোশাকের এই উজ্জ্বল রং যেন চোখে লাগার মতো দৃষ্টিকটু না হয় সেটুকু বুঝে নিতে হবে আপনার রুচিবোধ থেকেই। তা ছাড়া যেসব রঙের কাপড় বৃষ্টির পানিতে ভিজে এক ধরনের স্বচ্ছতা তৈরি করে আপনাকে অস্বস্তিতে ফেলে দিতে পারে, এমন রঙের বা বুনটের পোশাক এড়িয়ে চলাই হবে বুদ্ধিমানের কাজ।
IMG1
বৃষ্টির সময় রাস্তায় বা চলতি পথে কাদাপানির ঝক্কিতে যেন আপনার মূল্যবান পোশাকের বারোটা বেজে না যায় সেজন্য খুব বেশি নিচু বা পায়ের কাছে পড়ে এমন প্যান্ট, ট্রাউজার বা সালোয়ার যথাসম্ভব এড়িয়ে চলা উচিত। এ ছাড়া এ সময়ের সালোয়ার কিংবা কামিজ খানিকটা ঢিলেঢালা হলে তা বৃষ্টিতে ভেজার পর যেমন দ্রুত শুকিয়ে যায় আবার হঠাৎ রোদ উঠলেও অস্বস্তি তৈরি করে না। বিশেষ করে বৃষ্টির সময় বাইরে বেরুতে হলে স্কিনটাইট জিন্স বা চুড়িদার সালোয়ারের মতো পোশাক এড়িয়ে চলাটাই হবে বুদ্ধিমানের কাজ।
মূলত বৃষ্টির দিনে বাতাসে আর্দ্রতা বেশি থাকে বলে কাপড় সহজে শুকাতে চায় না এবং কাপড় নষ্ট হওয়ার ভয়ও বেশি থাকে। এজন্য কাপড় ভালোভাবে শুকানোর বিষয়টিতে অবশ্যই গুরুত্ব দিতে হবে। এ ছাড়া কাপড় শুকানোর পর আয়রন করে রাখা উচিত। এতে কাপড়ের ছত্রাক নষ্ট হয়ে যায়।
বিশেষ করে শিশুদের কাপড়ের প্রতি বিশেষ যত্ন নিতে হবে। সাদা বা হালকা যেকোনো রঙের কাপড় ভিজে গেলেই পানিতে ধুয়ে নিতে হবে যেন তাতে দাগ বা তিলা না পড়ে। এ ছাড়া মাঝে মাঝে আলমারি খুলে ফ্যানের বাতাস ঢুকতে দিলে কাপড়ের মধ্যকার গুমোট ভাবটাও কেটে যাবে। অন্যদিকে বৃষ্টির দিনে আপনার পোশাকে কাদা লাগলে পুরো কাপড় সাথে সাথে ডিটারজেন্টে না ডুবিয়ে প্রথমে আলতো করে কাদা লাগা অংশটুকু ধুয়ে নিয়ে তারপর আলাদাভাবে পুরো কাপড়টি ধুয়ে ফেলতে হবে।
IMG2
যেসব অনুষঙ্গ সঙ্গে রাখতে হবে
বৃষ্টির দিনগুলোতে বাইরে বের হলে সঙ্গে রাখতে হবে রেইনকোট, ছাতা কিংবা বৃষ্টির উপযোগী ব্যাগ। এক কথায় বৃষ্টির দিনের অনুষঙ্গ এগুলোই।
রেইন কোট
বাজারে দেশি ও বিদেশি দুই ধরনের রেইনকোট পাওয়া যায়। দেশি প্যারাস্যুট কাপড়ের রেইনকোট বড়গুলোর দাম পড়বে ৪শ থেকে ৮শ টাকা। শিশুদের রেইনকোটগুলোর দাম পড়বে ৩শ থেকে ৫শ টাকা। এ ছাড়াও থাইল্যান্ড, কোরিয়া ও চীনের বিভিন্ন ডিজাইনের ছোট ও বড়দের রেইনকোট রয়েছে। থাইল্যান্ডের রেইনকোটগুলোর দাম ৬শ থেকে ৯শ টাকা। কোরিয়ার রেইনকোটগুলোর দাম পড়বে ৭শ থেকে ৯শ টাকা, চায়নার রেইনকোট পাওয়া যাবে ৪শ থেকে ৬শ টাকার মধ্যে। নিউ মার্কেট, ফার্মভিউ মার্কেট, নবাবপুর, চকবাজারসহ বিভিন্ন মার্কেটে রয়েছে এসব রেইনকোট।
ছাতা
বাজারে নওয়াব, শরীফ, অ্যাটলাস, এপেক্স, আলমসহ বিভিন্ন ব্র্যান্ডের ছাতা পাওয়া যায়। কালো ছাতার পাশাপাশি বাহারি রঙের ছাতার ব্যবহার এখন বেশি। লাল, নীল, পেস্ট, গোলাপি, পার্পেল প্রভৃতি রঙের ছাতা পাওয়া যাচ্ছে বাজারে। একরঙা ছাতার পাশাপাশি স্ট্রাইপ ছাতারও কদর রয়েছে বর্তমানে। সাধারণত ফোল্ডিং ছাতার দাম পড়বে ২শ থেকে ৩৫০ টাকার মধ্যে। টিপ বা অটো ছাতাগুলোর দাম পড়বে ১৫০ থেকে ৩শ টাকা। শরীফের বড় কালো ছাতাগুলো ১৫০ থেকে ২৫০ টাকা এবং ফোল্ডিং ছাতাগুলোর দাম পড়বে ২শ থেকে ৩শ টাকার মধ্যে। ফিলিপসের অটো ছাতা ২শ থেকে ৩৫০ টাকা ও টিপ ছাতা ১৫০ থেকে ২৫০ টাকা, এপেক্সের প্রিন্টের ছাতার দাম ১৫০ থেকে ৫শ টাকার মধ্যে।
ব্যাগ
বৃষ্টির দিনগুলোতে দামি চামড়া কিংবা পুঁথি, স্টোনখচিত ব্যাগ ব্যবহার না করাই উত্তম। বরং বৃষ্টি উপযোগী ব্যাগ ব্যবহার করাই বুদ্ধিমানের কাজ। বাজারে রেক্সিন, সিনথেটিক ও কাপড়ের ব্যাগ পাওয়া যায়। এ ব্যাগগুলো পাবেন নিউমার্কেট, ইস্টার্ন প্লাজা, মৌচাক মার্কেট, মেট্রো শপিংমল, রাপা প্লাজা প্রভৃতি মার্কেটে। রেক্সিন ও সিনথেটিক কাপড়ের দেশি হাতব্যাগগুলোর দাম পড়বে ১৫০ থেকে ৭৫০ টাকা। দেশের বাইরের ভারত, চীন, সিঙ্গাপুর প্রভৃতি ব্যাগ পাওয়া যাবে ৩শ থেকে ৫শ টাকার মধ্যে। এসব ব্যাগের পাশাপাশি পাটের তৈরি ব্যাগও এখন বেশ জনপ্রিয়। পাটের এক্সক্লুসিভ ব্যাগের জন্য বসুন্ধরা সিটি, আড়ং, নিপুণে ঢুঁ মারতে পারেন।
টিপস
যে ধরনের ফেব্রিকই আপনার স্টাইলের সাথে মানানসই হোক না কেন, খেয়াল রাখতে হবে যেন এ ধরনের কাপড়ের মধ্য দিয়ে কিছুটা হলেও বাতাস ঢোকার সুযোগ থাকে। কেননা পাতলা এবং বাতাস ঢোকে এমন কাপড় বৃষ্টিতে ভিজে গেলেও তাড়াতাড়ি শুকিয়ে যায়।
বৃষ্টির দিনে ভারী কাজের কোনো পোশাক না পড়াই উত্তম। তবে কোনো কারণে এ জাতীয় পোশাক পরার পর তা যদি বৃষ্টিতে ভিজে যায় তাহলে সেটি বাসায় ফিরবার পর অবশ্যই ভালো করে শুকিয়ে তারপর সংরক্ষণ করতে হবে। তা না হলে কাপড়ে কালো ছোপ ছোপ দাগ পড়ে যেতে পারে। বৃষ্টির মতো ঘামে ভেজা কাপড়ও কিছুক্ষণ উন্মুক্ত স্থানে রাখতে হবে, যাতে কাপড়ে ঘামের দাগ বসে না যায়। এ ছাড়া যারা বেশি ঘামেন তাদের প্রতিদিনের পরিধেয় একদিন পর পর ধুয়ে দেওয়ার চেষ্টা করতে হবে। সর্বোপরি বৃষ্টির হাত থেকে আপনার মূল্যবান পোশাক এবং মাথা বাঁচাতে বর্ষাতি ব্যবহারের অভ্যাসটা গড়ে তুলতে হবে।
